kalerkantho

শুক্রবার । ৭ কার্তিক ১৪২৭। ২৩ অক্টোবর ২০২০। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

খাদ্যের অভাব হবে না : প্রধানমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি   

২১ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



খাদ্যের অভাব হবে না : প্রধানমন্ত্রী

করোনাভাইরাসজনিত মহামারির কারণে সারা বিশ্বে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা থাকলেও বাংলাদেশে খাদ্য সংকট হবে না বলে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সোমবার গণভবন থেকে এক ভিডিও কনফারেন্সে তিনি বলেন, ‘আমাদের খাদ্যের কোনো অভাব হবে না। এখন ধান উঠছে। ধান কাটাও শুরু হয়ে গেছে। আগামীতেও ফসল উঠবে।’ প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে চলতি মৌসুমে ২১ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটা সরকার কিনে রাখবে। তাতে ভবিষ্যতে কোনো অভাব হবে না। আমরা মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে পারব।’

আসন্ন পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর সরবরাহ সঠিক রাখতে সরকার পদক্ষেপ নেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বাজারে স্বাভাবিক পণ্য সরবরাহ বজায় রাখতে মনিটরিং জোরদার করতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেন।

কিছুদিন আগে সারা দেশ থেকে হঠাৎ গার্মেন্টকর্মীদের ঢাকায় আসার ঘটনা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁদের ডেকে আনা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। তিনি বলেন, সামনে রোজা। আমাদের কিছু জায়গা আস্তে আস্তে উন্মুক্ত করতেই হবে। গাজীপুরে করোনা প্রাদুর্ভাব খুব বেশি তাই আগামী ২৪ বা ২৫ তারিখে কারখানা চালু করা ঠিক হবে কি না, সেটা ভেবে দেখতে হবে। কতসংখ্যক রোগী আছে বা পরীক্ষায় কতজন শনাক্ত হয়েছে, এ বিষয়গুলো আগে জানতে হবে। পিপিই, মাস্কসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম সঠিকভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে কি না, সেদিকে কড়া নজর রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। কারা নকল জিনিস সরবরাহ করছে এবং সেগুলো কারা গ্রহণ করছে, সে তথ্য তাঁকে জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকালে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে সর্বশেষ করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের আটটি জেলার জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা ভিডিও কনফারেন্সে মতবিনিময় করেন। জেলাগুলো হচ্ছে ঢাকা বিভাগের মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ সদর। প্রধানমন্ত্রী এর আগে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে চার দফা ভিডিও কনফারেন্সে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট এবং বরিশাল বিভাগের ৪৩টি জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানুষকে সচেতন করতে পেরেছি বলেই করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সবাই সচেতন হলে করোনা থেকে বাঁচা সম্ভব হবে। আপনারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন এবং অযথা ঘোরাঘুরি করে নিজেকে এবং অন্যের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলবেন না।’ তিনি দেশের মানুষকে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলায় কোনো আবাদি জমি ফেলে না রেখে তরিতরকারি ও ফলমূল উৎপাদন করার জন্য আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ সংকটে দেশে যেন খাদ্যের সমস্যা না হয়, সে জন্য সব জমিতে ফসল ফলাতে হবে। দেশের এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে, সেদিকে সবাই দৃষ্টি দেবেন।’ ধান কাটায় সহযোগিতার জন্য তিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক এবং ছাত্রসমাজের প্রতি পুনরায় আহ্বান জানান। এ জন্য ২০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, ‘যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, তা শুধু এই বছরের জন্য না। আগামী তিন বছর দেশের অর্থনীতির চাকা যাতে সচল থাকে, সেটা মাথায় রেখেই এই প্রণোদনা। এটা অব্যাহত রাখা হবে।’

গার্মেন্ট শ্রমিকদের ডেকে আনা ঠিক হয়নি : কিছুদিন আগে সারা দেশ থেকে হঠাৎ গার্মেন্টকর্মীদের ঢাকায় আনা কোনোমতেই ঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই আসা-যাওয়ায় তাঁরা খুব কষ্ট পেয়েছেন। পরদিনই তাঁদের বলা হয়েছে চলে যেতে। যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় মাইলের পর মাইল মেয়েরা অভিভাবকদের সঙ্গে করে হেঁটে হেঁটে এসেছেন। এভাবে তাঁদের যেন কোনোভাবেই এসে না পড়তে হয়। তাঁদের আনতে হলে আগে ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁরা যেন স্বাস্থ্য বিষয়ে সুরক্ষা রেখে থাকতে পারেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গাজীপুরে ২৭৯ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। যেভাবে বাড়ছে এই বাড়ার ট্রেন্ডটা তো ঠিক না। লকডাউন করতে হবে, সেটা বুঝে নিয়েই আপনাদের ইন্ডাস্ট্রি খোলার কথা ভাবতে হবে। নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে। আমিও চাই না একেবারে বন্ধ থাকুক। সীমিত আকারে শ্রমিক আসতে হবে এবং তা ওভাবে চালু করতে হবে। কারখানার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে তারপর আপনারা ঠিক করবেন।’

সারা দেশে ৫০৭ প্রতিষ্ঠান কোয়ারেন্টিন সেন্টারের জন্য প্রস্তুত : প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারা দেশে ৫০৭ প্রতিষ্ঠান কোয়ারেন্টিনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের থাবা এসে পড়েছে। সবাইকে এ ব্যাপারে সুরক্ষিত থাকতে হবে। আমাদের দেশের অনেকেই এটি ভালোভাবে মানতে চায় না। যার ফলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে।

কিশোরগঞ্জের মানুষ কিশোরই থেকে গেছে : কিশোরগঞ্জ জেলার সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানতে চান, ‘কিশোরগঞ্জে এত ধান হয়, সেখানে আধুনিক রাইসমিল আছে?’ জবাবে ভিডিও কনফারেন্সে কিশোরগঞ্জ প্রান্তে উপস্থিত একজন বলেন, ‘এখানে কোনো রাইসমিল নাই। আপনার বদন্যতায় ও মহামান্য রাষ্ট্রপতির চেষ্টায় যোগাযোগব্যবস্থা হইছে।’ উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসলে তা না। কিশোরগঞ্জের মানুষ কিশোরই থেকে গেছে। তারা চিন্তাই করে নাই যে রাইসমিল লাগবে। ইউনিভার্সিটি করা, হাওরে মাছ ওঠে সেটার জন্য হ্যাচারি তৈরি করা, মাছ ধরে রাখা—এগুলো নাই।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার মনে হয়, ওখানে অনেক ব্যবসায়ী আছেন। একটা আধুনিক রাইসমিল যদি করা যায়, তাহলে কৃষকরা যত ধান পাবেন, আমরাও সেই ফসল রাখতে পারব।

বিশ্ব পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন যে অবস্থা, এটা কত দিন চলবে সেটা কেউ বলতে পারে না। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অবস্থা স্থবির। জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে সবাই বলছেন, সারা বিশ্বে দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে। সে কারণে আমরা প্রণোদনা দিয়েছি। সেটা আশু করণীয়, আবার দীর্ঘমেয়াদি। তিন বছরের জন্য আমাদের শিল্প-কলকারখানা, কৃষি সব ক্ষেত্রেই আমরা কিন্তু ব্যবস্থা নিয়েছি।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশে যদি খাদ্য উৎপাদন করে মজুদ রাখতে পারি, তাহলে আমরা সেই দুর্ভিক্ষে পড়ব না। সেই ব্যবস্থা এখন থেকে নিতে হবে।

জেলার ত্রাণ-স্বাস্থ্য তদারকির দায়িত্বে সচিবরা : জেলাগুলোর ত্রাণ কার্যক্রম ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়গুলো যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করার দায়িত্ব সচিবদের দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমাদের সচিবরা আছেন। যেহেতু এখন মন্ত্রণালয়ের কাজ অনেকটা সীমিত হয়ে গেছে তাই একেকটা জেলায় একেকজন সচিবকে দায়িত্ব দিয়েছি, ত্রাণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার কাজগুলো যথাযথভাবে হচ্ছে কি না সেই খোঁজখবর তাঁরা নেবেন এবং সেই রিপোর্ট আমাকে দেবেন।’

বক্সে লেখা এন-৯৫, ভেতরে ভিন্ন জিনিস : পিপিই, মাস্কসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম সঠিকভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে কি না, সেদিকে কড়া নজর রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কনফারেন্সের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের মন্ত্রীর কাছে কিছু ছবি পাঠিয়েছি। যারা সাপ্লাই দেয়, তারা সঠিকভাবে সঠিক জিনিস দিচ্ছে কি না? মহানগর হাসপাতালে কিছু জিনিস গেছে, পিপিই নাম করে দিয়েছে; কিন্তু ভেতরে জিনিসগুলো ঠিকমতো যায়নি। এটা আপনাদের সব সময় দেখা উচিত। সঠিক জিনিসটা কিনছি কি না দেখা দরকার, বিষয়গুলো একটু দেখবেন।’

এ সময় কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহিদ উল্লাহ বলেন, ‘আমরা নিম্নমানের হওয়ার কারণে এক লাখ ৭০ হাজার পিপিই ফেরত দিয়েছি। দেশের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে হয়তো আমাদের ভুল হয়ে থাকতে পারে। এখন আমরা চাচ্ছি, এই ভুলগুলো যেন না হয়।’

‘পিপিই বানানোর কথা বলে অন্য পণ্য বানাচ্ছেন গার্মেন্ট মালিকরা’ গাজীপুরের এসপি শামসুন্নাহার কনফারেন্সে জানান, গাজীপুরে অনেক পোশাক শিল্প কারখানায় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) বানানোর কথা বলে অন্য পণ্য বানানো হচ্ছে। শ্রমিকদের ডেকে এনে কাজ করালেও তাঁদের বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধিও মানা হচ্ছে না। আগামীতে পোশাক কারখানা চালু করতে আবারও শ্রমিকদের ডেকে আনা হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়তে পারে। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশন প্রদান করতে হবে। বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হকের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) দেওয়া একটি চিঠির প্রসঙ্গ তুলে ধরে এসব কথা বলেন গাজীপুরের এসপি। বিজিএমইএ সভাপতি আগামী ২৬ এপ্রিল গাজীপুরে বেশ কিছু রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে শ্রমিকদের আনার জন্য বাসের ব্যবস্থা করতে এ চিঠি দেন বলে জানান তিনি।

সামাজিক দূরত্ব না মেনেই কনফারেন্সে গাজীপুর জেলা প্রশাসন : সামাজিক দূরত্ব না মেনেই গতকাল ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দেয় গাজীপুর জেলা প্রশাসন। তারা অনেকটা কাছাকাছি বসেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনারা যে রকম ঠাসাঠাসি করে বসেছেন তাতে তো আদৌ...।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা