kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

পারিবারিক বিরোধ বেড়েছে

রেজোয়ান বিশ্বাস   

৩০ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পারিবারিক বিরোধ বেড়েছে

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে থানাগুলোতে মামলা রেকর্ডের হার কমে গেছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক কলহ ও সামাজিক অপরাধের ঘটনা বেড়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর আগে মাসে যেখানে থানাপ্রতি গড়ে ৫০টি মামলা হতো, সেখানে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো মাসে ১০-১৫টি আবার কোনো মাসে তার চেয়েও কম মামলা রেকর্ড হচ্ছে। তবে এই সময়ে পরকীয়া, স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ, প্রতিবেশীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও প্রেমঘটিত নানা অপরাধ কিছুটা বেড়েছে। গত দুই মাসে সারা দেশের বিভিন্ন থানায় পারিবারিক কলহের কারণে কয়েক হাজার অভিযোগ (জিডি) জমা হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার কারণে গত মার্চ থেকেই দেশে অপরাধ কমতে শুরু করেছে। এমনিতে দেশের ৬৪০টি থানায় প্রতিবছর গড়ে এক লাখ ৪০ হাজার অপরাধ রেকর্ড হয়। এই হিসাবে সারা দেশে দৈনিক গড়ে তিন থেকে চার শতাধিক অপরাধ রেকর্ড হয়।’ কিন্তু বর্তমানে মামলা দায়েরের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। সরেজমিনে গত কয়েক দিনে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, করোনার এই সময়ে থানায় অভিযোগ নিয়ে মানুষ কম আসছে। তবে এর মধ্যে যারা আসছে তাদের বেশির ভাগই পারিবারিক বিরোধের কারণে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করছে। অতি সম্প্রতি রাজধানীর ভাটারা থানায় গিয়ে জানা যায়, চলতি মাসে এই থানায় করা শতাধিক অভিযোগের মধ্যে বেশির ভাগই পারিবারিক। ভাটারা থানার ওসি (অপারেশন) গোলাম ফারুক বলেন, ‘থানায় এখন মামলার সংখ্যা খুবই কম। তবে পারিবারিক অপরাধ বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন যেসব অভিযোগ নিয়ে মানুষ থানায় আসছে তার বেশির ভাগই পারিবারিক।’

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান : সারা দেশে গত জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে মোট মামলা হয়েছে যথাক্রমে ১৮ হাজার ছয়, ১৭ হাজার ৪৭২ ও ১৭ হাজার ১৫০টি। এরপর মার্চের শেষের দিকে দেশে করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে বেশির ভাগ মানুষ ঘরমুখী হয়ে পড়ে। সেই হিসাবে মোট মামলা কমে এপ্রিলে রেকর্ড হয়েছে ৯ হাজার ৯৮টি। মে মাসে সারা দেশের থানাগুলোতে মোট মামলা হয়েছে ১১ হাজার ৫০০টি। এই হিসাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের মাসিক অপরাধের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে রাজধানীর ৫০টি থানায় মাসে গড়ে মামলা হয়েছে দুই হাজার ২০০টি করে। সেখানে এপ্রিল মাসে মামলা রেকর্ড হয়েছে ৩৫১টি। গত মার্চ মাসে ঢাকায় মামলা হয়েছে দুই হাজার ৫৯টি। মে মাসে মামলা হয়েছে ৫১৮টি। গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীতে মামলা হয়েছে দুই হাজার ২৪০টি। পক্ষান্তরে গত জানুয়ারিতে মামলা হয়েছিল দুই হাজার ১৫৩টি।

বেসরকারি সংস্থার জরিপ : সামাজিক অপরাধের চিত্র জানতে এই সময়ে ফোনে জরিপ চালিয়েছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মে মাসে নির্যাতনের শিকার নারীর মধ্যে ১১ হাজার ২৫ জন অর্থাৎ ৯৭.৪ শতাংশ নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে স্বামীর হাতে। পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪৫ শতাংশ নারী, অর্থাৎ চার হাজার ৯৪৭ জন। এ ছাড়া অর্থনৈতিক কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩৩ শতাংশ, অর্থাৎ তিন হাজার ৫৮৯ জন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৯ শতাংশ, অর্থাৎ দুই হাজার ৮৫ জন। এ ছাড়া যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে ৪ শতাংশ, অর্থাৎ ৪০৪ জন।

এদিকে দেশের ১১টি জেলায় ব্র্যাক পরিচালিত জরিপে ৩২ শতাংশ মানুষ বলেছে, করোনার কারণে কাজ হারিয়ে আয় কমে যাওয়ায় পারিবারিক নির্যাতন বেড়েছে। গত ২৬ মার্চ থেকে ৩ জুন পর্যন্ত লকডাউনের মধ্যে রাজধানীতে নারী ও শিশু নির্যাতনে ১৯৭টি মামলা হয়েছে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে।

মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে সারা দেশে করোনাভাইরাস নিয়ে একধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে সরকার। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্চ মাসেই অপরাধের ঘটনা কমে যায়। মূলত করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বড়-ছোট রাস্তা, অলিগলিতে পুলিশ, র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত টহল দেওয়ার কারণে এসব অপরাধ কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে। অপরাধ কমার আরো একটি বড় কারণ ত্রাণ বিতরণ ও গ্রহণের সঙ্গে সম্পৃক্তরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রয়েছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মত : তবে পরিস্থিতি এভাবে নাও থাকতে পারে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। সাবেক আইজিপি শহীদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন মানুষ ঘরবন্দি থাকায় থানায় মামলা কমছে। তবে একই কারণে সামাজিক অপরাধ বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন থাকলে সামাজিক অপরাধ আরো বাড়বে।’ একই বিষয়ে কথা হয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘রাজধানীসহ জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি গ্রামে-গঞ্জেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেই চলেছে। মানুষ এখন ঘরবন্দি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে মানুষের চাকরি তথা রিজিকে হাত দিচ্ছে। এটা আরো দীর্ঘ হলে সমাজে বেকারত্বের সংখ্যা বাড়তে পারে। বিশেষ করে অভাবী মানুষের জমানো টাকা শেষ হয়ে গেলে তারা আয়-রোজগারের জন্য আরো মরিয়া হয়ে উঠলে তাতে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।’

বিভিন্ন থানার পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা সংক্রমণ রোধে জনসমাগম ঠেকাতে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে পুলিশ, র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ কারণে মানুষ বেশির ভাগ সময় ঘরে থাকার কারণে পারিবারিক অপরাধ কিছুটা বেড়েছে। এ ছাড়া খুন, ধর্ষণ, প্রতারণাসহ আরো যেসব অপরাধ আগে অহরহ ঘটত সেটা এখন আগের চেয়ে অনেক কম। অতীতে এসব অপরাধের ঘটনায় মামলা হতো অনেক বেশি। এ ছাড়া মাদকবিরোধী অভিযান কম থাকায় কমে এসেছে মাদক মামলাও। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল বা সাধারণ অপরাধীদের গ্রেপ্তারি অভিযানও কার্যত বন্ধ। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করোনাভাইরাস নিয়ে গুজব প্রচারের অভিযোগ কমেনি। এমন বাস্তবতায় সারা দেশে চুরি-ডাকাতির ঘটনাও কিছুটা বেড়েছে। বড় ধরনের মাদকের চালান ছাড়া ছোট মাদকের চালান ধরতে অর্থাৎ ছোটখাটো মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হচ্ছে না। র‌্যাব-পুলিশের গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, সারা দেশে গুজবের ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এভাবে সাধারণত ঘটে যাওয়া যেকোনো ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে অভিযান চালানো হচ্ছে। বর্তমানে দাগি আসামি ছাড়া ছোটখাটো আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে তাদের। এ ছাড়া কারাগারগুলোতে করোনার কারণে নতুন আসামি ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হতে পারে ভেবে গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হচ্ছে কম।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা