kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ আষাঢ় ১৪২৭। ৯ জুলাই ২০২০। ১৭ জিলকদ ১৪৪১

অনিয়মেই শুরু লঞ্চে যাত্রী চলাচল

► চাঁদপুরে যাত্রীর চাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ বন্দর কর্মকর্তা বরখাস্ত
► ঝালকাঠিতে স্বাস্থ্যবিধি মানা নিয়ে প্রশ্ন

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অনিয়মেই শুরু লঞ্চে যাত্রী চলাচল

লঞ্চ চলাচল শুরুর দিনেই গতকাল দক্ষিণাঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ ফেরে রাজধানীতে। এই যাত্রাকালে মানা হয়নি করোনা রোধের সামাজিক দূরত্ব। গতকাল সদরঘাটের চিত্র। ছবি : কালের কণ্ঠ

করোনা পরিস্থিতির কারণে টানা দুই মাসের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ফের চলাচল শুরু করেছে নদীপথে যাত্রীবাহী লঞ্চ। তবে অনেক স্থানে মানা হচ্ছে না সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি। ফলে এ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মেনেই চলাচল করছে লঞ্চগুলো। কালের কণ্ঠ’র প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদ— 

চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, চাঁদপুর-ঢাকাসহ অন্যান্য নদীপথে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে। গতকাল রবিবার সকালে কয়েকটি লঞ্চ নিয়মনীতি না মেনে বাড়তি যাত্রী নিয়ে রাজধানীর সদরঘাটের উদ্দেশে চাঁদপুর ত্যাগ করে। এমন পরিস্থিতিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতায় গতকাল দুপুরের পর থেকে

জেলা প্রশাসন, জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও নৌ পুলিশ চাঁদপুর লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রী নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করে। এরই অংশ হিসেবে লঞ্চে যাত্রী নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় চাঁদপুর বন্দর কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কর্তৃপক্ষ।

সরকারি সিদ্ধান্তে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল শুরু করলে গতকাল সকালে শুধু স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করে দুটি লঞ্চ বাড়তি যাত্রী নিয়ে সদরঘাটের উদ্দেশে চাঁদপুর ছেড়ে যায়। এ সময় লঞ্চগুলোতে কোনো ধরনের শারীরিক দূরত্ব বজায় না রেখে যাত্রীরা রওনা করেন। এই দৃশ্য গণমাধ্যমে প্রচার হলে দুপুর থেকে নড়েচড়ে বসে জেলা প্রশাসন, জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও নৌ পুলিশ। 

এ সময় সরকারি নিয়ম না মানায় একটি লঞ্চ থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয়। পরে সীমিত যাত্রী নিয়ে ওই লঞ্চটি সদরঘাটের উদ্দেশে চাঁদপুর ছেড়ে যায়।  জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোরশেদুল ইসলাম জানান, যাত্রী সুরক্ষা নিয়ম না মানলে লঞ্চ মালিক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে যাত্রীদেরও সচেতনভাবে ভ্রমণের অনুরোধ জানান তিনি।

এদিকে দায়িত্বে অবহেলার জন্য চাঁদপুর বন্দর কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাককে সাময়িক বরখাস্ত করার পর সেখানে নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিআইডাব্লিউটিএর উপপরিচালক মো. আবুল বাশারকে।

ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, লঞ্চ ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই ঝালকাঠির যাত্রীরা ঢাকা যেতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় ঝালকাঠি ঘাট থেকে ছেড়ে যায় সুন্দরবন-১২ নামের একটি যাত্রীবাহী লঞ্চ। প্রথম দিনের কেবিনের টিকিট এক দিন আগেই শেষ হয়ে যায়। অনেক যাত্রী ডেকে আসন ঠিক রাখতে আগেই চাঁদর বিছিয়ে রেখে গেছেন। লঞ্চ ছাড়ার সময় ঢাকাগামী মানুষের ঢল নামে। তবে পুলিশ অতিরিক্ত যাত্রীদের বাড়ি ফিরিয়ে দেয়। যাত্রীরা অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে লঞ্চে ধারণক্ষমতা পূর্ণ করেই লঞ্চ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। তবে লঞ্চের স্থানীয় ঘাট সুপারভাইজাররা দাবি করছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই লঞ্চ ছাড়া হচ্ছে। সন্ধ্যায় লঞ্চ ছাড়লেও অনেক যাত্রী সকালে এসে আসন দখল করেছেন। চাকরিতে যোগদান করতে ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা ঢাকা যাচ্ছেন।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বল্প পরিসরে লঞ্চ চলাচলের ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধির দিকে নজর না দিয়ে কর্তৃপক্ষ অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করে।

লঞ্চ কর্তৃপক্ষ জানায়, ঝালকাঠি থেকে প্রতিদিন একটি করে লঞ্চ ছেড়ে যায় চাঁদপুর ও ঢাকার উদ্দেশে। আবার ঢাকা থেকেও একটি লঞ্চ আসে এখানে। এর মধ্যে একটি সুন্দরবন-১২ অপরটি ফারহান-৭ লঞ্চ। দুটি লঞ্চেই ঝালকাঠি থেকে ঢাকা যাওয়ার জন্য রবি ও সোমবারের কেবিন বুকিং হয়ে গেছে।

গতকাল বিকেল ৫টায় লঞ্চঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, লঞ্চে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। লঞ্চের প্রবেশদ্বারেই রয়েছে জীবাণুনাশক টানেল। হাত ধোয়ারও ব্যবস্থা রেখেছে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ। তবে এসব কিছু মানছেন না যাত্রীরা। বিকেল ৪টার মধ্যে লঞ্চের ডেকে যাত্রী পরিপূর্ণ হয়ে যায়। বিকেল ৫টার পরে শুধু কেবিনের বুকিং করা যাত্রীদের ঢুকতে দেওয়া হয়। তবে লঞ্চ ছাড়ার সময় হুমড়ি খেয়ে যাত্রীরা লঞ্চে উঠে পড়েন।

সুন্দরবন-১২ লঞ্চের ঝালকাঠি ঘাট সুপারভাইজার আবু হানিফ বলেন, ‘লঞ্চের কেবিনের টিকিট শেষ হয়ে গেছে। ডেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে যাত্রীরা যেতে পারবেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই যাত্রীদের গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হবে। অতিরিক্ত কোনো যাত্রী আমরা লঞ্চে উঠতে দিইনি।’

ফারহান লঞ্চের ঘাট সুপারভাইজার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘আমাদের লঞ্চে জীবাণুনাশক স্প্রে করার ব্যবস্থা রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং তিন ফুট নিরাপদ দূরত্বে যাত্রীদের রাখা হবে। লঞ্চে এরই মধ্যে দূরত্ব বজায় রেখে রং দিয়ে এঁকে দেওয়া হয়েছে আসন।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে টানা দুই মাস পাঁচ দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল সকাল থেকে লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে। সরেজমিনে গতকাল দুপুরে দেখা যায়, দৌলতদিয়া লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীর অপেক্ষায় বেশ কয়েকটি লঞ্চ। টার্মিনালের প্রবেশ পথে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে আসা যাত্রীরা সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়ার পর সামাজিক দূরত্ব মেনে লঞ্চে উঠছেন। দৌলতদিয়া লঞ্চঘাট ম্যানেজার মো. নুরুল আনোয়ার মিলন জানান, দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সড়ক যোগাযোগে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। টানা দুই মাস পাঁচ দিন বন্ধের পর রবিবার সকাল সোয়া ৯টা থেকে এই নৌপথে লঞ্চ চলাচল ফের শুরু হয়েছে। চলাচলকারী প্রতিটি লঞ্চে যাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এদিকে ঈদ শেষে এখনো ঢাকাগামী মানুষের চাপ নেই। তাই ধারণক্ষমতার অর্ধেকেরও কম যাত্রী নিয়ে লঞ্চগুলো চলাচল করছে। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে প্রাপ্ত বয়স্ক প্রতিজন যাত্রীর লঞ্চভাড়ার টিকিট মূল্য ২৫ টাকা। সরকার নির্ধারিত ওই টিকিট মূল্যের অতিরিক্ত কারো কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে না।

দৌলতদিয়া লঞ্চঘাটে কর্মরত বিআইডাব্লিউটিএর ট্রাফিক পরিদর্শক মো. আবতাব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে এই নৌপথে ১৭টি লঞ্চ সার্বক্ষণিক চলাচলের জন্য রাখা হয়েছে। যাত্রীর চাপ বাড়লে লঞ্চের সংখ্যাও বাড়ানো হবে।’

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, লকডাউন শেষে গতকাল রবিবার সকাল থেকে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুটে লঞ্চ ও সিবোট চলাচল শুরু করেছে। এতে ঘাটে কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে।

গতকাল সকালে শিমুলিয়া ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, আবারও যাত্রীর পদচারণে প্রাণ ফিরে পেয়েছে লঞ্চ ও সিবোট ঘাট। পারাপার শুরু হয়েছে নৌযানে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে লঞ্চগুলোতে তোলা হচ্ছে যাত্রী। তবে এ নৌ রুটের এক শ্রেণির লঞ্চ মালিক স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করেই কাঁঠালবাড়ী ঘাট থেকে ধারণ ক্ষমতার তিন গুণ বেশি যাত্রী নিয়ে শিমুলিয়া ঘাটে আসছেন।

বিআইডাব্লিউটিএর নৌ-নিট্রা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী পরিচালক শাহাদাৎ হোসাইন জানান, লঞ্চে ওঠানোর আগে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে যাত্রীদের হাত জিবাণুমুক্ত করতে হবে, মাস্ক পরে লঞ্চে ভ্রমণ করতে হবে, পরিবহন করা যাবে না অতিরিক্ত যাত্রী। যে সব লঞ্চ স্বাস্থ্যবিধি না মেনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা