kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

করোনার চিকিৎসা

প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকই ভরসা

তৌফিক মারুফ   

৪ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকই ভরসা

শরীরে আপনা-আপনি অ্যান্টিবডি তৈরি, অ্যান্টিবডির মাত্রা ও প্রয়োগের সময়সীমাসহ নানামাত্রিক জটিল সমীকরণের মুখে প্লাজমা থেরাপি সহজে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না। তেমনি এখনো নিশ্চিত কোনো সমাধান না পাওয়ায় বহুল আলোচিত ইঞ্জেকশন রেমডিসিভির নিয়েও করোনাভাইরাস আক্রান্তদের জন্য এখন পর্যন্ত নেই তেমন কোনো আশার আলো। তবে করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসায় দেশের হাসপাতালগুলোতে মূল ভরসা হয়ে আছে উপসর্গকেন্দ্রিক পুরনো সব অ্যান্টিবায়োটিকসহ অন্য কিছু ওষুধ। এ ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে যাদের অবস্থা জটিল তাদের চিকিৎসা খুবই সীমিত অবস্থায় রয়েছে এখন। যাদের উপসর্গ মৃদু বা মধ্যম পর্যায়ের তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করছেন। সেই সঙ্গে দুই সপ্তাহ ধরে দেশের আলোচিত আইভারমেকটিন ও ডক্সিক্যাপের ডোজ একরকম জনপ্রিয়ই হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ কভিড-১৯ চিকিৎসা হয় এমন প্রায় প্রতিটি হাসপাতালে রোগীদের এই ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এমনকি যাঁরা বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন তাঁদের বেশির ভাগই আইভারমেকটিন ও ডক্সিক্যাপ সেবন করছেন। এ ছাড়া সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে এজিথ্রোমাইসিন। প্রয়োজন অনুসারে এমোক্সিসিলিন কিংবা মেরোপেনামও প্রয়োগ করা হচ্ছে। অন্যদিকে রক্তনালিতে প্রতিবন্ধকতার আগাম প্রতিরোধে কিছু ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে হাসপাতালগুলোতে কোনো কোনো রোগীর ওপর। তবে সব পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরাই জোর দিচ্ছেন কিছুক্ষণ পর পর গরম পানি সেবন, গরম পানির ভাপ নেওয়া এবং শ্বাসকষ্টের জন্য অক্সিজেন সাপোর্ট। করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত বেশির ভাগ রোগীর জন্য বাসা কিংবা হাসপাতালে—এই দুটি পদ্ধতির চিকিৎসা সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের বিশেষজ্ঞ কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা নিয়মিত রোগীদের জন্য কিছু ওষুধ প্রয়োগ করে থাকি। আবার কিছু কিছু ওষুধ নিজেদের দায়িত্বে বিভিন্ন রকম আপডেট খুঁজে খুঁজে প্রয়োগ করে থাকি। এ ক্ষেত্রে একজন চিকিৎসক নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুসারে দায়িত্ব নিয়েই রোগীর ভালোর জন্য এসব ওষুধ প্রয়োগ করেন। এ ক্ষেত্রে জটিল রোগীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। জটিল রোগীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুসারে কিছু রেমডিসিভির ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়, যার সংখ্যা খুবই কম। তবে প্রথম দিকে কিছু হাইড্রক্সি ক্লোরোকুইন প্রয়োগ করা হলেও পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’

একই রোগীকে কয়েক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের ব্যাপারে ওই হাসপাতালের অপর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ‘যেহেতু করোনাভাইরাসের এখনো কোনো চিকিৎসা বা ওষুধ নেই তাই আমরা রোগীর বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ ধরে ধরে চিকিৎসা দিয়ে থাকি। এ ছাড়া হাসপাতালে থাকার ফলে রোগীর মধ্যে যাতে অন্য কোনো ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ভাইরাস বা জীবাণুর সংক্রমণ ঘটতে না পারে সে জন্য সতর্কতামূলকভাবে আমরা কিছু অ্যান্টিবায়োটিক বেশি দিয়ে থাকি। এগুলো অবশ্যই রোগীর ভালোর স্বার্থে।’

এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফার্মাকোলজি সোসাইটির সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাক্তার সায়েদুর রহমান খসরু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি আসলেই জটিল। শুধু বাংলাদেশ না, বিশ্বব্যাপী চিকিৎসায় এখন এমন এক বিশৃঙ্খল অবস্থা চলছে। যে দেশে যে যেভাবে পারছে রোগের ওপর নিজেদের মতো করে ওষুধ প্রয়োগ করছে। এতে রোগীর কতটা ভালো হচ্ছে আর কতটা খারাপ হচ্ছে সেই পর্যবেক্ষণও চলছে জোরালোভাবে। আমরা দেখছি, শুরুতে যে ওষুধ নিয়ে বেশি লাফালাফি হয়েছে এখন সে ওষুধগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তার মানে হচ্ছে, ওই ওষুধ রোগীর উপকারের চেয়ে ক্ষতি করেছে বেশি। আবার এখন যেগুলো নিয়ে বেশি হৈচৈ চলছে সেগুলোর পরিণতি কী, সেটাও কিন্তু এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। তাই বলতে হবে, আমাদের দেশে যে ওষুধগুলো চলছে সেগুলো যতটা সম্ভব বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সমন্বিত নির্দেশনার আওতায় যাতে প্রয়োগ করা হয়। কারণ যে যার মতো করে কোনো ওষুধ নিয়ে রোগীর ওপর এক্সপেরিমেন্ট চালাতে গেলে তাতে যদি রোগীর বিপদ হয় তা কারোই কাম্য নয়। ভালো হলেও সেটা ব্যবহারের আগে অন্ততপক্ষে বিশেষজ্ঞ কমিটির সঙ্গে আলোচনা-পর্যালোচনা করে নেওয়া খুবই জরুরি।’

এই ওষুধ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘হাইড্রক্সিল ক্লোরোকুইন ও এজিথ্রোমাইসিন একসঙ্গে খাওয়ানোর ফলে যে অনেক রোগীর মৃত্যু ত্বরান্বিত করেছে, সেটি এখন বৈশ্বিকভাবেই প্রমাণিত। যে কারণে হাইড্রক্সি ক্লোরোকুইন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমি শুরু থেকেই এই ওষুধ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলাম। এখন যে ওষুধগুলো যেভাবে যত্রতত্র ব্যবহার করা হচ্ছে এগুলো কিন্তু রোগীদের ওপরে কিছুটা হলেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তাই সেদিকে অবশ্যই সরকারের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সজাগ থাকা দরকার। কারণ একসঙ্গে অনেক অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হলে সেগুলোর বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে, যা হয়তো অপেক্ষাকৃত জুনিয়র চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে বুঝতে পারা খুব একটা সহজ না-ও হতে পারে। আর সব কভিড হাসপাতালেই খুব সিনিয়র পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কম আছে। এ ক্ষেত্রে একটা নির্দেশনা তৈরি করা জরুরি।’

এদিকে দেশে করোনা রোগীদের ওপর প্রথম আইভারমেকটিন ও ডক্সিক্যাপ ডোজ শুরু করা বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাক্তার তারেক আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার আমার কাছে প্রটোকল চেয়েছে, আমি প্রটোকল তৈরি করেছি, হয়তো আজকালের মধ্যে জমা দেব। কিন্ত ইতিমধ্যেই সারা দেশে এই ওষুধ সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে আমি জানতে পেরেছি। এ ছাড়া আইসিডিডিআর,বি ইতিমধ্যেই আমার এই উদ্ভাবন নিয়ে পরীক্ষামূলক গবেষণা শুরু করেছে। এ ক্ষেত্রে আমার সঙ্গে সরকার আলাপ করুক বা না করুক মানুষের যদি উপকার হয় সেটি বড় কথা। তবে খুশি হতাম সরকার যদি অন্ততপক্ষে আমার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করত। কারণ এটি আমি প্রথম রোগীদের ওপর প্রয়োগ করে সাফল্য পেয়েছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা