kalerkantho

রবিবার। ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৭ জুন ২০২০। ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

ঢাকার দুই মেয়রের বড় তিন চ্যালেঞ্জ

রফিকুল ইসলাম ও তানজিদ বসুনিয়া   

১৪ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঢাকার দুই মেয়রের বড় তিন চ্যালেঞ্জ

সামনে বর্ষা। কিন্তু তার আগে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে থমকে গেছে ঢাকার দুই সিটির রাস্তাঘাট ও খাল উন্নয়নকাজ। কাজগুলো শেষ না হলে কাটা ও খুঁড়ে রাখা রাস্তার কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হবে নগরবাসীকে। এ অবস্থায় ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আগামী সপ্তাহে দায়িত্ব নেবেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই মেয়রের সামনে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা সংস্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, যানজট নিরসন ও বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা দূরীকরণই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

করোনার কারণে আর্থিক সংকটে পড়া রাজধানীর মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও কর্মসংস্থান তৈরি এবং বায়ুদূষণ কমিয়ে বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলাও তাঁদের জন্য হবে নতুন চ্যালেঞ্জ।

ঢাকার দুই সিটির নিজস্ব ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহারের পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে নগর উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনায় জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রায় সাড়ে তিন মাস পর নবনির্বাচিত দুই মেয়র দায়িত্ব নিচ্ছেন। এর মধ্যে গতকাল বুধবার দ্বিতীয় মেয়াদে ঢাকা উত্তরের মেয়রের দায়িত্ব নিয়েছেন আতিকুল ইসলাম। আর আগামী ১৭ মে দায়িত্ব নেবেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, যিনি ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছিলেন। গত ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এই দুই মেয়র প্রার্থী বিজয়ী হন। ২৭ ফেব্রুয়ারি তাঁরা শপথ নেন।

নির্বাচনী ইশতেহারে ঐতিহ্যের ঢাকা পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাঁচটি রূপরেখা ঘোষণা করেছিলেন মেয়র তাপস। এ পাঁচটি রূপরেখা হলো—ঐতিহ্যের ঢাকা, সুন্দর ঢাকা, সচল ঢাকা, সুশাসিত ঢাকা ও উন্নত ঢাকা। ৩০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে সুস্থ, সচল ও আধুনিক ঢাকা গড়ার লক্ষ্যে ত্রিমুখী ইশতেহার দেন আতিক। ‘সবাই মিলে সবার ঢাকা’ স্লোগান সামনে রেখে ইশতেহারে বছরব্যাপী মশা নিধন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নারীর জন্য নিরাপদ নগরী, দখল ও দূষণমুক্ত নগরী, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা, নিরাপদ সড়ক, ছিন্নমূল পুনর্বাসন, অ্যাপভিত্তিক নাগরিক সমস্যা সমাধান, অনলাইনে সেবা ও স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এখন এগুলো বাস্তবায়নের পালা তাঁদের।

নগরবিদদের মতে, কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, জনগণকে দেওয়া কথার সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে। নগর উন্নয়নের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে। জনগণের সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত ও উন্নয়নে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।

মশা নিয়ন্ত্রণ : দায়িত্ব নেওয়ার পরই মশা নিয়ন্ত্রণের বড় চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে দুই মেয়রকে। বিগত সময়ে ডেঙ্গু ঠেকাতে হিমশিম খেতে হয়েছে দুই সিটির মেয়রকে। শতাধিক মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। মানহীন ওষুধ ব্যবহার করার কারণে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। শহরের নর্দমা, নালা ও আবর্জনাও পরিষ্কার করা হয়নি, সেগুলো মশার প্রজনন স্থান। নতুন দুই মেয়রের শপথ অনুষ্ঠানে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন মশা যেন ভোট না খেয়ে ফেলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।

ফুটপাত দখলমুক্ত : রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ফুটপাত দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে দোকানপাট। সেসব দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলছে ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী। সিটি করপোরেশন রাজস্ব বঞ্চিত হয়। এই ফুটপাত দখলমুক্ত করে মানুষের চলাচলের যথাযথ ব্যবস্থা করতে হবে। পায়ে হাঁটার রাস্তা প্রশস্ত করার দায়িত্ব নিতে হবে দুই মেয়রকে।

পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : দুই সিটিতে দৈনিক প্রায় সাত হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এর মধ্যে সনাতনী পদ্ধতিতে দুই সিটি করপোরেশন ৭০ শতাংশ ময়লা অপসারণ করছে। আর ৩০ শতাংশ বর্জ্য এখনো অপসারণ করতে পারছে না। এসব বর্জ্য শহরের নদী-নালা, খাল-জলাশয়ে মিশছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে শহরে মশার প্রজনন বাড়ছে, বায়ুদূষণ বাড়ছে। বাড়ছে নানাবিধ রোগব্যাধি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা যথাযথভাবে হয় না এমন অভিযোগ নগরবাসীর। সিটি করপোরেশনকে কর দেওয়ার পরও ময়লা নেওয়া হয় না। উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে ময়লা।

গৃহকর আদায়ে অব্যস্থাপনা : সরকারের বরাদ্দের পাশাপাশি গৃহকর সিটি করপোরেশনের আয়ের অন্যতম উৎসব। গৃহকর আদায়ে রয়েছে অব্যবস্থাপনা। বাড়িওয়ালা কর পরিশোধ করতে গেলেও সঠিকভাবে পারেন না। ঘুষ দিয়ে সেবা নিতে হয়। এতে করে অনেকে কর না দিয়েই চলছেন। এতে করে রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে নগর সংস্থা।

যানজট : ঢাকার অন্যতম সমস্যা হচ্ছে যানজট, যা মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট করছে। যানজট নিরসন সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে সম্ভব না। যানজট নিরসনের দায়িত্ব পুরোপুরি সিটি করপোরেশনের না হলেও জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সবাইকে ডেকে সমস্যা সমাধানে নেতৃত্ব দিতে হবে সিটিকে। সহযোগী উন্নয়ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরসন করতে হবে।

জলজট : জলজট বা জলাবদ্ধতা নগরীর আরেকটি বড় সমস্যা। ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত না হওয়া ও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় বর্ষা মৌসুমে নগরীর অনেক এলাকা পানিতে

ডুবে যায়। যদিও এ কাজ একা সিটি করপোরেশনের নয়, ওয়াসা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান জড়িত। কিন্তু যেহেতু জলাবদ্ধতা নিয়ে মেয়রকে ভুগতে হয়। তাঁকেই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হয়।

ঘিঞ্জি পুরান ঢাকা, ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ : ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকা পড়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। এখানকার বাড়ি ও সড়কগুলো ঘিঞ্জি। অনেক ভবন পুরনো হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। পুরান ঢাকার ঘোড়ার গাড়ি, পঞ্চায়েত ব্যবস্থাসহ ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দিয়েছেন মেয়র তাপস। কাজেই ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করা তাঁর জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০১৯-এ মেয়রকে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আগের মেয়ররা সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। কোনো কোনো সময় সমন্বয় করতে গিয়ে বাগযুদ্ধও হয়েছে কিন্তু কার্যত কোনো ফল আসেনি।

ঢাকা সিটির নির্বাচিত দুই মেয়রকে ‘জনপ্রতিনিধি’ হয়ে ওঠাকে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুইজনই নিজ নিজ পেশায় সফল। তবে সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব পালনে অনেক কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেগুলো উতরে জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে হবে।’

অনেক সংস্থা জড়িত থাকায় সিটি করপোরেশন একা চাইলেও অনেক কিছু করতে পারবে না উল্লেখ করে ড. তোফায়েল বলেন, নিজের ক্ষমতার মধ্যে সিটির দুই মেয়রকে প্রথমে ফুটপাত ও খাল দখলমুক্ত করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা ও হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে জোর দিতে হবে। বাড়ির মালিক কর দিলেও ময়লা পরিষ্কার হয় না। বাধ্য হয়ে স্থানীয় ক্ষমতাধরকে টাকা দিতে ময়লা পরিষ্কার করতে হয়। সেটা বন্ধ করতে হবে। জলাবদ্ধতা দূর করতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ট্রাফিক জ্যাম কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। জনগণকে স্বস্তি দিতে অনেক কিছুই করতে হবে মেয়রকে।

নগর বিশেষজ্ঞ স্থপতি ইকবাল হাবিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিটির ক্ষমতা মেয়রকেন্দ্রিক কুক্ষিগত না থেকে কাউন্সিলর নির্ভর হতে হবে। আঞ্চলিক পরিকল্পনা হাতে নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ দিতে হবে। কিন্তু বরাবরই দেখা যায় কাউন্সিলদের গুরুত্ব দেওয়া হয় না।’ তিনি বলেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে নগরীর মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জোর দিতে হবে। ময়লা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ড্রেন ও খাল অবমুক্ত করতে হবে। ভবন সুরক্ষিত কি না সেটাও যাচাই-বাছাই করতে হবে। জনচলাচলের জন্য পরিবেশবান্ধব দূষণমুক্ত গণপরিবহন চালু এবং কঠিন ও তরল বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা করতে হবে। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী প্রথা ফিরিয়ে আনতেও বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা