kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

করোনা পরীক্ষা করাতে গিয়ে অগ্নিপরীক্ষা

তৌফিক মারুফ ও নিখিল ভদ্র   

৫ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



করোনা পরীক্ষা করাতে গিয়ে অগ্নিপরীক্ষা

এক মাসের ব্যবধানে দেশে দৈনিক করোনাভাইরাস পরীক্ষার সংখ্যা দ্বিগুণ, আক্রান্ত শনাক্তের সংখ্যা প্রায় ছয় গুণ বাড়লেও এখনো চাহিদার তুলনায় পরীক্ষা হচ্ছে নিতান্তই কম। প্রতিদিনই করোনাভাইরাস পরীক্ষায় আগ্রহী মানুষকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। দিনের পর দিন ঘুরে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে, জানা-অজানা সংক্রমিত-অসংক্রমিতদের ভিড়ে মিশেও বেশির ভাগ মানুষ পরীক্ষা করাতে পারছে না। এ অবস্থায় ভেতরে ভেতরে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার আরো বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারি তথ্যানুসারে গত এক মাসে পরীক্ষাগার ও নমুনা সংগ্রহের পরিধি অনেক বাড়লেও বেশির ভাগ মানুষ এর সুফল থেকে বঞ্চিত। এমনও দেখা গেছে, কোনো কোনো পরীক্ষাগার কিছুদিন কাজ চালানোর পর হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। নমুনা সংগ্রহের কাজেও দেখা দিয়েছে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা। রীতিমতো তদবির করে কেউ কেউ পাচ্ছে পরীক্ষার সুযোগ। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরীক্ষার সুযোগ যদি আরো সহজ করা না হয়, তবে মানুষের বিপদ আরো বাড়বে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, দেশে বর্তমানে ৫২টি পরীক্ষাগারে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ২৮টি এবং বাকিগুলো ঢাকার বাইরে। অন্যদিকে নমুনা সংগ্রহের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এ পর্যন্ত ঢাকায় ৫০টির বেশি বুথ স্থাপন করা হলেও এরই মধ্যে অনেকগুলো নানা কারণে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এর অন্যতম কারণ, নমুনা সংগ্রহকারী জনবল সংকট।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান মতে, গত ৪ মে দেশে মোট পরীক্ষার সংখ্যা ছিল ছয় হাজার ২৬০, যা গতকাল বৃহস্পতিবার দাঁড়ায় ১২ হাজার ৬৯৪-এ। অন্যদিকে গত ৪ মে শনাক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ৬৮৮, গতকাল এই সংখ্যা দাঁড়ায় দুই হাজার ৪২৩-এ। সর্বশেষ তথ্যানুসারে গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে তিন লাখ ৫৮ হাজার ২৭৭টি। আর সংক্রমিত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে ৫৭ হাজার ৫৬৩ জন। মোট নমুনা পরীক্ষার মধ্যে ১৬ শতাংশ পজিটিভ, বাকি ৮৪ শতাংশ নেগেটিভ ফল এসেছে। এ নিয়ে রয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষজ্ঞদের অনেকে পরীক্ষার মান ও নমুনা সংগ্রহ নিয়ে যেমন প্রশ্ন তুলেছেন, আবার অনেকে ভীতসন্ত্রস্ত বা কৌতূহলী মানুষের মধ্যে পরীক্ষার আগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় এমন ফল আসছে বলে মনে করছেন।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবেই পরীক্ষার আগ্রহ ও চাহিদা রয়েছে। তবে এর পার্সেন্টেজ ঠিক কী রকম সেটি এখনো নিরূপণ করা যায়নি। আমরা রোগতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে এ ধরনের মহামারির সময়ে সংক্রমণের মাত্রা ১০ থেকে ৩০ গুণ বলে ধরে থাকি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেভাবে দেখলে চলবে না। কারণ করোনাভাইরাসের গতি-প্রকৃতি এ পর্যন্ত যতটুকু নিশ্চিত হওয়া গেছে, তাতে বলা যায় দেশে এ পর্যন্ত যা শনাক্ত হয়েছে, হয়তো তার চেয়ে অনেক বেশি সংক্রমণ ঘরে থাকতে পারে।’

পরীক্ষার প্রতি মানুষের চাহিদা এত বেশি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেহেতু কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে, ফলে কোনো একটি কমিউনিটিতে কেউ সংক্রমিত হলেই অন্য সবাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পরীক্ষার জন্য আগ্রহী হয়। কিন্তু দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই ফলাফল আসছে নেগেটিভ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নমুনা সংগ্রহ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা জানান, তাঁরা অনেক বুথের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখেছেন ৩০ জনের মধ্যে মাত্র দুজনের পজিটিভ এসেছে, বাকি সবার নেগেটিভ। এ থেকে বোঝা যায়, ওই বুথে যারা নমুনা দিতে এসেছিল, তাদের বেশির ভাগ ভয়ে বা কৌতূহল নিয়ে পরীক্ষা করতে এসেছে।

পরীক্ষা নিয়ে বিশৃঙ্খলার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘প্রতিদিনই চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু সে অনুযায়ী আমাদের সক্ষমতা এখনো পর্যাপ্ত নয়। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। জনবল সংকট আর ল্যাবে পরীক্ষার সক্ষমতারও ঘাটতি রয়েছে। কয়েকটি ল্যাব আবার বন্ধ হয়ে গেছে। তারা আর পরীক্ষা করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।’

এদিকে দেশের জনসংখ্যা অনুপাতে পরীক্ষার মাত্রা বিশ্লেষণ করে নমুনা সংগ্রহের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। রিয়েল টাইম ইসিআর মেশিনের পরীক্ষার ওপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনের কারণে বিশ্বব্যাপী এ পর্যন্ত এ পদ্ধতিতে পরীক্ষাকেই গ্রহণযোগ্য ধরা হয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। কোনো কোনো দেশে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনো তার অনুমোদন দেয়নি। বাংলাদেশও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনার বাইরে নিজস্ব উদ্যোগে অ্যান্টিবডি পরীক্ষায় উৎসাহিত হচ্ছে না।

বিশ্বের কোথায় কী হারে পরীক্ষা হচ্ছে তার ওপর দৃষ্টিপাত করে দেখা যায়, বাংলাদেশ শুরুর দিকে খুব খারাপ অবস্থায় থাকলেও গত এক মাসের ব্যবধানে তুলনামূলকভাবে বেশির ভাগ দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘করোনাভাইরাস নিয়ে আরো মনোযোগী হওয়া দরকার। নমুনা পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা দরকার। সন্দেহভাজন হলেই পরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত তাকে অন্যের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা উচিত।’

দেশের করোনাভাইরাস পরীক্ষা পরিস্থিতির কিছু চিত্র তুলে ধরা হলো।

সানজিদুল হাসান পেশায় ব্যবসায়ী। থাকেন রাজধানীর রায়েরবাজার এলাকায়। দুই সপ্তাহ আগে থেকে জ্বর। একে একে করোনার অন্যান্য উপসর্গও দেখা দিয়েছে। স্ত্রী তুলি হাসানেরও জ্বর ও গলা ব্যথা। স্বাভাবিকভাবে তাঁদের দুশ্চিন্তা বাড়ে। নমুনা পরীক্ষার জন্য তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও এখনো নমুনা পরীক্ষা করাতে পারেননি।

তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথমে স্বাস্থ্য বাতায়নের হটলাইন ১৬২৬৩ নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করি। দিনভর চেষ্টার পর ওই নম্বর থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনা পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু বহু চেষ্টার পরও সেখানে অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করতে পারিনি। এরপর পরিচিত এক চিকিৎসকের পরামর্শে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখি দীর্ঘ লাইন। ফিরে এসে যোগাযোগ করি হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে। ১ জুন সেখানে নমুনা পরীক্ষার কথা থাকলেও হঠাৎ হাসপাতাল থেকে দুই দিন পর যোগাযোগ করতে বলা হয়। এরপর বেসরকারি সার্ভিস প্রদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ করেও সুফল মেলেনি।’

একই অভিযোগ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী আসাদুর রহমানের। তিনি জানান, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় টেলিফোনে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়ে তিনি বাসায় গিয়ে করোনার নমুনা সংগ্রহ করে—এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করেন। প্রভা হেলথ, ডিএমএফআর মলিকিউলার ল্যাব অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সিএসবিএফ হেলথ কেয়ার এবং ইউএইচডিপির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনলাইনে যোগাযোগ করে অনেক নম্বর ব্যস্ত ও কিছু নম্বর বন্ধ পেয়েছেন। কোনো কোনো নম্বরে যোগাযোগ করা গেলেও তাদের তালিকা দীর্ঘ বলে জানানো হয়েছে। সর্বশেষ তিনি মগবাজারের মধুবাগে আসাদুজ্জামান খান কমপ্লেক্সে ব্র্যাক বুথে গিয়ে নমুনা দিয়েছেন।

করোনা চিকিৎসায় পদে পদে হয়রানির অভিযোগ করে একাধিক করোনা রোগী জানান, পরীক্ষার জন্য টাকা জমা দেওয়া, রসিদ সংগ্রহ এবং নমুনা দেওয়াসহ প্রতিটি জায়গায় দীর্ঘ লাইন ধরতে হচ্ছে। সকাল ৬টায় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় নমুনা দেওয়া যায় না। এ ছাড়া বাড়ি বাড়ি গিয়ে আইইডিসিআর এখন শুধু বয়স্ক বা গুরুতর অসুস্থ মানুষের নমুনা সংগ্রহ করে। অন্যদিকে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে অনেকেই নমুনা দিতে গিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এরপর নমুনা পরীক্ষার ফলাফল পেতে দীর্ঘসূত্রতা তো আছেই। আর নমুনা পরীক্ষার পরও ফলাফল না পাওয়ায় অনেকেই জানতে পারছেন না তাঁর কভিড-১৯ সংক্রমণ রয়েছে কি না। অথচ তিনি বাসা থেকে শুরু করে বাজার, অফিস-আদালতে যাচ্ছেন, অন্যদের মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়াচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হয়রানি বন্ধে করোনা শনাক্তকরণে পরীক্ষাগারের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ফলাফল দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো অনেক জটিলতা রয়েছে। বিশেষ করে, জনবল সংকট আর নমুনা পরীক্ষায় ব্যব হৃত যন্ত্রপাতির সক্ষমতার অভাবে ফলাফল পেতে কয়েক দিন লেগে যাচ্ছে। অনেক হাসপাতালে নমুনা সংগ্রহের জন্য পর্যাপ্ত টেকনোলজিস্ট নেই। কোনো কোনো হাসপাতালে নমুনা সংগ্রহ এবং তা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া দুটি কাজই করতে হয় একজন টেকনোলজিস্টকে। আর নমুনা পরীক্ষার ফলাফল না পাওয়ায় করোনা নেগেটিভ হওয়া রোগীরা অন্য রোগের চিকিৎসা করাতে পারছেন না। এতে করোনা সংক্রমণের পাশাপাশি মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে করোনা পরীক্ষার ফল দ্রুত দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার নমুনা পরীক্ষায় হাসপাতালগুলোয় কিছুটা সমস্যা রয়েছে। আইইডিসিআরের হটলাইনে সারা দেশ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ফোন করে। লাইনগুলো এ কারণে ব্যস্ত থাকে। ফলে টেলিফোনে পেতে কিছুটা সময় লাগে। আর নমুনা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে কারো কারো টেস্ট রিপোর্ট দিতে দেরি হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা