kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

অগ্নিকাণ্ডে নিহত পাঁচ

ঝুঁকিপূর্ণ ছিল ইউনাইটেডের অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা

কর্তৃপক্ষের অপমৃত্যু মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৯ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঝুঁকিপূর্ণ ছিল ইউনাইটেডের অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা

গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনাভাইরাস ইউনিট গত বুধবার রাতে আগুনে পুড়ে যায়। এতে মারা যায় চিকিৎসাধীন পাঁচ রোগী। পরে গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থায় নানা অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পায় তদন্তদল। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা নিয়ে মাহবুব এলাহি (৫৭) গত ১৫ মে ইউনাইটেড হাসপাতালে গেলে করোনাভাইরাসের উপসর্গের কথা বলে চিকিৎসকরা তাঁকে আইসোলেশনে ভর্তি করান। সেখানেই গত বুধবার রাতে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। অথচ তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন না।

মাহবুব এলাহির ভাই নাঈম আহমেদ জুলহাস জানান, করোনাভাইরাস শনাক্তের জন্য দুবার পরীক্ষা করালে রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, তৃতীয়বার পরীক্ষা করিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে। ‘কিন্তু তার আগেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে আগুনে পুড়ে মারা গেল ভাই আমার’, এ কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন জুলহাস।

বুধবার রাতে রাজধানীর গুলশানে ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ব্যবসায়ী মাহবুব এলাহির মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে হাসপাতালে তাঁর খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন একমাত্র ছেলে আনান চৌধুরী। তিনি জানান, করোনা ইউনিটে আইসোলেশনে থাকায় বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি তিনি। ওই সময় কর্তব্যরত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে বাসায় ফেরার কিছুক্ষণ পরই তিনি জানতে পারেন, বাবা অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন। একই পরিণতি হয়েছে বায়িং হাউসের কর্মী রিয়াজুল আলম লিটনের। জ্বর নিয়ে ইউনাইটেড হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করে তাঁকে। স্বজনরা অপেক্ষা করছিল পরীক্ষার ফলের জন্য। করোনা পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এসেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভুল সিদ্ধান্তে লিটনের অপমৃত্যু হলো বলে অভিযোগ করেন তাঁর বড় ভাই রইসুল আজম।

এ ছাড়া গত বুধবার রাতে ইউনাইটেড হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডে নিহত অন্যরা হলেন মো. মনির হোসেন (৭৫), ভারনন অ্যান্থনী পল (৭৪) ও খাদেজা বেগম (৭০)। তাঁরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন।

গত বুধবার রাতে পাঁচজন রোগীর সঙ্গে একজন চিকিৎসক ও একজন নার্স ডিউটিতে ছিলেন। আগুন লাগার পর তাঁরা রোগীদের মৃত্যুমুখে রেখে হামাগুড়ি দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছেন বলে জানা গেছে।

তদন্ত কমিটি : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ওইভাবে ছিল না।’ গত বুধবার রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনি আরো বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় সাধারণ মানুষ আগুন না নিভিয়ে ভিডিও করায় ব্যস্ত ছিল। আগুন নেভাতে নিজস্ব তৎপরতা ছিল না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরও।

ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধনের নেতৃত্বে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে দেবাশীষ বর্ধন জানান, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য ইউনাইটেড হাসপাতালের মূল ভবনের পাশে অস্থায়ীভাবে আইসোলেশন ইউনিট তৈরি করা হয়। সেখানে রোগীদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রাখা হয়েছিল।

দুর্বল অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা : ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামও। হাসপাতালটিতে করোনা আইসোলেশন ইউনিটের ১১টি ফায়ার এক্সটিংগুইশারের মধ্যে আটটিই ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ—এমনটা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের হাসপাতালে রোগী আসে ভালো হওয়ার জন্য। যদি রোগী মারা যায়, তাহলে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।’

অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পুলিশ বলছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) থেকেই আগুনের সূত্রপাত বলে তারা জানতে পেরেছে।

ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অপমৃত্যু মামলা : অগ্নিকাণ্ডে পাঁচ রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় গত বুধবার রাতে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অপমৃত্যু মামলা করেছে। এ ছাড়া দুঃখ প্রকাশ করে গত বুধবার রাতেই বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে তারা। বিজ্ঞপ্তিতে কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, ‘সম্ভবত’ বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের কারণে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, ‘সেই সময় আবহাওয়া খারাপ ছিল ও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। বাতাসের তীব্রতায় আগুন প্রচণ্ড দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে পড়ার ফলে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখানে ভর্তি পাঁচজন রোগীকে বাইরে বের করে আনা সম্ভব হয়নি এবং ভেতরে থাকা এই পাঁচজন রোগী মৃত্যুবরণ করেন।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো দাবি করা হয়, ফায়ার সার্ভিসকে তাত্ক্ষণিক খবর দেওয়া হয় এবং হাসপাতালের নিজস্ব অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় ১৫-২০ মিনিটে আগুন নিভিয়ে ফেলা হয়। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে ফায়ার সার্ভিসকে পূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া হাসপাতালে ভর্তি সব রোগীর নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ জানায় কর্তৃপক্ষ।

৯৯৯-এ জানায় রোগীর স্বজনরা : অগ্নিকাণ্ডের খবর জানাতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেছিলেন চিকিৎসাধীন এক রোগীর স্বজন। সেখান থেকে বার্তা পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট ও পুলিশ সদস্যরা। আগুনের খবরে ঘটনাস্থলে যান ডিএমপি গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) সুদীপ কুমার চক্রবর্তী।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা