kalerkantho

বুধবার । ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩ জুন ২০২০। ১০ শাওয়াল ১৪৪১

করোনায় দিশাহারা ১০ লাখ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী

শরীফুল আলম সুমন   

১৬ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনায় দিশাহারা ১০ লাখ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে গত ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে দেশের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই অবস্থায় সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে না হলেও দিশাহারা হয়ে পড়েছেন ১০ লাখ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী। বেতনের সঙ্গে প্রাইভেট টিউশনিও বন্ধ হওয়ায় সংকট আরো বেড়েছে। শিক্ষক বলে সমাজে একটা ভিন্ন অবস্থান থাকায় কারো কাছে হাতও পাততে পারছেন না, আবার নিজেও চলতে পারছেন না।

জানা যায়, প্রতিষ্ঠান থেকে মাসিক বেতনের বাইরে বেসরকারি শিক্ষকদের আয়ের অন্যতম উৎস ছিল প্রাইভেট-টিউশনি। কিন্তু করোনার প্রভাবে সেই প্রাইভেটও বন্ধ। তবে রাজধানীতে দু-চারজন শিক্ষক যাঁরা অনলাইনে পাঠদান করাচ্ছেন তাঁরা মূলত এমপিওভুক্ত বা ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষক। আর শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ব্যাপারে খুব বেশি সাড়া দিচ্ছেন না অভিভাবকরা। ফলে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই তাদের ফান্ড থেকে মার্চ মাসের বেতন দিলেও এপ্রিল মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস অনেকটাই অনিশ্চিত। এমনকি সরকারের কাছে বেসরকারি শিক্ষকদের একাধিক সংগঠন প্রণোদনার আবেদন করলেও তাতে সাড়া মেলেনি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রণোদনা দেওয়ার ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তেমন ভূমিকা নেই। কেউ যদি আমাদের কাছে আবেদন করেন তাহলে নিয়মানুযায়ী আমরা সেগুলো অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেব।’

সবচেয়ে বেশি বিপদে রয়েছেন নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা। দেশে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার নন-এমপিও স্কুল-কলেজ ও মাদরাসায় এক লাখ ১০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। যাঁদের মধ্যে সম্প্রতি দুই হাজার ৬১৫ প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হওয়ায় ৩০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর বেতনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন ৮০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী।

বাংলাদেশ নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যক্ষ গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানে এমনিতেই শিক্ষকরা তেমন বেতন পান না। বেশির ভাগ শিক্ষকই প্রাইভেট-টিউশনি করেন। কিন্তু এখন সবই বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিন আমার কাছে শত শত শিক্ষকের আক্ষেপ আর হাহুতাশের খবর আসে। কিন্তু কিছুই করতে পারছি না। শর্ত শিথিল করে হলেও দ্রুততার সঙ্গে নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবি জানাচ্ছি।’

দেশে প্রায় ৫০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ছয় লাখ শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠান ভাড়াবাড়িতে চলে। আর শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর এসব প্রতিষ্ঠান শতভাগ নির্ভরশীল। টিউশন ফির টাকায়ই বাড়িভাড়া, নানা ধরনের বিল ও শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের সন্তানরা পড়ালেখা করায় তাঁরা স্কুল বন্ধের সময়ে কেউ বেতন দিতে পারছেন না, আবার কেউ দিতেও চাচ্ছেন না। ফলে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন এসব স্কুলের শিক্ষকরা। এরই মধ্যে কিন্ডারগার্টেনের দুটি সংগঠন পৃথকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে সরকারের কাছে প্রণোদনাও চেয়েছেন।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মনোয়ারা ভূঞা বলেন, ‘অভিভাবকরা টিউশন ফি দিচ্ছেন না, তাই আমরাও শিক্ষকদের বেতন, বাড়িভাড়া দিতে পারছি না। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনা চেয়েছি। সরকার আমাদের সহায়তা না করলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় থাকবে না।’

করোনার মধ্যে করুণ অবস্থায় জীবন যাপন করছেন ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকরা। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে চার হাজার ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২১ হাজার শিক্ষক থাকলেও বাস্তবে মাদরাসার সংখ্যা অনেক বেশি। এর মধ্যে মাত্র এক হাজার ৫১৯টি মাদরাসার প্রধান শিক্ষকদের ২৫০০ টাকা ও সহকারী শিক্ষকদের ২৩০০ টাকা ভাতা দেয় সরকার। তবে চলতি অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিতে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি ও বরাদ্দ থাকলেও কাজ শেষ করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষক পরিষদ সভাপতি এস এম জয়নাল আবেদিন জিহাদী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে আমাদের মাদরাসা এমপিওভুক্তির বরাদ্দ থাকলেও তা আটকে আছে। করোনার মধ্যে আমাদের শিক্ষকরা চরম কষ্টে জীবন যাপন করছেন। আর কত দিন বেতন ছাড়া চাকরি করব আমরা? চলতি অর্থবছরের মধ্যেই ইবতেদায়ি মাদরাসা এমপিওভুক্তি ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি।’

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক আবেদনে বেসরকারি কারিগরি খাতের উদ্যোক্তারা এক হাজার ২০০ কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনা চেয়েছেন। টেকনিক্যাল এডুকেশন কনসোর্টিয়াম অব বাংলাদেশের (টেকবিডি) সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল আজিজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১০ হাজার ৪৫২টি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯ হাজার ৭৫৯টিই বেসরকারি। করোনার প্রাদুর্ভাবের মধ্যে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। প্রায় দুই লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন পরিশোধই এখন দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় আমরা সরকারি প্রণোদনা না পেলে অনেক প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হয়ে যাবে। তাই আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আর্থিক প্রণোদনার আবেদন করেছি।’

দেশে এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৫টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হবে। বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ করলেও সমস্যায় আছে ছোট ও মাঝারি বিশ্ববিদ্যালগুলো। প্রায় ৭৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।

বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাঝারি ও ছোট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশ সমস্যায় আছে। কারণ সেমিস্টার পরীক্ষার আগে সাধারণত শিক্ষার্থীরা ফি পরিশোধ করে। কিন্তু করোনার কারণে সেই ফি এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। কেউ হয়তো অর্ধেক বেতন দিয়েছেন। আমরা এ জন্য সরকারের কাছে আর্থিক প্রণোদনা চেয়েছিলাম। কিন্তু সে ব্যাপারে এখনো সাড়া মেলেনি।’

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জি এম নিজাম উদ্দিনও জানিয়েছেন, তাঁরাও সরকারের কাছে আর্থিক প্রণোদনা চেয়েছেন।

জানা যায়, চাপ দিয়ে টিউশন ফি আদায় না করতে এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত তাগিদ দিচ্ছে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ। তবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ বলছে, এই দুর্যোগে অভিভাবকরা টিউশন ফি দিতে খুব একটা আগ্রহী নন। আর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরকার এখনো কোনো প্রণোদনার ব্যবস্থা করেনি। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা