kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

তদন্তে মিলছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

রোগী বাঁচাতে চেষ্টাই করেনি ইউনাইটেড হাসপাতাল!

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩০ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রোগী বাঁচাতে চেষ্টাই করেনি ইউনাইটেড হাসপাতাল!

রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে অগ্নিকাণ্ডের সময় এক চিকিৎসক ও এক নার্স কর্তব্যরত ছিলেন। আগুন দেখতে পেয়ে তাঁরা দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে চলে যান। এ সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীদের বাঁচাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আগুন নেভাতে ফায়ার হাইড্রেন্ট থাকলেও তা ব্যবহার করার জন্য সেখানে দক্ষ লোক ছিলেন না। আর সেখানে থাকা ১২টি ফায়ার এক্সটিংগুইশারের মধ্যে ৯টিই ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ। তা ছাড়া করোনা ইউনিটটি পারটেক্স বোর্ড দিয়ে তৈরি করায় সেটি দাহ্য বস্তুতে পরিণত হয়। এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে ঘটনার তদন্তসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিস, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও গুলশান থানা পুলিশ।

গুলশানের ৭১ নম্বর সড়কে বহুতল এই হাসপাতালটির জরুরি বিভাগের পাশে মূল ভবনের বাইরে ২০ ফুট বাই ১০ ফুট অস্থায়ী করোনা আইসোলেশন সেন্টারটি করা হয় এক মাস আগে। হাসপাতালের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মঈনুল হোসেন বলেন, ‘ওই জায়গায় শীতের সময় ব্যাডমিন্টন খেলি আমরা। এবার করোনার জন্য অস্থায়ীভাবে শেড দিয়ে পাঁচটি বেডের একটি ইউনিট করা হয়েছে। টিন আর বোর্ড দিয়ে। বেডগুলো আলাদা করা হয়েছে শক্ত কার্টেইন দিয়ে। স্যাম্পল কালেকশনের জন্যও জায়গা আছে।’

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক ও তদন্ত কমিটির প্রধান দেবাশীষ বর্ধন বলেন, ‘ওপরে টিন এবং পাশে জিপসাম দিয়ে তৈরি। পার্টিশন ও সিলিং করা হয়েছে বোর্ড দিয়ে। এর মধ্যেই এসির লাইন, অক্সিজেন, অনেক ইলেকট্রিক লাইন সব কিছু। ফলে পুরো ইউনিটটিই সর্বোচ্চ মাত্রায় একটি দাহ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছিল।’

দেবাশীষ বর্ধন আরো বলেন, ‘আগুন লাগার পর হাসপাতাল আসলে কিছুই করেনি। তাদের ফায়ার ফাইটিং টিম নেই। ফায়ার হাইড্রেন্ট আছে। সেগুলো আমরা এসে ব্যবহার করি। ওগুলো ব্যবহারের লোক ছিল না তাদের। আর ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহারের চেষ্টা হলেও তা কাজে আসেনি কারণ মেয়াদ ছিল না।’ সুত্র জানায়, গত বুধবার রাতে অগ্নিকাণ্ডের পর বৃহস্পতিবার সকালে অগ্নিকান্ডস্থল পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিস ও সিআইডির ফরেনসিক টিম প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে, শুধুমাত্র করোনা রোগীদের জন্য তৈরি করা ইউনাইটেড হাসপাতালের মূল ভবনের বাইরে আইসোলেশন ইউনিটের জন্য যে ১২টি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখা ছিল তার নয়টিই মেয়াদোত্তীর্ণ। তদন্তে তা আলামত হিসেবে জব্দ করেছে সিআইডি। হাসপাতালটির করোনা ইউনিটে অনেক অব্যবস্থাপনা পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থাটি।

এদিকে মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে মাহবুব এলাহী ও রিয়াজুল আলম লিটনের পরিবার দাবি করেছে, করোনায় আক্রান্ত না হয়েও তাদেরকে করোনা ইউনিটে রাখা হয়। ফলে আগুনে পুড়ে মরতে হলো তাদের।

মাহবুবের ভাই নাঈম আহমেদ বলেন, ‘আমর ভাইয়ের করোনা ছিল না। তবে শ্বাসকষ্ট থাকায় প্রথমে অ্যাপোলো হাসপাতালে নেই। সেখানে ভর্তি না নিলে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে তাকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করতে চেয়েছিলাম। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা জমা করতে করতে ইতোমধ্যে সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়েছি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষর অবহেলায় তার মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না।’ একইভাবে জ্বর নিয়ে ইউনাইটেড হাসপাতালে গেলে বায়িং হাউজ কর্মী রিয়াজুল আলম লিটনকে করোনা ইউনিটে ভর্তী করে রাখা হয়। অথচ তিনি করোনা রোগী ছিলেন না। তাকে করোনা ইউনিটে রাখার কারণেই আগুনে পুড়ে প্রাণ দিতে হলে বলে দাবি করেছে তাঁর পরিবার। এ দুজন ছাড়া ইউনাইটেড হাসপাতালে আগুনে নিহত অন্যরা হলেন-মো. মনির হোসেন (৭৫), ভারনন এ্যান্থনী পল (৭৪), খাদেজা বেগম (৭০)।

হাসপাতালটির কমিউনিকেশন অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার বলেন, ওইসব রোগীদের লক্ষণ-উপসর্গে কোভিড-১৯ এর ইঙ্গিত ছিল। তাদের এক্স-রে রিপোর্টেও কোভিডের উপস্থিতি প্রকাশ পায়। এ বিষয়ে রোগীদের পরিবারের সম্মতি নিয়েই আইসোলেশন ইউনিট রেখে চিকিৎসা চলছিল।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘হাসপাতালটিতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ওইভাবে ছিল না। কিন্তু করোনা ইউনিটের পাশেই ফায়ার হাইড্রেন্ট ছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বোধ হয় ফায়ার হাইড্রেন্ট ব্যবহার করতে পারেনি। ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা