kalerkantho

শনিবার । ২০ আষাঢ় ১৪২৭। ৪ জুলাই ২০২০। ১২ জিলকদ  ১৪৪১

মানবপাচার

দালালের খপ্পরে স্বপ্নের মৃত্যু জীবন ক্ষয়

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৩১ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দালালের খপ্পরে স্বপ্নের মৃত্যু জীবন ক্ষয়

মানবপাচার ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা ফন্দিতে সক্রিয় দালালচক্র। গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে চিহ্নিত করে চক্রের সদস্যরা তাদের দালালি কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। এসব চক্রের ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে দরিদ্র পরিবারগুলো। দালালচক্র বিভিন্ন দেশে মোটা বেতনে চাকরি দেওয়ার টোপ ফেলে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে দিনের পর দিন। রঙিন জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমানো অনেক যুবকের স্বপ্ন চুরমার হচ্ছে নিমিষেই। অনেককে জীবন দিতে হচ্ছে অথৈ সমুদ্রে কিংবা বুলেটের আঘাতে। এরই ধারাবাহিকতায় শেষ ঘটনাটি ঘটল লিবিয়ায়, যেখানে প্রাণ গেল ২৬ জনের। এ ব্যাপারে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

গোপালগঞ্জ : লিবিয়ায় মানবপাচারকারীদের গুলিতে নিহত সুজন মৃধার (২০) বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বামনডাঙ্গায়। একই উপজেলার সুন্দরদী গ্রামের গুলিবিদ্ধ আরেক যুবক ওমর শেখ (২২) লিবিয়ার ত্রিপোলি হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। সুজন মৃধার বাবা জানান, গোহালা ইউনিয়নের যাত্রাবাড়ী গ্রামের মানবপাচারচক্রের সদস্য রব মোড়লের মাধ্যমে ছেলেকে লিবিয়ায় পাঠান। এ জন্য দালাল রবকে তিন লাখ ৯০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। আহত ওমর শেখের বাবা মো. কালাম শেখ জানান, রাঘদী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার সুন্দরদী গ্রামের লিয়াকত মোল্লার মাধ্যমে চার লাখ পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে তাঁর ছেলেকে লিবিয়ায় পাঠিয়েছিলেন।

তাঁদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা যায়, এই অঞ্চলের প্রধান দালাল মাদারীপুরের রাজৈরের হোসেনপুর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামের জুলহাস শেখ। স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন এলাকা থেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য যুবক ও টাকা সংগ্রহ করেন।

মুকসুদপুরের বামনডাঙ্গা গ্রামের জয়নাল সরদার ও আকিজুল ইসলাম বাবুল বলেন, এই দালালচক্র গোপালগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মানুষ পাঠানোর কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চার থেকে আট লাখ এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা নেয়। পরে দালালদের মাধ্যমে সমুদ্রপথে তাঁদের ইউরোপে ও সড়কপথে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। তখন ওই সব দালাল আবার বিদেশগামী সদস্যদের পরিবারের কাছে বিভিন্ন পন্থায় মুক্তিপণ দাবি করে। এতে অনেক যুবকের স্বপ্নপূরণ তো দূরের কথা, বরং মানবপাচারকারীদের হাতে কিংবা অবৈধপথে নৌকায় করে বিভিন্ন দেশে যাওয়ার পথে অথৈ সমুদ্রে জীবন দিচ্ছেন।

অভিযুক্ত রাঘদী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার সুন্দরদী গ্রামের লিয়াকত মোল্লা তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি ওমর শেখকে লিবিয়ায় পাঠায়নি। আমার মামাতো ভাই নুর আলম লিবিয়া থাকে। তাঁর মাধ্যমে আমার চাচাতো ভাই ইমন মোল্লাকে লিবিয়ায় পাঠিয়েছি। তাঁরা লিবিয়া যাওয়ার জন্য ঢাকার আবুল হোসেন নামে এক লোকের কাছে টাকা দেন। টাকা দেওয়ার সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম।’ এ ব্যাপারে রব মোড়লের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে তাঁর নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা বলেন, ‘আমরা বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জেনেছি। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। আমরা দালালচক্রটি ধরার চেষ্টা চালাচ্ছি।’

যশোর : লিবিয়ায় মুক্তিপণের দাবিতে গুলিতে নিহত রকিবুল ইসলাম রকি যশোরের ঝিকরগাছার ১০ নম্বর শংকরপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম খাটবাড়িয়ার ঈসরাইল হোসেন দফাদারের ছোট ছেলে। রকির বড় ভাই সোহেল রানা জানান, তাঁরা চার ভাই-বোন। রকি সবার ছোট। সে যশোর সরকারি সিটি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়া অবস্থায় গত ১৫ ফেব্রুয়ারি লিবিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়।  ভিটেবাড়ির একটি অংশ বিক্রি করে ও এনজিও থেকে লোন নিয়ে দালালের মাধ্যমে ভাইকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। তাঁর এক চাচাতো ভাইও থাকেন লিবিয়ার ত্রিপোলিতে। সেখানেই তাঁর যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দালাল তাকে ত্রিপোলিতে নিতে পারেনি। সে যে বিমানে গিয়েছিল সে বিমান বেনগাজিতে নামে। আবার যুদ্ধের কারণে দালাল তাকে সেখান থেকে ত্রিপোলিতে নিতে পারছিল না। এ জন্য সে বেনগাজির একটি তেল কম্পানিতে কাজ নেয়। সেখানে দুই মাস কাজ করা অবস্থায় পরিচয় হয় এক বাংলাদেশি দালালের সঙ্গে। তার মাধ্যমে বাংলাদেশি টাকায় ৭০ হাজার টাকায় চুক্তি হয় বেনগাজি থেকে ত্রিপোলিতে চাচাতো ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার। সে অনুযায়ী ১৫ মে সে দালালের সঙ্গে বেনগাজি থেকে রওনা হয় ত্রিপোলির উদ্দেশে। পথে ত্রিপোলির কাছাকাছি মিজদাহ নামক স্থানে ১৭ মে তারা মানবপাচারকারীদের হাতে জিম্মি হয়। ১৮ মে সন্ধ্যার দিকে সোহেল রানার কাছে বাংলা ভাষী একজন ফোন করে। সেই ব্যক্তি নিজের পরিচয় না দিয়ে রকির মুক্তির জন্য ১০ লাখ টাকা দাবি করে। এ সময় মানবপাচারকারীরা সোহেল রানার সঙ্গে রকির কথা বলায়। রকি সোহেলকে জানান, তাঁকেসহ অন্য জিম্মিদের অপহরণকারীরা খুব নির্যাতন করছে। টাকা না দিলে তাঁকেসহ অন্যদের হত্যা করা হবে। একপর্যায়ে রকির পরিবার ১০ লাখ টাকা দিতেও রাজি হয়েছিল। এ জন্য তারা ১ জুন টাকা দেওয়ার সময় নিয়েছিল। কিন্তু তার আগেই তাঁদের মেরে ফেলা হলো।

মাগুরা : লিবিয়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে হতাহতদের মধ্যে রয়েছেন মাগুরার দুই যুবক। তাঁদের বাড়ি মাগুরার মহম্মদপুরের বিনোদপুর ইউনিয়নের নারায়ণপুর গ্রামে। সন্ত্রাসী হামলায় নিহত লাল চাঁদ (৩০) ও গুরুতর আহত তারিকুল ইসলাম (২২) দুজনই টাইলস মিস্ত্রি ছিলেন। সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে হাজি কামাল নামে এক দালাল অবৈধপথে তাঁদের লিবিয়া পাঠান। সেখানে গিয়েই মিজদাহ শহরে আটকা পড়েন তাঁরা।

লাল চাঁদের বাবা ইউসুফ মিয়া জানান, আট মাস আগে হাজি কামাল নামে এক দালালের মাধ্যমে লাল চাঁদ লিবিয়ায় যান। এ জন্য লিবিয়াপ্রবাসী নারায়ণপুরের জিয়াউর রহমান নামে এক যুবকের কথামতো সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হয় হাজি কামালকে। হাজি কামালের ঢাকার গুলশানে অফিস আছে। লিবিয়ায় যাওয়ার পর লাল চাঁদকে মিজদাহ শহরের একটি ক্যাম্পে আটকে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণের জন্য বাড়িতে যোগাযোগ করাত। পাশাপাশি নির্যাতন করত। গুলিতে লাল চাঁদ নিহত ও তারিকুল আহত হওয়ার খবর তাঁদের পরিবারকে মোবাইল ফোনে জানান লিবিয়ায় থাকা নারায়ণপুরের জিয়াউর রহমান নামে এক যুবক। এই জিয়া লিবিয়া থেকে মোবাইল ফোনে হাজি কামাল নামে ওই দালালের সঙ্গে লাল চাঁদ ও তারিকুলের বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে মধ্যস্থতা করেন।

তারিকুলের বাবা ফুল মিয়া জানান, তাঁর ছেলে তারিকুলকে জিয়া ও হাজি কামালের মাধ্যমে লিবিয়ায় কাজের জন্য পাঠানো হয়। তারিকুলের জন্য তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে হাজি কামালকে। লিবিয়া যাওয়ার পর মিজদাহ শহরে আব্দুল্লাহ নামে এক ব্যক্তির ক্যাম্পে আটকে মোবাইল ফোনে তাঁদের কাছে লাল চাঁদ ও তারিকুলের জন্য ১০ লাখ টাকা করে অতিরিক্ত মুক্তিপণ দাবি করেছিল সংশ্লিষ্টরা।

ভৈরব (কিশোরগঞ্জ) : কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে অবৈধপথে লিবিয়ায় গিয়ে প্রাণ হারানো প্রত্যেকে বাড়িঘর ও জমি বিক্রি করে পাঁচ-ছয় লাখ টাকা করে দালালকে দেন। কথা ছিল লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের পরে সুবিধাজনক সময়ে সাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধপথে ইতালি পাঠানো হবে। কিন্তু তাঁরা লিবিয়ায় পৌঁছলে সেখানে একটি দালালচক্র একটি গুদামে বন্দি করে আরো টাকা দাবি করে। তাঁদের মধ্য দুই-একজন লিবিয়ায় কয়েক মাস কাজও করেন। প্রবাসে যাওয়া সবাই দরিদ্র পরিবারের হওয়ায় কেউ পাচারকারীদের দাবি অনুযায়ী টাকা বাড়ি থেকে দিতে পারছিল না। তাঁদের গুদামে বন্দি রেখে তিন বেলা খাবারও দেয়নি পাচারকারীরা। বরং নির্যাতন করেছে।

 

 

মন্তব্য