kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে ভোক্তার

► পারিবারিক ও প্রবাসী আয় কমেছে
► পানি বিদ্যুৎ গণপরিবহনে বাড়তি খরচ

রোকন মাহমুদ   

৪ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে ভোক্তার

একে তো কভিড-১৯-এর কারণে সাধারণ মানুষের আয় কমেছে অস্বাভাবিক হারে। বিপাকে পড়েছে প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীলরাও। এর মধ্যে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে সরকারি ও বেসরকারি চার খাতের সেবা-পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। ফলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে ভোক্তাসাধারণের। জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে তারা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনাকালে মানুষের আয় কমে যাওয়ায় একটু স্বস্তি দিতে পারত বিভিন্ন সেবা-পণ্যের মূল্য হ্রাস। কিন্তু হয়েছে উল্টো। সেবা-পণ্যের দাম আরো বেড়েছে। এমন নজির আর কোনো দেশে দেখা যায় না।

বেসরকারি হিসাব মতে, করোনার কারণে দেশে গড় পারিবারিক উপার্জন প্রায় ৭৪ শতাংশ কমে গেছে। ১৪ লাখেরও বেশি প্রবাসী শ্রমিক চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন বা ফিরে আসছেন। কাজ না থাকায় প্রবাসী আয় কমেছে ব্যাপক হারে।

সব মিলিয়ে ভোক্তাদের মনে করোনার মতোই ভর করেছে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর দুশ্চিন্তা। এত কিছুর পরও মার্চ থেকে বেড়েছে বিদ্যুতের দাম, যা এপ্রিল থেকে দিতে হচ্ছে ভোক্তাকে। এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়েছে পানির বর্ধিত দাম, যা মে থেকে দিতে

হচ্ছে। সর্বশেষ চলতি মাসে বাস মালিকদের চাপে সরকার পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি করেছে ৬০ শতাংশ। ভোক্তারা নিত্যপণ্যের বাজারের উত্তাপ সইছে মার্চ থেকেই। চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আদাসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে।

ভোক্তারা বলছে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। একদিকে করোনার দুশ্চিন্তা, কী জানি কী হয়, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। খরচ কমাতে গিয়ে জীবনযাত্রার মান কমে আসছে। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনে ব্যয় কমাতে হচ্ছে। পুষ্টিমানে অবনমন হচ্ছে। এমন অবস্থায় মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখাই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে বলে জানায় তারা।

জানতে চাইলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একদিকে আয় কমে যাওয়া, অন্যদিকে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তারা বিপদে রয়েছে। সরকারের উচিত হবে করোনার কারণে হলেও সরকারি সেবার দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তগুলো স্থগিত রাখা। আমরা সরকারের কাছে এসব বিষয় বিবেচনার জন্য দাবি জানাই। এ ছাড়া পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটা ঠিক হয়নি, এটি অযৌক্তিক। এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি আমরা শুরু থেকেই করে আসছি। পরিবহনের অতিরিক্ত খরচ তেলের দামের সঙ্গে সমন্বয় করা যেত।’

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি : মার্চ থেকে সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে (খুচরা) প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ৩৬ পয়সা বা ৫.৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। প্রতি ইউনিটের দাম ৬ টাকা ৭৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৭ টাকা ১৩ পয়সা। পাইকারিতে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট গড়ে ৪০ পয়সা বা ৮.৪ শতাংশ বেড়েছে। ৪ টাকা ৭৭ পয়সা থেকে বেড়ে প্রতি ইউনিটের দাম হয়েছে ৫ টাকা ১৭ পয়সা। এ ছাড়া বিদ্যুৎ সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ প্রতি ইউনিটে শূন্য দশমিক ২৭৮৭ টাকা থেকে ৫.৩ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয়েছে শূন্য দশমিক ২৯৩৪ টাকা।

পানির দাম বৃদ্ধি : গত ১ এপ্রিল থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরীর ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে পানির বাড়তি দাম। ঢাকা ওয়াসার সরবরাহ করা প্রতি হাজার লিটার আবাসিক পানির দাম ১১ টাকা ৫৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৪ টাকা ৪৬ পয়সা করা হয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রতি হাজার লিটার আবাসিক পানির দাম ৯ টাকা ৯২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা ৪০ পয়সা করেছে।

পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি : সর্বশেষ গত সোমবার থেকে আন্ত জেলা, দূরপাল্লা এবং নগরের বাস ও মিনিবাসের ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। আন্ত জেলা এবং দূরপাল্লার চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের প্রতি কিলোমিটারের সর্বোচ্চ ভাড়া ছিল এক টাকা ৪২ পয়সা। ৬০ শতাংশ বাড়ায় তা ২ টাকা ২৭ পয়সা হচ্ছে। ঢাকা মহানগরীতে বাস ও মিনিবাসের চলাচলের ক্ষেত্রে ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল এক টাকা ৭০ পয়সা এবং চট্টগ্রামে এক টাকা ৬০ পয়সা। ৬০ শতাংশ বাড়ায় এখন তা যথাক্রমে ২ টাকা ৭২ পয়সা ও ২ টাকা ৫৬ পয়সা হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন অথরিটির (ডিটিসিএ) আওতাধীন জেলার (নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ ও ঢাকা জেলা) অভ্যন্তরে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের ভাড়া আগে ছিল প্রতি কিলোমিটারে এক টাকা ৬০ পয়সা। এখন ৬০ শতাংশ বাড়ায় তা হয়েছে ২ টাকা ৫৬ পয়সা। তবে অভিযোগ রয়েছে, এটিও মানছে না বাসচালক ও সহকারীরা। ভাড়া নিচ্ছে দ্বিগুণ বা তারও বেশি।

নিত্যপণ্যে উত্তাপ : দেশে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে গত ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটি শুরু হওয়ার সপ্তাহখানেক আগে থেকেই নিত্যপণ্যের দাম কিছু কিছু করে বাড়ছিল। ছুটি শুরু হতেই চাল, ডাল, তেল, চিনি, আদা, রসুন, পেঁয়াজ, মরিচসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। এপ্রিলের মাঝামাঝিতে ৬৫ টাকার ডালের দাম বেড়ে ৮৫ টাকা হয়, ৫২ টাকার চাল ৬০ টাকা কেজি দরে কিনতে হয়েছে ভোক্তাকে। সব মিলিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে যেন আগুন লেগেছিল। এই উত্তাপ কিছুটা কমলেও এখনো রয়েছে।

আয় কমেছে ৭৪ শতাংশ : ব্র্যাক, ডেটা সেন্স ও উন্নয়ন সমন্বয়ের এক যৌথ সমীক্ষা বলছে, করোনাভাইরাসজিনত রোগ কভিড-১৯-এর কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বহু নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জরিপ বলছে, ৩৪.৮ শতাংশ পরিবারের কমপক্ষে একজন সদস্য চাকরি হারিয়েছে। গত মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে গড় পারিবারিক উপার্জন প্রায় ৭৪ শতাংশ কমে গেছে। দিনমজুরসহ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরতরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। চলতি বছর মার্চের মাঝামাঝি থেকে ৭ এপ্রিলের মধ্যে এক হাজার ১১৬টি কারখানা বন্ধঘোষিত হয়েছে এবং চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ২২ লাখ (২.১৯ মিলিয়ন) শ্রমিক। গত সোমবার এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে এ জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়।

কমেছে প্রবাসী আয় : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত মে মাসে ১৫০ কোটি ৩০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) এসেছে। আগের বছরের একই সময়ে প্রবাসী আয় এসেছিল ১৭৪ কোটি ৮১ লাখ ডলার। সে হিসাবে গত বছরের একই মাসের তুলনায় প্রবাসী আয় কমেছে ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা ১৪.০২ শতাংশ। গত এপ্রিলে ১০৮ কোটি ৬৪ লাখ ডলার প্রবাসী আয় এসেছিল, যা আগের বছর একই সময়ের তুলনায় ৩৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার কম।

রাষ্ট্রায়ত্ত গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘নিম্ন আয়ের মানুষ হিসেবে বটম অব দ্য পিরামিডে শুধু শ্রমিকরা নয়, অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাও আছেন। প্রণোদনা দেওয়ার পরেও শ্রমিকদের ৬০ শতাংশ বেতন দেওয়া হয়েছে। তাদের বাসাভাড়া ও অন্যান্য খরচ তো কমেনি। তাই এই মুহূর্তে বেঁচে থাকার জন্য যাদের প্রয়োজন বেশি তাদের প্রণোদনা বা ভর্তুকির ব্যবস্থা রাখতে হবে।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা