kalerkantho

রবিবার । ২১ আষাঢ় ১৪২৭। ৫ জুলাই ২০২০। ১৩ জিলকদ  ১৪৪১

সিলেটের হাসপাতালে অন্য রোগের চিকিৎসা

ঘুরতে ঘুরতেই রোগী হয়রান

সিলেট অফিস   

৭ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঘুরতে ঘুরতেই রোগী হয়রান

বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলেন এক নারী। তাঁকে দুটি পরীক্ষা করিয়ে পরদিন আসতে বলা হয়। কিন্তু পরদিন ওই নারীর অবস্থার অবনতি হলে পরপর চারটি হাসপাতালে গিয়েও আর চিকিৎসা পাননি। শেষ পর্যন্ত গত শুক্রবার তিনি মারাই যান। সেদিনই একইভাবে তিনটি হাসপাতালে ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যান নগরের আরেক ব্যবসায়ী।

এদিকে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে পদক্ষেপ নিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এ ছাড়া এসব ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে গতকাল শনিবার নগরে কফিন নিয়ে মিছিল করেছে একটি সংগঠন। অবিলম্বে এসব ব্যাপারে পদক্ষেপ না নিলে কঠোর আন্দোলনেরও হুমকি দিয়েছে তারা।

সিলেটে বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত এবং উপসর্গ থাকা রোগীদের চিকিৎসা হচ্ছে নগরের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। তিন দিন ধরে আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে করোনা চিকিৎসা শুরু হয়েছে। যদিও ওই হাসপাতালের সঙ্গে এখনো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো চুক্তি হয়নি। তবে সিলেটে যেভাবে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে তাতে এ দুই হাসপাতালের সীমিত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে পরিস্থিতি কতটুকু সামাল দেওয়া যাবে, এ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সিলেটকে রেড জোন ঘোষণার দাবিও উঠেছে।

করোনা পরিস্থিতিতে সিলেটের হাসপাতালগুলোতে সাধারণ রোগীদের সেবা না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত কয়েক দিনে করোনা সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সংকট আরো তীব্র হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়ছে করোনায় আক্রান্ত নয় এমন সব রোগীও।

এক সপ্তাহের ব্যবধানে চিকিৎসা না পেয়ে তিনজন সাধারণ রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে সিলেটে। সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, বেশির ভাগ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা থেকে সাধারণ রোগীদের ভর্তি নেওয়া তো দূরের কথা, চিকিৎসা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না। অনেক অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার জন্য একের পর এক হাসপাতালে ছুটে গিয়েও সেবা পাচ্ছে না।

জানা গেছে, গত শুক্রবার ভোরে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে তিনটি হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্য ও ব্যবসায়ী হাজি ইকবাল হোসেন (৫৫)। একই দিন জেলার দক্ষিণ সুরমার কুচাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আখতার হোসেনের স্ত্রীর মৃত্যু হয়। তাঁর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিৎসা পাওয়ার আশায় চারটি হাসপাতাল ঘুরেও কোথাও তাঁকে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া গত ৩১ মে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে স্ট্রোক করে সিলেটে চিকিৎসা নিতে আসা এক নারীকে (৭০) সাতটি হাসপাতাল ঘুরেও ভর্তি করাতে পারেননি স্বজনরা।

বিভিন্ন রোগীর পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালগুলোতে সেই অর্থে কোনো চিকিৎসাই এখন পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, জ্বর, হাঁপানি-শ্বাসকষ্ট, মাথা ব্যথা, কাশি, লিভার ও কিডনির রোগের উপসর্গজনিত কোনো রোগীকে বিন্দুমাত্র চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে না। ফলে সাধারণ রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে। অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রেও এ ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে অনেকটা বেশি। তবে কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য টেলিমেডিসিন সেবা দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে অনেকেই জানিয়েছেন, পাঁচ দিন ধরে সিলেটে করোনা সংক্রমণ ক্রমেই বেড়ে চলছে। অথচ করোনা রোগীদের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত সুবিধা সিলেটে নিশ্চিত করা যায়নি বলে অনেকেই মনে করছেন। সিলেট বিভাগে করোনা চিকিৎসার একমাত্র সরকারি হাসপাতাল শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের হাসপাতালটি ১০০ শয্যার ছিল। তবে করোনার কারণে নির্দিষ্ট দূরত্ব নিশ্চিত করতে এখানে ৮৫টি শয্যায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) রয়েছে ১৮টি। সব মিলিয়ে মোট শয্যা রয়েছে ১০৩টি। এ হাসপাতালে ভেন্টিলেটর রয়েছে ১৮টি।

একই সূত্রে জানা গেছে, শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে মোট রোগী ভর্তি রয়েছে ৭৩ জন। এর মধ্যে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৫২ জনের। অন্যদের করোনার উপসর্গ রয়েছে। এ ছাড়া আইসিউতে মোট সাতজন রোগী চিকিৎসাধীন। এদিকে করোনা চিকিৎসার একমাত্র বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নর্থ ইস্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের একটি ভবনে ২০০ শয্যার করোনা ইউনিট চালু হয়েছে। সেখানে ২০টি আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) রয়েছে।

শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালের আরএমও সুশান্ত কুমার মহাপাত্র বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যেসব রোগী হাসপাতালে আসছে, তাদের যথাযথভাবে আমরা সেবা দিতে পারছি। রোগী বাড়লে কী করা হবে, তা নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগের।’

এদিকে সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষুব্ধ সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে তিনি সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিনা চিকিৎসায় কেউ মারা যাবে, এটা অমানবিক ও খুবই দুঃখজনক। এগুলো মেনে নেওয়ার মতো নয়। কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়া তার অধিকার। হাসপাতাল চিকিৎসাসেবা দিতে বাধ্য।’

সিলেটে কফিন নিয়ে মিছিল : সিলেটে চিকিৎসার অভাবে বিভিন্ন হাসপাতালের অবহেলায় মানুষ মারা যাওয়ার প্রতিবাদে গতকাল শনিবার বিকেলে নগরে কফিন হাতে নিয়ে মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘পাবলিক ভয়েস’ নামের একটি সংগঠনের উদ্যোগে এই মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলটি নগরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে এক সমাবেশে মিলিত হয়।

রেড জোন ঘোষণার দাবি : সিলেটে ঈদের পর থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। আক্রান্তের সংখ্যায় প্রতিদিনই আগের দিনের রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছে। গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত সিলেট বিভাগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এক হাজার ৪১৩ জন রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। মারা গেছে ৩২ জন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে ২০৬ জন। এ অবস্থায় সিলেটকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দিক থেকে রেড জোন ঘোষণার দাবি উঠেছে। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এখনই রেড জোন ঘোষণা করে সিলেটের মানুষকে ঘরে আটকে রাখতে না পারলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।

মন্তব্য