kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

স্থবির নির্মাণ, প্লট-ফ্ল্যাট বিক্রি শূন্যের কোঠায়

করোনায় বড় সংকটে আবাসনশিল্প

মাসুদ রুমী   

৭ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



করোনায় বড় সংকটে আবাসনশিল্প

করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) প্রভাবে দেশের আবাসন খাতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। সাড়ে চার শর বেশি সংযোগ শিল্প নিয়ে অর্থনীতিতে শক্তি জোগানো এই খাতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে দেড় লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান। আবাসন খাতের সঙ্গে রড, সিমেন্টের মতো বৃহৎ ভারী শিল্প জড়িত, যেখানে শুধু স্টিল খাতেই গত তিন মাসে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া সিমেন্ট খাতে গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে খুচরা বাজারমূল্য অনুযায়ী ক্ষতি হয়েছে প্রায় এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আবাসন খাত স্থবির হয়ে পড়লে সমগ্র অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই এই খাতকে সুরক্ষা দিতে আগামী বাজেটে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজে এই খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপ অনুযায়ী মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) আবাসন খাতের অবদান ৭.৭৫ শতাংশ। আবাসিক, বাণিজ্যিক ও নির্মাণ মিলিয়ে তিন উপখাতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এক লাখ ৪১ হাজার ৫৭৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্য সংযোজন হয়েছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল এক লাখ ২৯ হাজার ৩১১ কোটি ১০ লাখ টাকা। এক বছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯.৪৯ শতাংশ।

আবাসন খাতের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাসে নির্মাণ খাতের স্থবিরতায় বৃহৎ এই শিল্পে বড় আঘাত লেগেছে। সরকারের মেগাপ্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি খাতে ঘরবাড়ি নির্মাণ অনেকটাই বন্ধ আছে। এই খাতের প্রায় ৩৫ লাখ নির্মাণ শ্রমিক কাজহীন অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বর্তমানে ৩০ হাজার ইউনিট ফ্ল্যাট অবিক্রীত পড়ে আছে। এ ছাড়া প্লট বিক্রিও কার্যত বন্ধ আছে। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে খাতটি।  

রিহ্যাবের সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত রিয়েল এস্টেট খাতের কর্মকাণ্ড বন্ধ। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে এই খাতের অসংখ্য নির্মাণ স্থাপনা। আবাসন খাতে লাখ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। এখানে শুধু ডেভেলপাররা নয়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য ক্রেতার টাকা আছে। আবাসন খাতে সরকার ট্যাক্স, ভ্যাট, রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ প্রচুর রাজস্ব পায়। তাই রিয়েল এস্টেট খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্থনীতিতে গতি আনতে হলে অবশ্যই আবাসন খাতে গতি আনতে হবে।’

সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের নিবন্ধন ব্যয় তুলনামূলক বেশি উল্লেখ করে রিহ্যাব সভাপতি বলেন, আবাসন খাতকে বাঁচাতে প্রণোদনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি আসন্ন বাজেটে কর কমানো এবং রেজিস্ট্রেশন ফি ৫ শতাংশে নামানো দরকার। এ ছাড়া বিনা প্রশ্নে, বিনা বাধায় অপ্রদর্শিত অর্থ আবাসনসহ অন্যান্য খাতে বিনিয়োগে আনা জরুরি। আবাসন খাতকে বাঁচাতে হলে নির্মাণ ব্যয় হ্রাস ও আনুষঙ্গিক ব্যয় কমাতে নির্দিষ্ট ভ্যাট হ্রাস করা প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এজাতীয় ব্যয় কমানো গেলে স্বল্প মূল্যে ক্রেতাসাধারণকে তাদের সামর্থ্যের মধ্যে আবাসন সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে আবাসন খাত স্থবিরতা থেকে মুক্তি পাবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি ও আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের গ্রুপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, স্টিলের মতো ভারী শিল্প বন্ধ থাকলে লোকসানের পরিমাণ খুব বেশি হয়ে যায়। দেশের স্টিল খাতে করোনাভাইরাসের প্রথম তিন মাসে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান হয়েছে। এই অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে ডিসেম্বর নাগাদ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। এই খাতের কাঁচামাল শতভাগ আমদানিনির্ভর। তাই বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক না হলে এই খাতের সমস্যা কাটবে না। তিনি আরো বলেন, এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে সরকারের পাশাপাশি দেশের ব্যাংক খাতকে আরো বেশি ভূমিকা নিতে হবে। ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের পাশে না দাঁড়ালে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে। তাই ‘রিলেশনশিপ ব্যাংকিং’ নয়, ‘নিড বেইসড ব্যাংকিং’ করতে হবে। বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে কিছু কিছু ব্যাংক এগিয়ে আসছে। কিন্তু বেশ কিছু ব্যাংক এই ক্ষেত্রে রক্ষণশীলতা দেখাচ্ছে, যেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকারকে এ ক্ষেত্রে মনিটরিং জোরদার করতে হবে। এ ছাড়া আসন্ন বাজেটে ক্ষতিগ্রস্ত খাত বাঁচাতে যত ধরনের ‘অগ্রিম কর’, ‘অগ্রিম ভ্যাট’সহ যত জায়গায় ‘অগ্রিম’ কথা আছে তা বাদ দিতে হবে। যে লোকসান হয়ে গেছে তা আর কাটিয়ে উঠা যাবে না। তাই করপোরেট করসহ অন্যান্য কর অবশ্যই কমাতে হবে। জনগণের ওপরও বেশি করের বোঝা বাড়ানো যাবে না।

উদ্যোক্তারা জানান, নির্মাণ খাতের অন্যতম সংযোগ শিল্প সিমেন্ট খাতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন তাঁরা। স্বয়ংসম্পূর্ণ এ খাত দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করে। তিন কোটি ৩০ লাখ মেট্রিক টনের বাজার হলেও এর দ্বিগুণ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে খাতটির।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) সভাপতি মো. আলমগীর কবির বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে দেশের যেসব শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তার মধ্যে সিমেন্ট শিল্প অন্যতম। সরকারঘোষিত লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে সিমেন্ট কারখানাগুলোর ৯০ শতাংশের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এ সময় শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ অন্য খরচ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। আর সিমেন্টের আমদানি করা কাঁচামাল এখন এ খাতের জন্য বড় বোঝা। ব্যাংক থেকে যে চলতি মূলধন নেওয়া হয়েছে তার সুদ ও আসল চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে চলেছে। মূলধনী যন্ত্রপাতির জন্য নেওয়া ব্যাংকঋণের খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দরকার।

বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলডিএ) সদস্য প্রায় ৩০০ প্রতিষ্ঠান বহু প্লট বিক্রি করে থাকে। করোনাভাইরাসের কারণে প্লট বিক্রি এবং বিক্রীত প্লটের কিস্তি কালেকশন নেই বললেই চলে। কিন্তু এর মধ্যে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। তাঁরা বলছেন, অধিকাংশ ডেভেলপার অতি উচ্চ সুদে ব্যাংকঋণ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে তাদের পক্ষে ব্যাংকঋণ ও সুদ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে আয়করের উচ্চ হারের কারণেও ক্রেতারা আগ্রহ হারাচ্ছে, যা সরকারের বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এদিকে করোনাভাইরাস প্রলম্বিত হওয়ার কারণে নির্মাণ খাতের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে দক্ষ ও অদক্ষ মিলিয়ে কাজে যোগ দিতে পারেননি ৩৫ লাখ কর্মী। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির (বিএসিআই) হিসাবে, নির্মাণ খাতের স্থবিরতার ফলে লাখ লাখ কর্মীর চাকরি ও মজুরি হারানোয় আর্থিক ক্ষতি ৮০ কোটি ডলার, সরকারের ভ্যাট, কর ও শুল্ক খাতে ক্ষতি ১১৫ কোটি ডলার, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি ৫০ কোটি ডলার এবং বিনিয়োগ খাতে ক্ষতি ৩৪ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে এ ক্ষতির অঙ্ক ২৭৯ কোটি ডলার বা সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ১৩.৫০ শতাংশ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দেশের অন্যতম রিয়েল এস্টেট কম্পানি শেলটেক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার কারণে সব কিছু বন্ধ আছে। মানুষের হাতে টাকা নেই। নির্মাণাধীন ও নতুন প্রকল্পের নির্মাণ ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে না, বিক্রীত ফ্ল্যাটের কিস্তির টাকাও ঠিকমতো আসছে না। আবার জমির মালিকদের সঙ্গে আগের করা চুক্তি অনুযায়ী জমিও পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আমরা নানামুখী সংকটে পড়েছি। আবাসনের জন্য একটা বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে মানুষ অনেক চিন্তা করে। বিক্রীত ফ্ল্যাটের কালেকশন অর্ধেকের চেয়েও কমে গেছে। আমাদের ৩৭৫ রেডি ফ্ল্যাট অবিক্রীত আছে। এই সংকটে কম্পানিগুলো ব্যাংকের সহায়তা না পেলে অনেক ছোট ছোট কম্পানি বন্ধ হয়ে যাবে।’ তিনি আরো বলেন, সংকট কাটিয়ে উঠতে রেজিস্ট্রেশন খরচ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, ঋণের সুদের হার ও কিস্তি পরিশোধের সময় বাড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। পোশাক খাতের মতো আবাসন খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পৃথক প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া দরকার।    

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে সামগ্রিক অর্থনীতিতেই শ্লথ গতি। মানুষের আয় কমে যাওয়ায় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ নতুন করে বিনিয়োগ করছে না। এতে স্বাভাবিকভাবেই আবাসন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এই খাতের উদ্যোক্তারাই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, বরং কর্মসংস্থানও কমে যাবে। নতুন নিয়োগ হবে না, বরং ছাঁটাই হবে বেশি। এর বহুমুখী প্রভাব পড়বে। অর্থনীতির রিটার্ন প্রলম্বিত হবে।’ তিনি আরো বলেন, এটাও যে একটি ক্ষতিগ্রস্ত খাত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই এই খাতের বিকাশ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনকে তহবিল প্রদানের মাধ্যমে আবাসন খাতের ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি, ফ্ল্যাট কিনতে সহজ শর্তে সর্বোচ্চ এক অঙ্কের সুদে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া করোনা সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে আবাসন খাতের ক্রেতা, জমির মালিক ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের অসমাপ্ত প্রকল্পগুলোতে বিশেষ ঋণের প্রচলন করা, সাপ্লাইয়ার ভ্যাট ও উৎস কর সংগ্রহের দায়িত্ব থেকে পাঁচ বছরের জন্য ডেভেলপারদের অব্যাহতি দেওয়া প্রয়োজন বলে অনেকে মনে করেন। ঢাকা জেলাসহ বিভিন্ন মেট্রোপলিটন এলাকা, ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মধ্যে পাঁচ বছরের জন্য এবং পৌরসভার বাইরের এলাকাতে নগরায়ণকে উৎসাহিত করতে ১০ বছরের জন্য ‘ট্যাক্স হলিডে’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করার কথা অনেকে বলেছেন। নামমাত্র নিবন্ধন ব্যয় নির্ধারণ করে আবাসন খাতে ‘সেকেন্ডারি বাজার’ ব্যবস্থা চালু করারও দাবি করেন ব্যবসায়ীরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা