kalerkantho

সোমবার । ২৯ আষাঢ় ১৪২৭। ১৩ জুলাই ২০২০। ২১ জিলকদ ১৪৪১

অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন পাবে দরিদ্র দেশও

মেহেদী হাসান   

৬ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন পাবে দরিদ্র দেশও

নভেল  করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) ভ্যাকসিনের অপেক্ষায় সারা বিশ্ব। বহুল প্রত্যাশিত সেই ভ্যাকসিন আবিষ্কার হওয়ার পর তা তৃতীয় বিশ্বের জনগণের কাছে কবে নাগাদ পৌঁছবে তা নিয়েও আছে শঙ্কা। তবে সেই শঙ্কা কাটিয়ে আশার আলো দেখাচ্ছে বহুজাতিক ওষুধ কম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে ভ্যাকসিন পৌঁছে দিতে সহায়তাকারী তিনটি সংস্থার চুক্তি।

ইংল্যান্ডের কেমব্রিজভিত্তিক ব্রিটিশ-সুইডিশ বহুজাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল ও বায়োফার্মাসিউটিক্যাল কম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য ভ্যাকসিনকে ন্যায্যতার ভিত্তিতে ও ব্যাপক পরিসরে পাওয়ার পরবর্তী ধাপে নিয়ে গেছে  অ্যাস্ট্রাজেনেকা। বিশ্বে করোনার টিকা সরবরাহের লক্ষ্যে গ্লোবাল অ্যাকশন ফর ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গ্যাভি), কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশন্স (সেপি) ও সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে (এসআইআই) অ্যাস্ট্রাজেনেকার চুক্তি হয়েছে। এর আওতায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবিত করোনার সম্ভাব্য টিকা অনুমোদন পেলেই অ্যাস্ট্রাজেনেকা ২০০ কোটি ডোজ উৎপাদন করবে। এর মধ্যে ১০০ কোটি সরবরাহ করা হবে বিশ্বের দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে।

অ্যাস্ট্রাজেনেকার আশা, আগামী আগস্ট মাস নাগাদ অক্সফোর্ডের সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের ‘ট্রায়াল’ (পরীক্ষা-নিরীক্ষা) শেষ হলেই তা অনুমোদন পর্যায়ে যাবে। এরপর সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ সম্ভাব্য সেই ভ্যাকসিন উৎপাদন শুরু হতে পারে। তবে প্রথম দিকের ৪০ কোটি ভ্যাকসিন পাবে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের সেন্টার ফর ভ্যাকসিন ডেভেলপমেন্টের এপিডেমিওলস্টি ডক্টর দিলরুবা নাসরিন গত সপ্তাহে কালের কণ্ঠকে বলেছিলেন, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। সেই চুক্তি অনুযায়ী প্রথম ১০০ কোটি ভ্যাকসিন দিতে হবে যুক্তরাজ্যকে। তিনি আরো বলেছিলেন, গ্যাভি পুরো বিশ্বকে একসঙ্গে ভ্যাকসিন দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।

জানা গেছে, ওই চেষ্টার অগ্রগতি হিসেবে অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে গ্যাভি, সেপি ও এসআইআইর চুক্তি হয়েছে। বিনিয়োগকারী, উৎপাদনকারী, সরবরাহকারী—সবার দৃষ্টি বেশ কিছু ল্যাবরেটরির দিকে। নভেল করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) মহামারি থেকে বিশ্বকে রক্ষায় টিকা উদ্ভাবনে তোড়জোড় চলছে। আর এরই মধ্যে শীর্ষ ১০ প্রতিযোগীর মধ্যে অনেকটাই এগিয়ে গেছে অ্যাস্ট্রাজেনেকা। গতকাল শুক্রবার বিকেলে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অ্যাস্ট্রাজেনেকা ‘ফেজ থ্রির’ (অনুমোদনের আগে তিনটি ধাপের শেষ ধাপ) খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।

জানা গেছে, অ্যাস্ট্রাজেনেকার সম্ভাব্য করোনা ভ্যাকসিনটির নাম ‘এজেডডি১২২২’। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনার ইনস্টিটিউট ‘এজেডডি১২২২’ উদ্ভাবনে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপের সঙ্গে কাজ করেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য টিকা গ্রহণে আগ্রহী প্রায় ১০ হাজার প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির শরীরে বর্তমানে ‘এজেডডি১২২২’ প্রয়োগ করা হচ্ছে। অ্যাস্ট্রাজেনেকা জানিয়েছে, তাদের টিকা এখন পর্যন্ত ‘নিরাপদ ও সহিষ্ণু’ বলেই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।

বিশ্বখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানেসেটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওষুধ উৎপাদনকারীরা করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে রীতিমতো প্রতিযোগিতা করছে। ইতিমধ্যে ১০টি শীর্ষ প্রতিযোগী ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল’ ধাপেও পৌঁছে গেছে। তবে এর পরও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

ল্যানসেটের তথ্য অনুযায়ী, ভ্যাকসিন উদ্ভাবন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন গত বছর প্রথমবারের মতো ইবোলা ভাইরাসের প্রথম ভ্যাকসিন অনুমোদন করেছে। অথচ প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়েছে আরো ৪৩ বছর আগে। অনেক বিনিয়োগের পরও এইচআইভি বা রেসপিরেটরি সিনিক্যাল ভাইরাসের ওষুধ আবিষ্কারে সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে। একটি ভ্যাকসিন আবিষ্কারে গড়ে ১০ বছর সময় লাগে। চলমান করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে সবাই আশা করছে, এবারের হিসাবটা ভিন্ন হবে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই করোনার টিকা পাওয়া যাবে। ল্যানসেটের নিবন্ধে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের টিকা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে হিসাব অন্যরকম হতেও পারে।

ইতিমধ্যে সম্ভাব্য ১০টি ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যায়ে আছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ‘ফেজ থ্রি’তে যাবার ব্যাপারে আশাবাদী। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলছেন, আগামী দেড় বছরের মধ্যে টিকা পাওয়ার চিন্তা বড্ড বাড়াবাড়ি। তবে অনেকে আবার বলছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ কয়েক কোটি ডোজ ভ্যাকসিন তৈরি সম্ভব হতে পারে।

এগিয়ে থাকা সম্ভাব্য ১০ টিকা : জানা গেছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিভিন্ন ধাপে থাকা ১০টি সম্ভাব্য টিকাকে ঘিরে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ‘এমআরএনএ-১২৭৩’ টিকা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না অ্যান্ড এনআইএআইডি। বর্তমানে ‘ফেজ টুতে’ থাকা ‘এমআরএনএ-১২৭৩’ এমআরএনএ ভ্যাকসিন। বায়োএনটেক অ্যান্ড ফাইজারের সম্ভাব্য এমআরএনএ ভ্যাকসিন ‘বিএনটি১৬২’ আছে ফেজ ওয়ান ও টুয়ের মাঝামাঝি পর্যায়ে। ইনোভায়ো ফার্মাসিউটিক্যালসের সম্ভাব্য ডিএনএ ভ্যাকসিন ‘আইএনও-৪৮০০’ আছে ‘ফেজ ওয়ানে’। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার সম্ভাব্য অ্যাডিনোভাইরাস ভ্যাকসিন ‘এজেডডি১২২২ আছে ‘ফেজ টু-বি ও থ্রির’ মাঝামাঝি। ক্যানসিনো বায়োলক্সি এর সম্ভাব্য অ্যাডিনোভাইরাস ভ্যাকসিন ‘অ্যাডি৫-এনকভ’ আছে ‘ফেজ টুতে’। চীনের উহান ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিক্যাল প্রডাক্টস অ্যান্ড সিনোফার্ম প্রস্তাবিত ইনঅ্যাক্টিভেটেড ভাইরাস ভ্যাকসিন আছে ‘ফেজ ওয়ান’ ও ‘টুর’ মাঝামাঝি। বেইজিং ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিক্যাল প্রডাক্টস অ্যান্ড সিনোফার্মও  ইনঅ্যাক্টিভেটেড ভাইরাস ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের সম্ভাব্য ভ্যাকসিন আছে ‘ফেজ ওয়ান’ ও ‘টুর’ মাঝামাঝি পর্যায়ে। সিনোভ্যাকের সম্ভাব্য ইনঅ্যাক্টিভেটেড ভাইরাস অ্যান্ড অ্যাজুভেন্ট ভ্যাকসিন ‘পিকোভ্যাক’ও আছে ফেজ ওয়ান ও টুর মাঝামাঝি পর্যায়ে।

ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল বায়োলজি অ্যান্ড চায়নিজ একাডেমি অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসের সম্ভাব্য ইনঅ্যাক্টিভেটেড ভাইরাস ভ্যাকসিন আছে ‘ফেজ ওয়ানে’। নোভাভ্যাক্সের সম্ভাব্য প্রটিন সাবইউনিট ভ্যাকসিন ‘এনভিএক্স-কভ২৩৭৩’ আছে ফেজ ওয়ান ও টুয়ের মাঝামাঝি। এগুলোর কোনো একটির সফল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ হলেই অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপরই সেগুলো বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বিতরণ করা যাবে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ সবার জন্য সুলভে করোনার টিকা পাওয়ার ওপর জোর দিয়ে আসছে। গত মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সম্মেলনে এসংক্রান্ত একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা