kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

আম্ফানে ‘সব শেষ’ হওয়ার পর বাঁধ সংস্কারে প্রকল্প

৪৭৫ কোটি টাকার প্রকল্পটি একনেকে উঠছে আজ

আরিফুর রহমান   

২ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আম্ফানে ‘সব শেষ’ হওয়ার পর বাঁধ সংস্কারে প্রকল্প

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের বাসিন্দারা জলোচ্ছ্বাস থেকে নিজেদের রক্ষা করতে দিনের পর দিন শক্ত করে বাঁধ নির্মাণের আকুতি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু তাঁদের আকুতি কানে যায়নি কারো। এই শতাব্দীর সুপার সাইক্লোন আম্ফান গত ২০ মে বাংলাদেশ উপকূলে আছড়ে পড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে এই ইউনিয়নটি। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ১০ থেকে ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে ভেঙে গেছে উপকূল রক্ষা বাঁধ। পানির তোড়ে ধসে গেছে ঘরবাড়ি। ভেসে গেছে মাছের ঘের। বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। শ্যামনগর ছাড়াও জেলার আশাশুনি উপজেলাও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে বাঁধ ভেঙে গেছে।

করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে এমন দুর্যোগে ‘সব শেষ’ হওয়ার পর গত ১০ দিন জেলার সাধারণ মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ সংস্কার করছে। যত বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, প্রায় সব কটিরই সংস্কারকাজ শেষ পর্যায়ে।

আম্ফানে বাঁধ লণ্ডভণ্ড হওয়ার পর, জেলার মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমে সেই বাঁধ সংস্কার হওয়ার পর অবশেষে বাঁধ নির্মাণ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প অনুমোদন পেতে চলেছে। আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৪৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকেই এ টাকা জোগান দেওয়া হবে। ২০২৩ সাল নাগাদ প্রকল্পের কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১, ২ ও ৩ নম্বর পোল্ডার। এ ছাড়া ৬, ৭ ও ৮ নম্বর পোল্ডারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব পোল্ডারের মোট ৭৭টা পয়েন্ট ভেঙে গেছে। সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে ২৩টি পয়েন্ট। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘সাতক্ষীরা জেলার ১, ২ ও ৩ নম্বর পোল্ডার এবং ৬, ৭ ও ৮ নম্বর পোল্ডার নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন’ শিরোনামের প্রকল্পটির আওতায় ১১৩ কিলোমিটার বাঁধ পুনঃ আকৃতি করা হবে। অর্থাৎ যেসব বাঁধ আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেসব বাঁধ নতুন আকৃতিতে তৈরি করা হবে।

উদাহরণ দিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, যে বাঁধ ছয় ফুটের আছে, সেই বাঁধের উচ্চতা বাড়িয়ে ১২ ফুট করা হবে। প্রস্থে তিন ফুটের বাঁধ বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হবে। আগে যেখানে নিচু ছিল, সেখানে উঁচু করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের আওতায় ৮৮টি খাল পুনঃখনন করা হবে। এ ছাড়া বেতনা ও মরিচ্চাপ নদীর ৬০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে। এর মধ্যে বেতনা নদীর ২০ কিলোমিটার ও মরিচ্চাপ নদীর ৪০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় ছয়টি স্লুইস গেট ও ২১টি রেগুলেটর মেরামত করা হবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনু বিভাগের যুগ্ম সচিব মন্টু কুমার বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ায় গত আড়াই মাস একনেক সভা হতে পারেনি। তাই প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদন পায়নি। এই প্রকল্পের আওতায় শুধু বাঁধ নির্মাণই নয়, সাতক্ষীরা জেলার জলাবদ্ধতা নিরসনেও কাজ করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, প্রকল্পটি আজ একনেক সভায় অনুমোদন পেলে প্রশাসনিক আদেশ জারি থেকে শুরু করে অন্যান্য আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হতে আরো এক থেকে দুই মাস সময় লাগবে। ওই সময়টা পুরো বর্ষাকাল। ফলে চাইলেই আগামী অক্টোবর কিংবা নভেম্বরের আগে প্রকল্পটির কাজ শুরু করা সম্ভব হবে না।

পানিসম্পদ ও পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রকল্পটি যদি আগে অনুমোদন করা যেত, তাহলে আম্ফানে সাতক্ষীরার এত ক্ষতি হতো না।

পরিকল্পনা কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। আর প্রথম করোনা সংক্রমণে  মারা যায় ১৮ মার্চ। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে আড়াই মাস ধরে চলেছে সাধারণ ছুটি। ফলে ছুটির কারণে একনেক সভাও হতে পারেনি। আজ ফের একনেক সভা হতে যাচ্ছে। অবশ্য একনেক সভা হবে ভার্চুয়াল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থাকবেন গণভবনে। আর অন্য মন্ত্রী ও সচিবরা উপস্থিত থাকবেন রাজধানীর শেরেবাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে। সব মন্ত্রী ও সচিবকে থাকতে হবে না। শুধু যাঁরা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট, তাঁরাই থাকবেন।

কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, আজকের একনেক সভায় মোট ১০টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে। এর মধ্যে অবশ্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের চারটি প্রকল্প বিশেষ বিবেচনায় আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুমোদন করেছেন। আজ শুধু অনুমোদিত সেই চারটি প্রকল্প ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দেওয়া হবে। বাকি ছয়টি প্রকল্প সরাসরি অনুমোদন দেওয়া হবে।

এ ১০টি প্রকল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিশ্বব্যাংকের ঋণে এক হাজার ১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে করোনা মোকাবেলা প্রকল্প, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণে এক হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে করোনা মোকাবেলা প্রকল্প, প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি প্রকল্প এবং মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম। দাসেরকান্দি পয়ঃশোধানাগার প্রকল্পটি সংশোধিত আকারে আজ একনেক সভায় উঠছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা