kalerkantho

বুধবার । ২৪ আষাঢ় ১৪২৭। ৮ জুলাই ২০২০। ১৬ জিলকদ  ১৪৪১

ঈদে রাজধানী ছাড়ার মিছিল

► কেউ হেঁটে কেউ গাদাগাদি করে রওনা দিয়েছে
► যাত্রীর চাপে ফেরি চলাচলও বন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঈদে রাজধানী ছাড়ার মিছিল

ভয়ংকর যাত্রা : ঈদের সময় নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার এমন দৃশ্য আমরা দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু করোনা সংকটের এই সময়ে ফেরিতে গাদাগাদি করে যাত্রা আতঙ্কই তৈরি করে। মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঈদ যাত্রায় আগেই বাগড়া বসিয়েছে করোনা। তাই এবার রানওয়ে থেকে আকাশে উড়বে না উড়োজাহাজ, সড়কপথ দাপাবে না বাস, রেলপথে শোনা যাবে না ট্রেনের কু ঝিকঝিক ধ্বনি কিংবা নৌপথে সারেং বাজাবে না লঞ্চের ভেঁপু। তার পরও করোনার এই দুঃসময়ে গ্রামের বাড়িতে নোঙর ফেলতে চাইছে আবেগী মানুষ। বাড়ি যাওয়ার সব সহজ পথ রুদ্ধ থাকলেও জীবনবাজিতে কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে গ্রামে পৌঁছানোর ‘দুঃসাধ্য যুদ্ধ’ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এবারের ঈদুল ফিতরের লম্বা ছুটিতে যার যার কর্মস্থলে অবস্থানের জন্য রয়েছে সরকারি নির্দেশনা। তার পরও চলছে রাজধানী ঢাকা ছাড়ার মিছিল। গ্রামে ফেরা মানুষের স্রোত বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে রিকশা, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, পিকআপ কিংবা মালবাহী ট্রাক। তবে যেতে হচ্ছে ভেঙে ভেঙে। যারা একটু চতুর, তারা ‘রোগী নাটক’ সাজিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সে চেপে ঢাকা ছাড়ছে। বিত্তবানরা নানা ছুতোয় প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাস হাঁকিয়ে ছুটছে। তবে ঈদের আগের চার দিন ও পরের দুই দিন সব পরিবহন বন্ধ থাকবে—এমন খবরে যানবাহন চলাচল অনেক বেড়ে গেছে। এদিকে পাটুরিয়া ঘাট, শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী ঘাটসহ বঙ্গবন্ধু সেতুতে ছিল যানবাহন ও মানুষের চাপ। যাত্রীর চাপে শেষ পর্যন্ত দৌলতদিয়া, শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

করোনাকাল ভুলে ঈদ সামনে রেখে গতকাল সোমবার রাজধানীর রং অনেকটাই পাল্টে যায়। গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও রাজধানীতে ব্যক্তিগত যানবাহনের স্রোত ছিল ঠিকই। ফিরে এসেছিল চেনা যানজট। প্রাইভেট কারের সঙ্গে প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশাও দাপিয়েছে সমান তালে। সড়কে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা থাকলেও রাজধানীর প্রবেশদ্বারে ঢাকা ছাড়া মানুষকে ফেরাতে তাদের খুব একটা উৎসাহী মনে হয়নি।

আর রাজধানীর মোড়ে মোড়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চোখে পড়ে। তবে তাদের বেশির ভাগেরই রাজধানীর মধ্যে চলাচলে খুব একটা আগ্রহী ছিল না। তারা দূরপাল্লার যাত্রী ধরতেই বেশি ব্যস্ত ছিল। বিশেষ করে গাবতলী, আব্দুল্লাহপুর, যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানী থেকে বের হওয়ার মুখে এসব বাহনের প্রভাব ছিল বেশি। একেকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ডেকে ডেকে তিন-চারজন যাত্রী জড়ো করে দূরের পথে যাচ্ছেন চালকরা। যাত্রীদের নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি ভাড়া খরচ হলেও তারা ঢাকা ছাড়ছে।

মিরপুরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. সানোয়ার তাঁর পরিবার নিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় নিজ গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে ফেরেন। তিনি বলেন, ‘আমার খাবারের দোকান। এখন যে অবস্থা, মাঝেমধ্যে দোকান খুললেও তেমন বেচাকেনা হয় না। ঈদের পরও ১০-১৫ দিন একই অবস্থা থাকবে। এর মধ্যে ঢাকায় থাকাই কষ্টকর। আবার অনেক খরচও হবে। তাই বাড়ি চলে এলাম। রিকশা, অটোরিকশা, মাহিন্দ্রাসহ একাধিকবার গাড়ি বদলাতে হয়েছে। তিনজনের তিন হাজার টাকার বেশিই খরচ হয়েছে। সাধারণ সময়ে তিনজনের বাড়ি পৌঁছতে এক হাজার টাকার বেশি লাগত না।’   

গতকাল যাত্রাবাড়ী মোড়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে বসে ছিলেন চালক মোখলেছুর রহমান। তিনি মিরপুরের যাত্রী পেয়েও গেলেন না। তিনি জানান, ঢাকা শহরে তিনি ভাড়া নেন না। দূরের রাস্তায় ভাড়া নেন। দাউদকান্দির যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছেন। রাস্তা ফাঁকা থাকায় দ্রুত যেতে পারবেন। ভাড়াও বেশি পাওয়া যায়। দিনে একবার যাওয়া-আসা করতে পারলে দু-তিন হাজার টাকা আয় হয়।

গতকাল দুপুর পৌনে ২টার দিকে যাত্রাবাড়ী মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, পুলিশের কোনো চেকপোস্টই নেই। ঢাকা থেকে মানুষ বেরিয়ে যাচ্ছে আবার ঢাকায় ঢুকছেও। এ ক্ষেত্রে দিনের বেলায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল ব্যবহার করা হচ্ছে বেশি। আর রাতে যাত্রীরা পিকআপে যাওয়ার চেষ্টা করে। 

পিকআপের একজন চালক জানান, সন্ধ্যার পর বিভিন্ন মোড়ে অনেক যাত্রী বসে থাকে, যারা গ্রামে যাবে। সেই সব যাত্রী উঠিয়ে রাতের বেলা দিয়ে আসা হয়। এতে টাকাও বেশি আয় হয় আর ওই লোকজনেরও উপকার হয়। রাতের দিকে পুলিশও ঝামেলা করে না। বিশেষ করে রাত ১০ টার পর হাইওয়ে খালিই পাওয়া যায়। আর যদি কোনো জায়গায় আটকে ফেলে তখন যাত্রী এবং আমরা অনুনয়-বিনয় করে ছাড়া পাই।

হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে কথা হয় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক আবদুস সালামের সঙ্গে। তিনি জানান, একজন যাত্রী যদি যাত্রাবাড়ী থেকে সিলেট যেতে চায় তাঁর পক্ষে যাওয়া সম্ভব। তবে ভেঙে ভেঙে যেতে হবে। পাশেই থাকা আরেক চালক জানান, তাঁরা যখন ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে গ্রামের দিকে যান তখন যাত্রীদের শিখিয়ে নেন তারা যেন পুলিশের কাছে সত্য কথা না বলেন। যেখানে পুলিশের চেকপোস্ট তার আশপাশের এলাকায় যাচ্ছেন, এমন বলেন। এভাবেই কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ নানা জেলায় ভাড়ায় যান তাঁরা।

সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের পাশাপাশি যাত্রাবাড়ী মোড়ে মোটরসাইকেল নিয়ে চালকদের বসে থাকতে দেখা যায়। হাফিজুর রহমান নামের এক চালক জানান, বেকারত্বের কারণে তিনি দেড় বছর ধরে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন। গত ২৬ মার্চ থেকে লকডাউন শুরু হওয়ার পর ঘরে বসে থাকতে হয়। যা কিছু টাকা জমিয়েছিলেন তা শেষ হয়ে যাওয়ায় আবার বের হয়েছেন। দূরপাল্লার যাত্রী বহন করলে ভাড়া অনেক বেশি পাওয়া যায়। মোটরসাইকেলকে পুলিশ খুব বেশি ঝামেলা করে না।

এদিকে গাজীপুর হয়ে ব্যাপকসংখ্যক মানুষ গ্রামে ফিরতে শুরু করছে। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় পিকআপ, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, বেবিট্যাক্সি, মোটরসাইকেল ভাড়া করে এমনকি ব্যাটারিচালিত রিকশায় গাদাগাদি করে ফিরছে তারা। গতকাল দুপুরে টঙ্গী বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর থেকে টঙ্গী বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যানবাহনের দীর্ঘ সারি। প্রতিটি যানবাহনের ভেতরই নারী-শিশুসহ যাত্রীতে ঠাসা। আব্দুল্লাহপুর ও টঙ্গীতে চেকপোস্ট থাকলেও পুলিশ এসব যানবাহনে যাত্রী পরিবহনে বাধা দিতে খুব একটা আগ্রহী হচ্ছে না। হঠাৎ যাত্রী নামিয়ে দিলেও একটু হেঁটে সামনে গিয়ে আবার উঠছে যাত্রীরা।

এদিকে দক্ষিণবঙ্গমুখী অব্যাহত জনস্রোত থামাতে অবশেষে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল বিকেল ৩টা থেকে এই নৌপথে সব ধরনের ফেরি সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি পণ্যবাহী কোনো ট্রাকও পারাপার করা হবে না। তবে লাশবাহী কোনো গাড়ি এলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে পারাপার করা হতে পারে।

বিআইডাব্লিউটিসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় কথা বলে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ২৬ মার্চ থেকে এই পথে লঞ্চ, সিবোটসহ সব ধরনের নৌ চলাচলও বন্ধ রয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কয়েকটি চেকপোস্ট থাকায় যাত্রীদের নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অনেক গাড়িকে আবার সেখান থেকে উল্টো পথে ফিরিয়েও দেওয়া হচ্ছে। তার পরও যাত্রীরা ভেঙে ভেঙে ছোট ছোট যানবাহনে করে শিমুলিয়া ঘাটের অদূরে চলে আসছে গ্রামের ভেতর দিয়ে।

ঈদ সামনে রেখে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে ভেঙে ভেঙে বাড়ি ফিরছে দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ। গতকাল সকালে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে। লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় ফেরিতে গাদাগাদি করে তারা নৌপথ পাড়ি দেয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওই দিন (গতকাল) দুপুর থেকে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে সব ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয় বিআইডাব্লিউটিসি।

বিআইডাব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক মো. আবু আব্দুল্লাহ বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এই নৌপথে শুধু রোগীবাহী অ্যাম্বুল্যান্সসহ জরুরি পণ্যবাহী ট্রাক পারাপারের জন্য মাত্র একটি ফেরি সচল রাখা হয়েছে।’

গণপরিবহন না চললেও ঈদ সামনে রেখে মালবাহী ও খাদ্যবাহী ট্রাক, পিকআপ, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল চলাচল বেড়ে যাওয়ায় বঙ্গবন্ধু সেতুতে গাড়ির চাপ বাড়তে শুরু করেছে। অনেকেই ছোট পরিবহনে চেপে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে গাজীপুরের চন্দ্রা হয়ে প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসে করে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যেতে শুরু করেছে। আবার অনেকে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল নিয়ে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল পর্যন্ত যাচ্ছে। এরপর সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ নানা যানবাহনে নিজ নিজ গন্তব্যে যাচ্ছে।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন গাজীপুরের নিজস্ব প্রতিবেদক, মুন্সীগঞ্জ, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর ও রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ প্রতিনিধি)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা