kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ আষাঢ় ১৪২৭। ৯ জুলাই ২০২০। ১৭ জিলকদ ১৪৪১

সংবাদপত্রে সরকারি বিজ্ঞাপনের বিল পরিশোধে গড়িমসি

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশ উপেক্ষিত

আজিজুল পারভেজ   

১৯ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সংবাদপত্রে সরকারি বিজ্ঞাপনের বিল পরিশোধে গড়িমসি

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি দেশের সংবাদমাধ্যম। আর্থিক সংকটে পড়ে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রাম করছে সংবাদপত্রগুলো। সংবাদপত্রের প্রকাশনা অব্যাহত রাখার স্বার্থে সরকারের কাছে বিজ্ঞাপন বিল বাবদ পাওয়া টাকা দ্রুত পরিশোধ করার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নির্দেশ দিলেও প্রায় তিন সপ্তাহেও এই নির্দেশ কার্যকর হয়নি।

তথ্য মন্ত্রণালয় ক্রোড়পত্র বাবদ সরকারের কাছে পাওনা বিল দ্রুত সংবাদপত্রগুলোকে পরিশোধের নির্দেশ দিলেও সেটাও কার্যকর হয়নি। তা ছাড়া ক্রোড়পত্রের বিলের বহুগুণ বেশি টাকার সরকারি বিজ্ঞাপন বিল সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছে সংবাদপত্রগুলোর পাওনা রয়েছে।

করোনা পরিস্থিতির কারণে গত ২৬ মার্চ থেকে টানা সাধারণ ছুটি, বিভিন্ন জেলা লকডাউন ঘোষণা, গণপরিবহন বন্ধ থাকা—এসব কারণে পত্রিকা বিলি ও বিতরণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে বেসরকারি বিজ্ঞাপন। সরকারি বিজ্ঞাপনও সীমিত হয়ে গেছে। বিজ্ঞাপন বিল সংগ্রহও একদম বন্ধ। কর্মীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে সংবাদপত্রগুলোর প্রকাশনা অব্যাহত রাখা হয়েছে। পৃষ্ঠা সংখ্যা কমিয়ে, কেউ বা প্রকাশনা বন্ধ করে অনলাইনে সংবাদ প্রকাশ করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। কয়েকটি সংবাদপত্র এরই মধ্যে বন্ধও হয়ে গেছে। সংকটে পড়ে কয়েকটি সংবাদপত্র কর্মীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দিতে পারছে না। আঞ্চলিক অনেক সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে গেছে।

এমন সংকটে আগে কখনো পড়েনি এ দেশের সংবাদপত্র শিল্প। এই সংকটের মধ্যেও মূলধারার সংবাদপত্রগুলো তাদের প্রকাশনা অব্যাহত রেখে মানুষকে কেবল তথ্যসেবাই দিচ্ছে না, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত অনেক গুজব ও অসত্য তথ্য প্রচারকেও মোকাবেলা করে চলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মহামারি সংকটে প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা যেমন জরুরি, তেমনি সত্যনিষ্ঠ তথ্যসেবাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এই অবস্থায় গত ৩০ এপ্রিল নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) কর্মকর্তারা তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহ্মুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে করোনা দুর্যোগের মধ্যে সংবাদপত্রের বকেয়া বিজ্ঞাপন বিল পেতে তাঁর সহযোগিতা চান। তারও এক মাস আগে গত ৩০ মার্চ তথ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে নোয়াব, সম্পাদক পরিষদ ও অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন ওনার্স (অ্যাটকো) নেতারা তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিজ্ঞাপন বাবদ সরকারের কাছে পাওনা টাকা দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান। 

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৬ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সরকারের কাছে পাওনা বিজ্ঞাপনের বিল পত্রিকাসহ সব গণমাধ্যমকে পরিশোধের নির্দেশনা দিয়ে ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবকে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বিল পরিশোধের পর বিষয়টি যেন মন্ত্রিপরিষদকে অবহিত করা হয় সে বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে উল্লেখ করা হয় যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন গণমাধ্যম সরকারের অনেক মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের কাছে বিজ্ঞাপন বাবদ বিল পায়। করোনা পরিস্থিতির কারণে সরকারি দপ্তর বন্ধ থাকায় অনেক বিল জমে গেছে। এ সময় জরুরি কাজের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যম খাতের আর্থিক কার্যক্রম চালাতে সমস্যা হচ্ছে। এমন অবস্থায় সব সরকারি প্রতিষ্ঠান যেন তাদের কাছে বকেয়া থাকা পত্রিকা ও অন্য সব গণমাধ্যমের বিল পরিশোধ করেন। অথচ এখন পর্যন্ত বিল পরিশোধ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নেই—এই অজুহাতে অনেক মন্ত্রণালয় বিল পরিশোধের কোনো উদ্যোগই নেয়নি বলে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে কথা বলে ধারণা পাওয়া গেছে। এই অবস্থায় বকেয়া বিল দ্রুত পরিশোধ করার জন্য প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে গত ১২ মে তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আবার তাগিদপত্র পাঠানো হয়েছে।

এদিকে সরকারি ক্রোড়পত্র বাবদ সরকারের কাছে পাওয়া বিলের টাকা দ্রুত পরিশোধের জন্য তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। কিন্তু গেল দেড় মাসেও তা পরিশোধ করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পরই আমরা তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপন বাবদ সরকারের কাছে পাওয়া টাকা অবিলম্বে পরিশোধের দাবি জানিয়েছি। আমরা বলেছি, এটা গণমাধ্যমের পাওনা টাকা। আজ হোক আর দুই দিন পরে হোক দিতে হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে এই টাকাটা পরিশোধ করা হলে এটাকে আমরা সরকারের প্রণোদনা হিসেবেই বিবেচনা করব। কিন্তু এত দিনেও এই টাকাটা পরিশোধ না করা খুবই দুঃখজনক। চলতি বাজেট থেকেই এই বকেয়া পরিশোধের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানাব।’ তিনি আরো বলেন, সরকারের কাছ থেকে বকেয়া পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের মালিক-কর্তৃপক্ষের উদ্যোগেও ঘাটতি রয়েছে, তারা এ জন্য সরকারের সঙ্গে কোনো দর-কষাকষিই করতে পারেনি বলে তিনি মনে করেন।

তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা যাতে ঠিকমতো হয়, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ক্রোড়পত্রের বিল দেওয়ার ব্যবস্থা করছি আমরা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে বকেয়া বিল দ্রুত পরিশোধ করার জন্য। আমাদের মন্ত্রণালয় থেকেও একটি তাগাদাপত্র দেওয়া হয়েছে। ইতোপূর্বে কখনো এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এরূপ চিঠিও দেওয়া হয়নি। এখন দেওয়া হয়েছে। আশা করছি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় দ্রুত গণমাধ্যমের পাওনা টাকা পরিশোধ করবে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা