kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

লিবিয়ায় মৃত্যুর আগে ২৬ বাংলাদেশির আকুতি

‘আমাদেরকে মেরে ফেলবে, বাঁচাও’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩১ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘আমাদেরকে মেরে ফেলবে, বাঁচাও’

লিবিয়ায় নিহত মাদারীপুরের রাজৈরের বদরপাশা এলাকার আসাদুলের বোনের কান্না (ওপরে); আরেক নিহত যশোরের ঝিকরগাছার খাটবাড়িয়া এলাকার রকিবুল। নিজের অবস্থান জানিয়েছিলেন বড় ভাইকে। বলেছিলেন, পুলিশকে জানাও, আমাদের বাঁচাও। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘আমার সোনারে বাঁচাতি ভিটেটুকুও বেচে ১০ লাখ টাকা দিতি চাইছিলাম। ওদের কাছ তে ১ তারিক পইরযন্ত টাইম আমরা নিলাম রে। সে সুমায় দিল না রে আল্লা। আমার সোনারে ছাইড়ে আমি কী কইরে থাকপো রে। আমার জানডা ফাইটে গেল রে আল্লা। আমি এগের বিচার চাই। তুমি এগের বিচার কইরো আল্লা।’ লিবিয়ায় মানবপাচারকারীদের হাতে নিহত যশোরের রকিবুল ইসলাম রকির বাড়িতে গতকাল শনিবার সকালে ঢুকতেই তাঁর মা মহিরুন নেছার এমন হৃদয়স্পর্শী আহাজারি কানে বাজে।

লিবিয়ায় গত বৃহস্পতিবার নিহত ২৬ বাংলাদেশির একজন রকিবুল ইসলাম রকি। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে মাত্র ২০ বছর বয়সে মাতৃভূমি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন লিবিয়ায়। ভিটেবাড়ির একটি অংশ বিক্রি করে এবং এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দালালের মাধ্যমে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি বাড়ি ছেড়েছিলেন তিনি। গিয়েছিলেন ভাগ্য পাল্টাতে। মা-বাবার মুখে একটু হাসি ফোটাতে। কিন্তু মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানোর পরিবর্তে তাঁদের চোখের আঙিনায় এখন জল। এখন তাঁরা অন্তত রকির লাশটা ফেরত চান।

লিবিয়ায় মুক্তিপণের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার গুলিতে নিহত রকি যশোরের ঝিকরগাছার ১০ নম্বর শংকরপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম খাটবাড়িয়ার ঈসরাইল হোসেন দফাদারের ছোট ছেলে।

গতকাল সকালে রকিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের উঠানে হাউমাউ করে কাঁদছেন রকির মা মাহিরুন নেছা। তাঁকে ঘিরে বসে থাকা অন্য স্বজনদের চোখেও পানি। পাশেই একটি চেয়ারে রকির বাবাকে বসিয়ে রেখেছেন কয়েকজন স্বজন। প্রিয় ছোট ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক তিনি। কাঁদতেও ভুলে গেছেন। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। মাঝে মাঝে আপন মনে কী যেন বলে চলেছেন।

এদিকে মাদারীপুরের রাজৈরের রাজন্দী দারাদিয়া এলাকার সিদ্দিক আকনের ছেলে আসাদুল আকন লিবিয়ায় ওই ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ। আসাদুলের বাড়িতে গতকাল গিয়ে দেখা যায়, ছেলের জন্য অসুস্থ বাবা বিছানায় কাতরাচ্ছেন। মা শুভতারা বেগম বারবার চেতনা হারাচ্ছেন। বড় ভাই, বোন সবাই শোকে পাথর হয়ে আছেন। তাঁদের একটাই দাবি, আসাদুল যে অবস্থায় আছেন সেই অবস্থায় যেন দেশে আনার ব্যবস্থা করে সরকার। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এই ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন মাদারীপুরের ১৩ জন ও আহত হয়েছেন চারজন। তবে প্রশাসন বলেছে, ১১ জনের তথ্য তাদের কাছে আছে।

উপজেলার আমগ্রাম ইউনিয়নের নরারকান্দি গ্রামের নিখোঁজ আয়নালের বাবা তরিত মোল্লা বলেন, ‘আমি এখন সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। জমিজমা, ঘরে সোনা-গহনা যা ছিল সব বিক্রি করে ছেলেকে জুলহাস দালালের মাধমে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমার ছেলেও গেছে, সবই গেছে। আমরা এখন কী করব?’

এদিকে লিবিয়ায় হতাহতের ঘটনার খবর শুনে গত শুক্রবার সকালে বাংলাদেশি দালাল রাজৈরের হোসেনপুর ইউনিয়নের জুলহাস শেখের বাড়িতে হামলা করে এলাকাবাসী। এ খবর পেয়ে রাজৈর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় দালাল জুলহাস নিজেকে করোনা রোগী বলে পরিচয় দেন। এ সময় পুলিশ জুলহাসকে নিয়ে মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করে।

এদিকে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার নাগদা ইউনিয়নের খেজুরতলা গ্রামের দিনমজুর হাসান আলীর ছোট ছেলে বকুল হোসেনও (২৫) একই হামলায় আহত। মারাত্মক আহত অবস্থায় তিনি এখন হাসপাতালে। হামলার খবর শোনার পর মা মোমেনা খাতুন সারাক্ষণ ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। মাঝে মাঝে মূর্ছা যাচ্ছেন। ভালোভাবে কথা বলতেও পারছেন না। তাঁর মা জানান, গত বুধবার রাতে বকুল লিবিয়া থেকে বাড়িতে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘মা, আমরা ভালো নেই। অপহরণের পর আমাদের একটি ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে। বন্দিশালা থেকে যেন মুক্ত হতে পারি সেই দোয়া করো।’

নিহত সুজন মৃধার (২০) গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের গোহালা ইউনিয়নের বামনডাঙ্গা গ্রামের বাড়িতে গতকাল সকালে গিয়ে দেখা যায়, চলছে মাতম। তাঁর মা চায়না বেগম (৪৫) আহাজারি করে বলছিলেন, ‘আমার ছোয়ালরে আমার বুকে ফিরাইয়া দেও। সোনার ছোয়ালডারে টাকার জন্যি দালালরা গুলি কইরা মাইরা ফেলাইছে। ১৭ দিন কোনো খাবার দেয়নাই। লাঠি দিয়া পিটাইছে। পরে গুলি করে মাইরা ফেলাইছে। আমার বুকের মানিকের লাশ দেখতে চাই। আমার কোল খালি করলে ক্যান। হে আল্লাহ, কী দোষ ছিল ওর। আমাগের কী অপরাধ ছিল! দালালরা আমাগে সর্বস্বান্ত করে ফেলাইল। যারা আমার এতো বড় সর্বনাশ করলো তাগের আমি ফাঁসি চাই।’

এদিকে গুলিতে নিহত ফরিদপুরের সালথার বল্লভদী ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামের কামরুল ইসলামের বাড়িতেও চলছে মাতম। কামরুলের বাবা কবীর শেখ বলেন, ‘আশা ছিল ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে যদি একটু সুখের মুখ দেখা যায়। সেই আশা নিয়ে দালালের কথামতো সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে ও জমি বিক্রি করে সাড়ে চার লাখ দিয়ে গত ডিসেম্বর মাসে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু স্বপ্ন পূরণ তো দূরের কথা উল্টো ছেলেকে হারালাম।’ 

কিশোরগঞ্জের ভৈরবের শ্রীনগর ইউনিয়নের শ্রীনগর গ্রামের সাকিব হোসেনও (২০) লিবিয়ায় মানবপাচারকারীদের গুলিতে নিহত হন। তাঁর বাবা বাচ্চু মেলেটারি বলেন, ‘ছেলে বলেছিল, আব্বা পিঠে কারেন্টের ছেঁকা দিয়ে আমাকে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে। আমাকে মাফিয়াচক্র ধরেছে, ১০ লাখ টাকা দিলে আমাকে ছেড়ে দেবে।’

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা)

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা