kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ আষাঢ় ১৪২৭। ৭ জুলাই ২০২০। ১৫ জিলকদ  ১৪৪১

মজুদদারের কবলে চাল

► এক বছরের ব্যবধানে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ১৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে
► মৌসুম শেষ না হতেই বেড়েছে ২-৪ টাকা

রোকন মাহমুদ   

১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মজুদদারের কবলে চাল

করোনাভাইরাস মহামারির এ সময় মানুষের আয় কমে গেছে, এটা নতুন কথা নয়। কিন্তু দুর্যোগের এ সময় বিপদাপন্ন মানুষের ঘাড়ে নতুন করে চেপে বসেছে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি। কিছুদিন ধরে চালের বাজার ভোক্তাদের বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ করোনাকালে সবচেয়ে বড় সুখবর নিয়ে এসেছিল দেশের কৃষি খাত। সদ্য শেষ হওয়া বোরো মৌসুমে ধানের ফলন হয়েছে প্রায় দুই কোটি মেট্রিক টন। এতে চালে একটু স্বস্তির আশা ছিল, তা আর হলো না।

চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে চালকলের মালিকরা ধানের দাম বাড়ার অজুহাত দিচ্ছেন। কিন্তু এরই মধ্যে অভিযোগ উঠেছে, চালকল মালিক ও নতুন একশ্রেণির ব্যবসায়ী ধান-চাল মজুদ করছেন।

এরই মধ্যে নতুন কোনো গোষ্ঠী চাল মজুদ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে খাদ্য অধিদপ্তর দেশের সব জেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছে বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সারোয়ার মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ সময় চালের দাম এতটা বাড়ার কথা নয়। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কেউ মজুদ করছে কি না সে বিষয়টি অনুসন্ধান শুরু করেছি। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় স্থানীয় প্রশাসনকে এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সব ধরনের চালের দামই গত বছরের তুলনায় কেজিতে ৬ থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত বেশি। বিশেষ করে মোটা চালের দাম বেড়েছে বেশি। মৌসুম শেষ না হতেই গত ১৫ দিন ধরে একটু একটু করে বাড়তে শুরু করেছে। এ সময় পাইকারি বাজারেই কেজিতে দুই-চার টাকা বেড়েছে। খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ব্যবসায়ীয়দের সুবিধা মতো।

বাংলাদেশ রাইস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, ১৫ জুন পর্যন্ত পাইকারিতে মিনিকেট চালের গড় দাম ছিল ৫০ টাকা কেজি। গত সোমবার তা বেড়ে ৫২ টাকা ছাড়িয়েছে। নাজিরশাইল ছিল ৫৫ টাকা কেজি, এখন ৫৮ টাকা। ব্রি-২৮ ছিল ৪০ টাকা, এখন ৪৪ টাকা। গুটি, স্বর্ণার মতো মোটা চাল ১৫ দিন আগে ছিল ৩৮ টাকা, এখন ৪০ টাকার ওপরে। এ সব চালের দাম জুনের শুরুতে বরং আরো এক থেকে দুই টাকা কম ছিল।

করোনার কারণে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও চালেই সবচেয়ে ভোগান্তি ছিল মানুষের। সব ধরনের চলের দাম অস্বাভাবিক বাড়তি ছিল মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে। তখন ভোক্তারা ৬০ টাকা কেজি দরে মিনিকেট কিনেছে। মোটা চালের দাম ছিল ৪৫ টাকার ওপরে। তথ্য বলছে, এমন অবস্থা হয়েছিল ২০১৭ সালে আগাম বন্যার কারণে হাওরে ধান নষ্ট হওয়ায়। আর হয়েছিল ২০০৬-০৭ অর্থবছরে রাজনৈতিক অস্থিরতায়।

অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, সব ধরনের চালের দাম গত বছরের এই সময়ের তুলনায় কেজিতে ১৩ টাকা পর্যন্ত বেশি। গত বছর জুনের ২৩ তারিখের হিসাব অনুসারে, পাইকারি বাজারে মিনিকেট চালের গড় দাম ছিল ৪২-৪৪ টাকা কেজি। অর্থাৎ এ বছর কেজিতে বেড়েছে ১০ টাকার ওপরে। নাজিরশাইল ছিল ৫২ টাকা কেজি অর্থাৎ এবার বাড়তি ছয় টাকা। ব্রি-২৮ ছিল ৩১ টাকা ৫০ পয়সা; বেড়েছে ১২ টাকা। গুটি, স্বর্ণার মতো মোটা চালের গড় দম ছিল ২৭ টাকা অর্থাৎ এ বছর বেশি রয়েছে কেজিতে ১৩ টাকা।

জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন রনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চালের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে চালকলের মালিকরা ভালো বলতে পারবেন। তাঁরা দাম বাড়ালে আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। চালের দাম সবচেয়ে বেশি বাড়ে হাত বদলের মাধ্যমে। এ ছাড়া এবার কৃষকরাও ধান ছাড়তে চাচ্ছেন না। গত বছর লোকসান হওয়ায় এবার তাঁরা বুঝতে পেরেছেন মৌসুম শেষে বিক্রি করলে ভালো দাম পাওয়া যায়। করোনা এবং সামনে বন্যার কারণে চালের দাম আরো বাড়তে পারে—এই ধারণায় অনেক চালকল মালিকও হয়তো ধান কিনে রাখছেন।’

চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতে চালের সংগ্রহ মূল্য সরকারিভাবে ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া, বিশ্ববাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে একদল ব্যবসায়ী মনে করছেন, চালের দাম সামনে আরো বাড়বে। তাই তাঁরা চাল ও ধান কিনে মজুদ করছেন। এ ছাড়া বোরোর পরে ধানের খুব বেশি একটা উৎপাদন হয় না। তাই ভবিষ্যতে চালের বাজারে ভালো মুনাফার আশায় অনেকে ধান মজুদ করছেন। আর চালকল মালিকরা তো কম দামে মৌসুমের শুরুতেই কিনে রেখেছেন। ফলে ধানের দাম বাড়ছে। আর এই সুযোগ নিচ্ছেন চালকল মালিকরা। এর বাইরে নতুন একশ্রেণির ব্যবসায়ী অতি মুুনাফার আশায় চাল মুজদ করছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় এবার ধানের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করেছে ২৬ টাকা কেজি। অর্থাৎ এক হাজার ৪০ টাকা মণ (৪০ কেজি)। আর চালের মূল্য নির্ধারণ করেছে ৩৬ টাকা কেজি। অর্থাৎ এক হাজার ৪৪০ টাকা মণ।

নওগাঁ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের প্রধান ধান-চালের মোকামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে মোটা ধান প্রতি মণ ৮৫০ থেকে সাড়ে ৯৫০ টাকা, মাঝারি মানের ধান এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকায় এবং সরু ধান এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এসব জেলার বড় হাটগুলোতে ধানের সরবরাহ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এ ছাড়া নানা কারণে সরকারি গুদামে কৃষকরা চাল দিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। বাইরে বেশি দাম পাওয়ায় সরকারি গুদামে চাল দিচ্ছেন না চালকল মালিকরাও।

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুর রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথম কারণ হচ্ছে এবার মোটা চালের ধান উৎপাদন কম। দ্বিতীয় কারণ, কৃষকদের উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় সরু ধানও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এর বাইরে করোনার কারণে সব জায়গায়ই খরচ বেড়েছে। ফলে চালের উৎপাদন খরচও বেড়েছে।’

চুয়াডাঙ্গা জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল্লাহ শেখ বলেন, ‘বাজারে এখন ধানের দাম এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০ টাকা মণ। ওই ধান থেকে চাল তৈরি করলে কেনা দাম দাঁড়াবে ৪১-৪২ টাকা কেজি। তাহলে ৩৬ টাকা কেজিতে খাদ্যগুদামে চাল দিতে গেলে মিল মালিকদের মোটা অঙ্কের টাকা লোকসান হবে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা