kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

চট্টগ্রামে করোনা পরিস্থিতির আরো অবনতি

১০ দিনে আক্রান্ত ৯০১ জন, মৃত্যু ২৬

► যুবকরাই বেশি আক্রান্ত
► নগরে ৭৫ শতাংশ ও জেলায় ২৫ শতাংশ
► ঢাকার পর চট্টগ্রাম হতে যাচ্ছে করোনার ‘হটস্পট’

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

২৩ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



১০ দিনে আক্রান্ত ৯০১ জন, মৃত্যু ২৬

চট্টগ্রামে বাড়ছে করোনাভাইরাস সংক্রমণজনিত কভিড-১৯ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, লকডাউন ভেঙে পড়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে চট্টগ্রামের করোনা পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে।

সব শেষ গত ১০ দিনে নগর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আক্রান্ত হয়েছে ৯০১ জন। এ সময় প্রাণ গেছে ২৬ জনের। গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে। মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১৩১৮। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪৯ জনের। এর মধ্যে ৪১ জন নগরের। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাসায় গেছেন ১৪০ জন।

মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১৩১৮। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪৯ জনের। এর মধ্যে ৪১ জন নগরের। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাসায় গেছেন ১৪০ জন।

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, করোনায় আক্রান্তের তালিকায় গাজীপুরকে পেছনে ফেলে তৃতীয় অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম দু-এক দিনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জকেও (আক্রান্তে দ্বিতীয়) ছাড়িয়ে যেতে পারে। আক্রান্তের পাশাপাশি করোনায় মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ঢাকায় শনাক্ত রোগী ১৩,০৫৮ জন। এরপর নারায়ণগঞ্জে ১,৫৯৯ জন। এরপর চট্টগ্রামে ১,৩১৮ জন আক্রান্ত। এর মধ্যে শুধু নগরেই ৯৯৭ জন।

করোনা পরিস্থিতি জানতে চাইলে চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত চট্টগ্রামে। আগামী পাঁচ দিন বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের আগের দুই দিন, ঈদ ও পরের দুই দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘লকডাউন আগের মতো কড়াকড়ি করার জন্য আমরা পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে অবহিত করেছি। কঠোরভাবে লকডাউন কার্যকর করা না গেলে ঈদের পর পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। আপাতত যে যেখানে আছে সেখানেই থাকতে হবে। নগরের মধ্যেও এক এলাকার মানুষ যাতে অন্য এলাকায় না যায়। গেলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

চট্টগ্রামে করোনা রোগীর বয়স পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে যুবকরা। অন্যদিকে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে আক্রান্তের হার কিছুটা কমলেও বয়স্ক রোগী মারা যাচ্ছেন বেশি। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরে আক্রান্তের হার বাড়তে বাড়তে এখন ৭৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর চট্টগ্রাম জেলায় আক্রান্ত ২৫ শতাংশ।

সব শেষ গতকাল নতুন শনাক্ত ৯০ জনের মধ্যে ৭৭ জন চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার এবং ১৩ জন জেলার বিভিন্ন এলাকার।

এর আগের দিন গত ২০ মে নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন পর্যন্ত চট্টগ্রামে মোট করোনা শনাক্ত রোগী ১,২২৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৯৩৯ জন এবং নারী ২৮৯ জন। মোট আক্রান্তদের মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত ২৯৮ জন, যা মোট আক্রান্তের ২৪ শতাংশ। ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী আক্রান্ত ৩৪২ জন (মোট আক্রান্তের ২৮ শতাংশ)। ৪১ থেকে ৫০ বছর ১৯৮ জন (১৬ শতাংশ)। ৫১ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ১৬৯ জন (১৪ শতাংশ)। ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে ১০০ জন (৮ শতাংশ)। মোট আক্রান্তের মধ্যে নগরে ৯২০ জন (৭৫ শতাংশ) এবং জেলায় ৩০৮ জন (২৫ শতাংশ)। ওই দিন পর্যন্ত মৃত্যু ছিল মোট ৪৫ জন (৪ শতাংশ)।

এর আগে গত ১৩ মে চট্টগ্রামে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ওই দিন পর্যন্ত মোট করোনা রোগী ছিল ৪১৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩২৯ জন এবং নারী ৮৮ জন। এর মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত ১০০ জন, যা মোট আক্রান্তের ২৪ শতাংশ। ৩১ বছর থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত ১০৮ জন (মোট আক্রান্তের ২৬ শতাংশ), ৪১ থেকে ৫০ বছর ৮১ জন (১৯.৪ শতাংশ) ও ৫১ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৫২ জন (১২.৪ শতাংশ)। ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে রয়েছে ৩৮ জন (৯ শতাংশ)। মোট আক্রান্তের মধ্যে নগরে ২৭৯ জন (৬৭ শতাংশ) এবং জেলায় ১৩৮ জন (৩৩ শতাংশ)। ওই দিন পর্যন্ত মৃত্যু ছিল ২৩ জন (৫.৫ শতাংশ)।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরে ১৬ থানার মধ্যে সবগুলোতেই করোনা আক্রান্ত রোগী রয়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের তালিকায় কোতোয়ালি থানা এলাকা। এ থানার বিভিন্ন এলাকায় সর্বোচ্চ ১৩৫ জন করোনা শনাক্ত হয়েছে। এরপর নগরের অভিজাত খুলশী এলাকায় ৯০ জন এবং তৃতীয় হালিশহর এলাকায় ৭৫ জন। অন্যদিকে উপজেলাগুলোর মধ্যে লোহাগাড়ায় সর্বোচ্চ ৪৩ জন এবং সীতাকুণ্ডে ৪১ জন।

যুবকদের বেশি আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু চট্টগ্রামে নয়, সারা দেশে একই অবস্থা। তরুণ-যুবকরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। ২১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। মারা যাচ্ছে বেশি বয়স্করা। তরুণ-যুবকরা আক্রান্ত বেশি হলে তাদের মাধ্যমে সংক্রমণও হচ্ছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে সিভিল সার্জন বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরনগর। এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের আসা-যাওয়া আছে। আমরা চট্টগ্রামে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের প্রায় দুই সপ্তাহ আগে (মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ) থেকে বলে আসছি চট্টগ্রাম অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু লকডাউন না মানা ও স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে চট্টগ্রামে হঠাৎ করে আক্রান্ত বেড়ে গেছে। যেভাবে আক্রান্ত হচ্ছে তাতে ঢাকার পর চট্টগ্রামে বেশি হবে। কার্যকর লকডাউনের বিকল্প নেই।’

চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর বলেন, ‘তরুণরা তো কিছুই মানছে না। স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণেই তো চট্টগ্রামে আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ছে। সচেতনতার বিকল্প নেই।’

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের (করোনা হাসপাতাল) তত্ত্বাবধায়ক (উপপরিচালক) ডা. অসীম কুমার নাথ বলেন, তরুণ-যুবকদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকলেও তাদের মাধ্যমে সংক্রমিত হচ্ছে। বয়স্কদের মধ্যে মারা যাচ্ছেন, যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগ রয়েছে। তরুণ-যুবকরা বেশি আক্রান্ত না হলে চট্টগ্রামে আক্রান্তের হার অনেক কম হতো। আমাদের আশঙ্কা দু-এক দিনের মধ্যে হয়তো নারায়ণগঞ্জকে ছাড়িয়ে যাবে চট্টগ্রাম।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা