kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

সড়কে বাস নামলেও হতাশ মালিক চালক সহযোগী

► রাজধানীর গণপরিবহন যাত্রীশূন্য
► দূরপাল্লার বাসেও যাত্রী মিলছে না
►বেশি ভাড়ার কারণেও যাত্রীরা বাস বিমুখ

রফিকুল ইসলাম, তানজিদ বসুনিয়া ও জহিরুল ইসলাম   

৩০ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সড়কে বাস নামলেও হতাশ মালিক চালক সহযোগী

করোনার কারণে সাধারণ ছুটি, অঘোষিত লকডাউন ইত্যাদি মিলিয়ে ভীষণ বিপাকে পড়েছে দেশের পরিবহন খাত। রাজধানী এবং দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকায় জীবন-জীবিকা নিয়ে মহাসংকটে আছেন প্রায় ৭০ লাখ পরিবহন শ্রমিক। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে টানা ৬৬ দিন বন্ধ থাকার পর গত ৩১ মে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে গণপরিবহন চলার অনুমতি দেয় সরকার। অনুমতি দেওয়া হয় দূরপাল্লার বাস চলারও।

কিন্তু জীবিকার তাড়নায় রাস্তায় নামলেও বাসচালক ও তাঁর সহযোগীদের ভাগ্য পাল্টেনি। যাত্রীশূন্যতায় সামান্য যে আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। দেখা যাচ্ছে, রাজধানীতে রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাসগুলো দাঁড়িয়ে থাকছে যাত্রীর আশায়; কিন্তু প্রত্যাশিত যাত্রী মিলছে না। অগত্যা প্রায় যাত্রীহীন বাসগুলো এক স্টেশন থেকে ছুটছে আরেক স্টেশনে।

সামাজিক দূরত্ব মেনে এক সিট ফাঁকা রেখে যাত্রী পরিবহনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ অবস্থায় বাস মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাসভাড়া বাড়ানো হয় ৬০ শতাংশ। কিন্তু বাস মালিকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দূরপাল্লার পরিবহনে কোনো কোনো দিন তেল খরচও উঠছে না। ফলে তাঁদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। আর রাজধানীতে বাড়তি ভাড়া এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে গণপরিবহন এড়িয়ে চলছে মানুষ। দূরপাল্লার পরিবহনেও মিলছে না আশানুরূপ যাত্রী।

রাজধানীর সায়েদাবাদ, গুলিস্তান ও মহাখালী বাস টার্মিনাল ঘুরে বাসচালক, সহযোগী ও মালিকদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও এনা পরিবহনের মালিক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সড়কে যান চলাচল সচল রাখতে বাস চলতে শুরু করলেও যাত্রী নেই। পাঁচ থেকে সাতজন যাত্রী নিয়ে প্রতিটি বাস চলছে। জ্বালানি খরচও উঠছে না। বর্তমানে ৯০ শতাংশ পরিবহন লোকসানের মুখে। কর্মহীন বাসচালক ও সহযোগীরা বাস নিয়ে রাস্তায় নামলেও যাত্রী নেই। এভাবে চলতে থাকলে বেশিদিন আর বাস চালানো সম্ভব হবে না।’

জুরাইন থেকে দিয়াবাড়ী রুটে চলাচল করে রাইদা পরিবহন। এই পরিবহনের একটি বাস জুরাইন থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্ত অনুসরণ করে দেখা গেছে, যাত্রী প্রায় নেই-ই। গতকাল সোমবার সকাল ১১টা ৫ মিনিটে ঢাকা মেট্রো-ব-১৫৭১৮৪ নম্বরের গাড়িতে ছিল মাত্র পাঁচজন যাত্রী। পথিমধ্যে আরো চারজন যাত্রী উঠলেও সাড়ে ১১টায় হাটখোলায় নেমে যায় তিনজন। ওইখানে কিছু সময় অপেক্ষা করে বাসটি সামনে এগোতে থাকে।

একই চিত্র দেখা গেছে যাত্রাবাড়ী থেকে গাজীপুর রুটে চলাচলকারী তুরাগ পরিবহনেও। ঢাকা মেট্রো-১৫৩৮৪২ নম্বরের গাড়িটি দীর্ঘ সময় যাত্রাবাড়ীতে দাঁড়িয়ে থাকলেও কোনো যাত্রী পায়নি। গাড়ির চালক সাজ্জাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যাত্রী নেই বললেই চলে। সব মিলিয়ে ১০-১৫ জন পাওয়া যায়। কোনো দিন তেল খরচ ওঠে আবার কোনো দিন ওঠে না। দিনে তিন-চার ট্রিপ দেওয়া যায়। আয় প্রায় নেই। সংসার নিয়ে বড় কষ্টে আছি। এই পরিস্থিতি আর সামলাতে পারছি না।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর প্রায় সব রুটের বাসেই যাত্রীর অবস্থা একই। সহযোগীরা তাঁদের আগের রুক্ষতা পরিহার করে বিনয়ের সঙ্গে যাত্রী ডাকছেন। গুলিস্তান, বকশীবাজার, আজিমপুর, সায়েন্স ল্যাব, শাহবাগ, কারওয়ান বাজারসহ আরো কয়েকটি সড়কে চলাচল করা বাসগুলোর চালক ও তাঁর সহযোগীদের মধ্যে দেখা গেছে চরম হতাশা।

আজিমপুর মোড়ে দাঁড়ানো মোহাম্মদপুরগামী ১৩ নম্বর বাসের চালক সুরুজ মিয়া বলেন, ‘করোনার আগে দিনে হাজার ১২০০ টাকা আয় হইতো, এখন ২০০/৩০০ টাকা। এইডা আমরা নিমু না মালিকরে দিমু!’

কুড়িল বিশ্বরোডে দেওয়ান পরিবহনের ৪৪ সিটের বাসে যাত্রী দেখা গেছে মাত্র পাঁচজন। বাসের সহকারী ফরিদ বলেন, ‘আগে যানজটের মধ্যেও ৮-৯ট্রিপ মারা যেত। এখন চার-পাঁচ ট্রিপ মারতেও কষ্ট হয়। ৪টায় মার্কেট বন্ধ হইয়া যায়। এরপর আর বাসে উঠার লোক থাহে না। ইনকাম নাই। বড় কষ্টে আছি গো, ভাই!’

সাভারের ফুলবাড়িয়ায় তিন ছেলে-মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে বাস করেন অগ্রদূত পরিবহনের একটি বাসের (ঢাকা মেট্রো-ব-১৫৫৩৯৪) চালক কাজিমুল ইসলাম কাজল। করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর আগে ভালোই চলছিল সংসার। কিন্তু তিন মাস ধরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তিনি। বলেন, ‘দুঃখের কথা কী কমু ভাই, আমরা হইলাম এতিম। আমাগো কেউ নাই। এই যে (অঘোষিত লকডাউন) দুই মাস বাসায় পইড়া ছিলাম, কেউ খবরও নেয় নাই। আগে প্রতিদিন এক-দেড় হাজার টাকা কইরা আয় হইত। এহন দিনে ২০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা। খুব সমস্যায় আছি।’

ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো-ব-১৩১০৯০) চালক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আগে এমন দিনও গেছে, দিন শেষে তিন-সাড়ে তিন হাজার টাকা পাইতাম। এহন দিনে চার শ-পাঁচ শ টাকাও পাই না।’

বলাকা পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো-ব-১৪১৯১০) সহকারী মো. সাজু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চুরি-ডাকাতি তো আর করতে পারি না। পেটের দায়ে রাস্তায় নামছি। ডাইল-ভাতের পয়সাও ওঠে না। কোনো দিন ২০০ টাকা পাই আবার কোনো দিন পাই না। এভাবেই চলতাছে।’

অন্যদিকে দূরপাল্লার সেন্ট মার্টিন পরিবহনের সেলস এক্সিকিউটিভ মাহবুবুর রহমান রতন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যাত্রীর চাপে আগে দিনরাত মিলে ৪০টি গাড়ি চালাতাম আমরা। এখন দিনে ছাড়ি মাত্র দুইটা। তা-ও যাত্রী অর্ধেক। এভাবে লোকসান দিয়ে কত দিন ব্যবসা করা যাবে, আল্লাহ জানেন!’

ঢাকা-সিলেট রুটে চলাচল করা লন্ডন এক্সপ্রেসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন ব্যবসার কোনো পরিস্থিতি নেই। যাত্রী নেই। তেলের খরচই উঠছে না। তবু ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বাস চালু রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় টিকে থাকা বড় কষ্টের।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা