kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

ঝুঁকিপূর্ণ ‘ব্যাগারেই’ শান্ত নদীতে মৃত্যু

► মামলা দায়ের, ময়ূরের লোকদের খুঁজে পাচ্ছে না প্রশাসন
► ৩০ ঘণ্টা পর উদ্ধার অভিযান শেষ, আরো দুই লাশ উদ্ধার

এস এম আজাদ, ঢাকা, আলতাফ হোসেন মিন্টু, কেরানীগঞ্জ   

১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঝুঁকিপূর্ণ ‘ব্যাগারেই’ শান্ত নদীতে মৃত্যু

বুড়িগঙ্গায় ডুবে যাওয়া লঞ্চ মর্নিং বার্ড উদ্ধারে আসা জাহাজ প্রত্যয়ের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পোস্তগোলা মৈত্রী সেতুতে যান চলাচল সীমিত করা হয়। ছবি : কালের কষ্ঠ

প্রাকৃতিক বা যান্ত্রিক কোনো সমস্যা ছিল না। মূলত চালন ত্রুটির কারণে গত সোমবার সদরঘাটের কাছে বুড়িগঙ্গায় ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ডুবে যায়। ময়ূর লঞ্চের মূল মাস্টার কিংবা সারেং নয়, সহকারী লঞ্চটিকে অন্য ঘাটে নোঙর করতে ‘ব্যাগার’ (পেছনে নেওয়া) দিয়ে ঘোরাচ্ছিলেন। প্রাথমিক তদন্তে ৩৪ জনের প্রাণহানির পেছনে এমন অবহেলার তথ্য উঠে এসেছে। লঞ্চঘাটের যাত্রী, নৌকার মাঝি, লঞ্চের স্টাফ, ঢাকা নৌবন্দরসংশ্লিষ্ট (সদরঘাট) ব্যক্তিরা জানান, বুড়িগঙ্গায় লঞ্চগুলো স্থানান্তরের সময় ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাগারের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। লঞ্চ ব্যাগার দেওয়ার সময় সহকারীদের কাছে চালন ছেড়ে চলে যান মাস্টার কিংবা সারেং। ছোট নৌযানের গতিবিধি না দেখে বেপরোয়া পেছনে চালানোয় প্রায়ই অন্য লঞ্চের সঙ্গে ধাক্কা এবং নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। ২০১৯ সালে এভাবে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অবৈধ খেয়াঘাটের কারণে এসব প্রাণহানি ঘটায় নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ লঞ্চের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। এ কারণে সদরঘাটে ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ চালন অব্যাহত রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এদিকে মর্নিং বার্ড ডুবে যাওয়ার ঘটনায় নৌ পুলিশ গতকাল মঙ্গলবার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক, মাস্টারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। মামলায় বাদী বলেছেন, ‘ময়ূর-২ লঞ্চটির ট্রিপ থাকায় কেরানীগঞ্জের কুমিল্লা ডকইয়ার্ড থেকে বেপরোয়াভাবে পেছনে ব্যাগার দিয়ে আসার চেষ্টা করলে দুর্ঘটনাটি ঘটে। তারা একটু সতর্ক হলেই এত বড় দুর্ঘটনাটি না-ও ঘটতে পারত।’ গতকাল পর্যন্ত মামলার কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। অন্যদিকে গতকালও টানা দ্বিতীয় দিনে উদ্ধারকাজ চালিয়ে দুজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে একজনের নাম আশিক (১৮), তিনি মর্নিং বার্ডের ইঞ্জিনচালক ছিলেন। আরেকজনের নাম আবদুর রহমান (৪৫), তিনি মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আবদুল্লাপুর এলাকার ফল ব্যবসায়ী ছিলেন। এঁদের নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৪। বেলুনে বাতাস ঢুকিয়ে গতকাল দুপুরে ডুবন্ত লঞ্চটিকে ভাসিয়ে তোলেন উদ্ধারকারীরা। সেটিকে টেনে কেরানীগঞ্জ প্রান্তে তীরে রেখে ৩০ ঘণ্টা পর উদ্ধারকাজ শেষ ঘোষণা করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি শাহ জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গতকাল ভোরে সদরঘাট নৌ পুলিশের এসআই সামসুল আলম বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। দায়িত্বে অবহেলাসহ বেপরোয়াভাবে নৌযান চালিয়ে মর্নিং বার্ড লঞ্চটিকে ডুবিয়ে দিয়ে ৩৪ জনের প্রাণহানির অভিযোগে ময়ূর-২-এর  মালিক মোসাদ্দেক হানিফ সোয়াদ, মাস্টার আবুল বাসার মোল্লা, তৃতীয় শ্রেণির মাস্টার জাকির হোসেন, ইঞ্জিনচালক শিপন হাওলাদার, দ্বিতীয় শ্রেণির চালক শাকিল, লঞ্চটির সুকানি নাসির এবং গ্রিজার হৃদয়কে মামলায় আসামি করা হয়েছে। নৌ পুলিশই মামলাটির তদন্ত করবে।’

মামলার বাদী এসআই সামসুল আলম বলেন, ‘ঘটনার পরপরই ময়ূর-২ লঞ্চের সংশ্লিষ্ট সবাই পালিয়ে গেছে। লঞ্চটিকে নৌ পুলিশের হেফাজতে সদরঘাট টার্মিনালে রাখা হয়েছে। মর্নিং বার্ড লঞ্চটি মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে যাত্রী নিয়ে সদরঘাট আসছিল। অপরদিকে ময়ূর-২ লঞ্চটির ট্রিপ থাকায় কেরানীগঞ্জের কুমিল্লা ডকইয়ার্ড থেকে বেপরোয়াভাবে পেছনে ব্যাগার দিয়ে আসার চেষ্টা করলে দুর্ঘটনাটি ঘটে। তারা একটু সতর্ক হলেই এত বড় দুর্ঘটনাটি না-ও ঘটতে পারত।’

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার মনজুরুল কবীর বলেন, “একটি দুর্ঘটনার পেছনে অসংখ্য কারণ থাকতে পারে। বৈরী আবহাওয়া হতে পারে, নির্মাণ ত্রুটি হতে পারে, ইকুইপমেন্ট ফেইলিওর হতে পারে। তদন্তে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিষয়টি উঠে আসে। এই দুর্ঘটনায় ওপরের কোনো কারণই কাজ করেনি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছে, ওখানে (ময়ূর-২ লঞ্চ) মাস্টার ও অন্যান্য যাঁরা কাজ করেছেন তাঁদের ‘হিউম্যান ফেইলিওর’। দুর্ঘটনার অবস্থায় ‘সিচুয়েশনাল অ্যাওয়্যারনেস’ ওই পার্টিকুলার পরিস্থিতিতে সে তার দায়িত্বটা হ্যান্ডল করতে পারেনি, আমার কাছে এটা মনে হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘দুর্ঘটনার সময় ময়ূরের মূল মাস্টার নয়, একজন শিক্ষানবিশ মাস্টার সেটি চালাচ্ছিলেন বলে আমরা শুনেছি। আমাদের পক্ষে এ মুহূর্তে এটি সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল, তবে তদন্তে পুরো বিষয়টি উঠে আসবে।’

সদরঘাটের একাধিক সূত্র জানায়, সাধারণত লঞ্চ চালান সারেং। আর নির্দেশনা দিয়ে মাঝেমধ্যে চালিয়ে লঞ্চটিকে পরিচালনা করেন মাস্টার। লঞ্চের দুর্ঘটনা ঘটলে পুরো দায়িত্ব মাস্টারের। তবে সরদরঘাটে ৪৫টি রুটের লঞ্চ রাখার পর মূল মাস্টার আর সেগুলো পরিচালনা করেন না। তখন সহকারী বা শিক্ষানবিশ চালকরা বেপরোয়াভাবে ব্যাগার দিয়ে লঞ্চ সরান। এ কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। গত ৬ অক্টোবর সুন্দরবন-৯ ও রাজহংস লঞ্চের নিচে পড়ে নৌকার তিন যাত্রী প্রাণ হারান। ৬ মার্চ এমভি সুরভী-৭-এর ধাক্কায় নৌকা ডুবে একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু হয়। এর আগে ২৫ জানুয়ারি মা ও দুই মেয়ে এমভি পারাবাত লঞ্চের ধাক্কায় বুড়িগঙ্গায় ডুবে যান। ১৩টি অবৈধ খেয়াঘাট থেকে ডিঙি নৌকা চলার কারণে কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দেয় না বলে জানায় সূত্র।

দুই লাশ উদ্ধার, অভিযান শেষ : গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ডুবন্ত লঞ্চটির ইঞ্জিনচালক আশিকসহ দুজনের লাশ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। আশিকের বাবা ইসমাইল জানান, তাঁদের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি বিকিরবাজার এলাকায়। প্রতিদিনের মতো সোমবার সকালেও লঞ্চে কাজে যোগ দিতে তাঁর ছেলে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। দুপুর ১২টার দিকে টিভিতে দেখতে পান মর্নিং বার্ড লঞ্চ ডুবে গেছে। এরপর দুর্ঘটনাস্থলে এসে ছেলেকে খুঁজতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘সবার মুখেই শুনছি, পরিকল্পিতভাবে লঞ্চটিকে ডুবানো হয়েছে। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’

বিআইডাব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন জানান, দুপুরে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উল্টানো অবস্থায়ই পানির সমান্তরালে ভেসে ওঠে। লঞ্চটিকে টেনে কেরানীগঞ্জ প্রান্তে বুড়িগঙ্গা তীরে রাখা হয়েছে। লঞ্চটিকে এখনো পানি থেকে উঠানো হয়নি। দুর্ঘটনায়  বিআইডাব্লিউটিএর পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর আগে সোমবার দুর্ঘটনার পরই সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়। এ কমিটিতে নৌ পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধি আছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা