kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ

► অর্থপাচার ঠেকানোর চাপ বাড়ছে
►জোরালো হচ্ছে কালো টাকা বিনিয়োগে আনার দাবি
► ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী করার সুপারিশ বিশ্লেষকদের

ফারুক মেহেদী   

২ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ

করোনায় অর্থনীতি বিপর্যস্ত। সরকারের আয় না থাকলেও অর্থনীতি পুনর্গঠন করতে হবে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখাই হবে সামনের দিনগুলোতে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

একদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতের উন্নয়ন, অর্থপাচার রোধ, কালো টাকাকে বিপুল হারে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করে সরকারের অর্থের সংস্থান করা; অন্যদিকে করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ত্বরান্বিত করতে ঘোষিত প্রণোদনার কার্যকর বাস্তবায়ন। এসব কাজ সমন্বিতভাবে সরকার করতে পারলে শত নেতিবাচক অবস্থার মধ্যেও অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি পাবে বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষক, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকরা। তাঁরা জানান, করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে উন্নত-অনুন্নত সব দেশই তাদের সক্ষমতার পুরোটা ঢেলে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বাংলাদেশকেও টিকে থাকতে হলে দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতি নিয়ে সারা বিশ্বের বিস্ময় আছে। কিন্তু করোনাকালের সংকটে দেশটি কিভাবে তার অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা সচল রাখে, সেটা এখন একটা চ্যালেঞ্জ। এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ধারা তলানিতে এসে ঠেকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের আগামী দিনের প্রবৃদ্ধি ৮.২ শতাংশ থেকে নেমে ২ থেকে ৩ শতাংশে চলে আসবে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের নিজস্ব বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে চাপ তৈরি হচ্ছে। যদিও সরকার এরই মধ্যে প্রায় লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। তবে এ প্রণোদনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নও সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করার জন্য সরকারের বিপুল অর্থের প্রয়োজন। রাজস্ব আয় থেকে সরকারের বিপুল অর্থের সংস্থান কঠিন হয়ে উঠছে। তাই জোর আলোচনা শুরু হয়েছে অর্থনীতিতে থাকা কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয়কে বিনা প্রশ্নে বৈধতা দেওয়ার।

জানা যায়, সরকার ২০১৩ সালে আয়কর অধ্যাদেশের ১৯-এর বিবিবিবিবি ধারায় যেভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়, সেটা বিনিয়োগবান্ধব নয়; বরং হয়রানিমূলক ছিল। এর আগে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিনা প্রশ্নে বৈধভাবে অর্জিত অপ্রদর্শিত আয় আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ায় বিপুল অঙ্কের টাকা অর্থনীতিতে চলে আসে। পরে এ সুযোগ তুলে দেওয়ায় টাকা পাচার হতে থাকে বিদেশে। এখন আলোচনা হচ্ছে, বিনা প্রশ্নে কালো টাকা আবাসন, কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে সরকারের হাতে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো, যা অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সরকার বিনিয়োগ করবে।

এ বিষয়ে এনবিআরের আয়কর নীতির সাবেক সদস্য ড. সৈয়দ আমিনুল করিম গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার কারণে বিশ্ব এক নতুন বাস্তবতার মধ্যে যাচ্ছে। দেশে সরকারের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। সরকারকে মানুষের হাতে টাকা পৌঁছানোর জন্য নানা পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজস্ব যেহেতু আসবে না; তাই কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয় সহজ শর্তে, বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগ করতে দেওয়া উচিত। টাকা বিনিয়োগ না হলে, আর কড়াকড়ি থাকলে তা পাচার হয়ে যাবে। সরকারের হাতে বিপুল অঙ্কের টাকার প্রবাহ বাড়াতে হলে এসব পদক্ষেপ নিতে হবে। এর পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রের কড়াকড়িও শিথিল করতে হবে। আমি মনে করি, কড়াকড়ি একেবারে উঠিয়ে দেওয়া উচিত। মানুষ বিনিয়োগের সুযোগ না পেলেই টাকা অবৈধ কর্মকাণ্ডে চলে যায় কিংবা মানি লন্ডারিং হয়। আশা করি, সরকার বিষয়গুলো এবার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবে।’

পাশাপাশি হুন্ডি বন্ধ করে বৈধ পথে বিদেশি আয় দেশে আনার আরো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। এরই মধ্যে সরকার বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে ২ শতাংশ প্রণোদনা দিয়েছে। সামনে এ প্রণোদনার হার আরো বাড়িয়ে প্রবাসীদের উৎসাহিত করার কথাও উঠছে বিভিন্ন মহলে।

জানা যায়, শুধু হুন্ডিই নয়, জাল-জালিয়াতি করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে বিপুল অঙ্কের টাকা পাচারের ঘটনাও বাংলাদেশে রীতিতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটি বা জিএফআইয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, ২০১৫ সাল পর্যন্ত আগের ১১ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৬ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। শুধু ২০১৫ সালেই পাচার হয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের পর তথ্য না থাকলেও ধারণা করা হয়, গড়ে বছরে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। জিএফআই মনে করে, বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যের ১৯ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে পাচার হচ্ছে। অনেক আলোচনা ও বিতর্কের পরও এ অনিয়ম বন্ধ হচ্ছে না; বরং বাড়ছে। এমনকি বিদেশ থেকে পাচারের টাকা ফিরিয়েও আনা যাচ্ছে না। এখন করোনার প্রেক্ষাপটে বিশেষ প্রণোদনায় ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপের পাশাপাশি পাচারের সংস্কৃতি বন্ধের বিষয়টিও জোরালো আলোচনায় রয়েছে। পাচার বন্ধ করলে যেমন সরকারের হাতে অর্থের প্রবাহ বাড়বে, তেমনি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ালেও সরকার তথা অর্থনীতি লাভবান হবে। পাচারের সঙ্গে যুক্ত বন্ডের অপব্যবহারের বিষয়টিও। রপ্তানি বাণিজ্য প্রসারে সরকার বন্ড সুবিধা দিলেও এর অপব্যবহার হচ্ছে অহরহ। এ অপব্যবহারের ফলে বছরে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয় প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। যেহেতু সরকারের সামনে অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন, তাই বন্ডের অপব্যবহার রোধ করে ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব অর্থনীতিতে ফেরানোর কথা উঠছে জোরেশোরে।

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিচালক শেখ মনোয়ার হোসেন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেভাবেই বলেন না কেন, অর্থনীতিতে টাকা লাগবে। বিনিয়োগ লাগবে। অর্থনীতিতে টাকা ঢোকাতে হবে।’ তিনি বলছিলেন, সবচেয়ে ভালো উপায় হলো বিদেশে যারা ভালো অবস্থায় আছে, যাদের কেউ ওখানে নিজেরা প্রতিষ্ঠিত, কেউ বা দেশে থেকে কোনো না কোনোভাবে টাকা নিয়ে বসবাস করছেন। এসব টাকা দেশে ফেরানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে সরকার বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করতে পারে। কারণ আইনি ব্যবস্থায় টাকা ফিরিয়ে আনা কঠিন। ওই পথে গেলে তা আর বাস্তবায়ন হবে না। তাদের উৎসাহিত করে দেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে হবে। সরকারকে এসব ব্যাপারে আরো উদার হতে হবে। জটিলতা কমাতে হবে। মানুষের হাতে টাকা আসার কার্যক্রম সরকারকে নিতে হবে। অর্থনীতি যাতে বসে না যায়, বিনিয়োগ যেন থমকে না যায়। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে আমলাতন্ত্র কমাতে হবে। বিনিয়োগকে অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। না হলে মানুষ কাজ পাবে না। সরকারকে তাদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা দীর্ঘ সময়ে অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়।

সর্বোপরি ব্যাংকিং ব্যবস্থা অর্থনীতির রক্ত প্রবাহ হিসেবে পরিচিত হলেও এ খাতের দুর্বল ভিত্তি শক্ত করাও সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এ খাতকে শক্তিশালী করার কথা বলা হচ্ছে সর্বমহল থেকেই। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে এ খাত চরম নাজুক অবস্থার মধ্যে রয়েছে। অব্যবস্থাপনা, লুটপাট, ঋণখেলাপি, পরিচালকদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির অভাব ব্যাংকিং খাতকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। করোনার ক্ষতি মোকাবেলায় এ ব্যাংকিং খাতই সরকারের ঘোষিত প্রণোদনার একটি বড় অংশ জোগান দিয়েছে। সরকারের দুঃসময়ে ব্যাংকিং খাতই অর্থের প্রবাহ ধরে রাখে। তাই আগামী দিনে অর্থনীতিতে যেসব চ্যালেঞ্জ আসছে, তখনো ব্যাংকিং খাত বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এ জন্য এ খাতকে শক্তিশালী করা, খেলাপি ঋণ আদায়, দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি উঠেছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে করোনার ক্ষতিতেও অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করা হয়।

অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে নারীদের আরো বেশি কাজে সম্পৃক্ত করা, তাদের গৃহস্থালী কাজকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আওতায় আনাও সরকারের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। চলমান জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে বেশি বেশি কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার করার চাপ আছে সরকারের সামনে। সরকারের সামনে বিভিন্ন খাতকে চাঙ্গা করার চ্যালেঞ্জও আছে। শিল্প ও সেবা খাত চাঙ্গা না থাকলে অর্থনীতিতে স্থবিরতা আসার আশঙ্কা আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা