kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

অবকাঠামো ঠিক হলেও চিকিৎসায় বেতাল!

► কুয়েত মৈত্রী ও কুর্মিটোলা হাসপাতাল ছাড়া অন্যগুলো রোগী রাখার মতো অবস্থায় আসেনি
► শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পরীক্ষা ও সেবা কিছুই করা যাচ্ছে না
►কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে অভিযোগ বাড়ছে রোগী ও চিকিৎসাকর্মীদের

তৌফিক মারুফ   

৯ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



অবকাঠামো ঠিক হলেও চিকিৎসায় বেতাল!

করোনার উপসর্গ থাকুক বা না থাকুক সব হাসপাতালেই সবার চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশনা আছে সরকারের। কোনো রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। আবার যে হাসপাতালগুলো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হিসেবে চালু করা হয়েছে সেগুলোতে শুধুই করোনা রোগীদের প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসা দেওয়া হবে। তবে গতকাল বুধবারের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ এবং একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ঘুরে পাওয়া গেছে ভিন্ন চিত্র। কয়েক দিন ধরে বারবারই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ঢাকায় সরকারি হাসপাতালের মধ্যে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহানগর জেনারেল হাসপাতাল, রেলওয়ে হাসপাতালসহ মিরপুর লালকুঠি হাসপাতালের নাম। এর মধ্যে কুয়েত মৈত্রী ও কুর্মিটোলা হাসপাতালে রোগী থাকলেও বাকিগুলো এখনো আছে শুধু কাগজপত্রে সীমাবদ্ধ। ধীরগতিতে এগোচ্ছে ওই হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি। তবে কয়েক দিন ধরে যে হারে রোগী শনাক্ত হচ্ছে, তাতে দ্রুত অন্য হাসপাতালগুলোও পুরোপুরি প্রস্তুত করা না গেলে বাড়তি রোগী নিয়ে মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও করোনা মোকাবেলায় সরকার মনোনীত বিশেষজ্ঞ কমিটির ঢাকা বিভাগীয় সমন্বয়কারী অধ্যাপক ডা. শাহ মুনির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন আর ধীরে কাজ করার সুযোগ নেই। যা করার দ্রুতই করতে হবে। রোগীর চাপ বেড়ে যাচ্ছে। যদিও কুয়েত মৈত্রীর পরই ৫০০ বেডের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে রোগী দেওয়া হবে। এ জন্য কুর্মিটোলা হাসপাতালের অন্য রোগীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আগের যন্ত্রপাতির সঙ্গে আরো যন্ত্রপাতি যুক্ত করা হচ্ছে।

এদিকে সকাল সাড়ে ৭টায় অচেনা নম্বর থেকে ফোন করে নিজের পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার করোনা পজিটিভ। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে আছি। গতকাল মঙ্গলবার রাত থেকেই আমার শ্বাসকষ্ট বাড়ছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’ সকাল সাড়ে ১০টায় একই হাসপাতাল থেকে আরেক ব্যক্তি নিজেকে ওই হাসপাতালের চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘ভাই, আমাদের এখানে এন৯৫ মাস্ক নাই। আমরা রোগীর কাছে যাব কিভাবে!’ একই মোবাইল ফোনে আরেক চিকিৎসক অংশ নিয়ে বলেন, ‘এখানে জনবল খুবই কম। কাল সন্ধ্যায় খাবার এনে একজন গেটে রেখে গেছে, কিন্তু সেই খাবার আমার হাতে এসেছে রাত ১১টায়, দেখি খাবার নষ্ট হয়ে গেছে। গেট থেকে খাবার কেউ আমাকে পৌঁছে দেবে এমন লোক ছিল না এখানে।’

এ পর্যন্ত দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগীই চিকিৎসাধীন আছে উত্তরায় কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে। যদিও ওই হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. শিহাব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিচের দিকে জনবলের ঘাটতি রয়েছে। আগে পদই সৃষ্টি হয়নি। এখন সেই সমস্যা কেটে যাচ্ছে। আপাতত কষ্ট করে চালিয়ে নিচ্ছি। এ ছাড়া তেমন কোনো সমস্যা নেই। কেউ কেউ বেশি ভীতসন্ত্রস্ত থাকার ফলে রোগীর কাছে যেতে কিছুটা ইতস্তত করে, আমি তাদের সাহস জুগিয়ে যাচ্ছি। পিপিইর কোনো সমস্যা থাকলে আমি যেভাবে পারছি, সংগ্রহ করে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি।’

এদিকে সরকার নির্ধারিত মহাখালীতে শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালকেও অন্যতম বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য। ২৫০ শয্যার দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক সব নকশা-সরঞ্জামে নির্মিত ভবনটি দেশের যেকোনো বড় অত্যাধুনিক পাইভেট হাসপাতালের মতোই চাকচিক্যপূর্ণ। তবে গতকাল ওই হাসপাতাল ঘুরে এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, করোনা রোগীদের পরীক্ষা বা চিকিৎসা কোনোটির জন্যই প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি নানা জটিলতার কারণে। এ নিয়ে রীতিমতো অসহায় অবস্থায় পড়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

তবে ওই হাসপাতালের প্রধান ফটকের বাইরে অপেক্ষমাণ এক রোগীর স্বজন জানান, তাঁরা ওখানকার পুরনো রোগী, লিভারের সমস্যার জন্য ফলোআপ করতে এসেছেন; কিন্তু তাঁরা ভেতরে ঢুকতেই পারেননি। নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁদের জানিয়ে দিয়েছেন, এখন এখানে আর কোনো চিকিৎসা হবে না।

ওই ব্যক্তি বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে মিরপুর থেকে রিকশায় করে এখানে এলাম; কিন্তু এখন শুনলাম এখানে করোনা ছাড়া আর কোনো চিকিৎসা হবে না। তাহলে এখন আমরা কোথায় যাব? প্রাইভেটে তো অনেক বেশি খরচ।’

অন্যদিকে গতকাল বিকেলে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি থাকা ইয়াকুব আলী নামের এক ব্যাংক কর্মকর্তার স্ত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনার উপসর্গ নিয়ে তাঁর স্বামী ওই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আগের রাতে; কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ডাক্তার তাঁকে দেখতে যাননি।

এদিকে গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোগী ফিরিয়ে দেওয়া হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করায় গতকাল বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপস্থিতি কিছুটা বেড়েছে। তবে জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টের উপসর্গ শুনলেই হাসপাতালের কর্মী ও চিকিৎসকরা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

গতকাল বিকেলে গুলশানে সাহাবুদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ফোন করে অ্যাম্বুল্যান্সের সহায়তা চাইলে জানানো হয়, আপাতত এই হাসপাতালের অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিস বন্ধ আছে। পরে জ্বর-শ্বাসকষ্ট থাকা এক রোগীকে নিয়ে যাওয়ার কথা জানালে ফোন কলটি জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসককে দেওয়া হয়। ওই চিকিৎসক বলেন, ‘বুঝতেই তো পারছেন; এখন জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্টের রোগী নিয়ে একটু সমস্যা আছে। এ ধরনের উপসর্গ থাকলে আপনারা সরাসরি কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নিয়ে যান।’ তিনি কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের ফোন নম্বরও জানিয়ে দেন।

প্রস্তুত নয় গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল : মহাখালীতে এই হাসপাতালে নিচতলায় কিছুটা আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে করোনার উপসর্গ থাকা রোগীদের জন্য। এ ছাড়া ওখানে পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখনো শুরু হয়নি। কারণ জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. ফারুক আহম্মেদ বলেন, ‘শুধু যন্ত্র হলেই তো হবে না। ল্যাবের আরো অনেক কারিগরি বিষয় আছে। যারা নমুনা সংগ্রহ করবে সেই জনবল লাগবে। আমার তো মাত্র দুজন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট আছে, কিন্তু তাদের তো প্রশিক্ষণও নেই। তারাও আবার স্থায়ী পদের লোক নয়, আউটসোর্সিংয়ের আওতায় চতুর্থ শ্রেণির কর্মী দেখিয়ে তাদের নেওয়া হয়। পরীক্ষা শুরু করতে আরো কিছু প্রস্তুতি বাকি আছে।’

রোগী না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে ওই পরিচালক বলেন, ‘আগেই তো বললাম শুধু ভবন বা বেড হলেই তো হবে না, এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক অনেক কিছু জড়িত। সেগুলোর তো কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। এখনো অক্সিজেনের কোনো সুরাহা করতে পারছি না। এ ছাড়া আটটি আইসিইউ ইউনিটের কাঠামো, বেড, ভেন্টিলেটর বসানো সম্পন্ন হলেও এর সঙ্গে যে আরো কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপকরণ ও যন্ত্র দরকার, তার ব্যবস্থা হয়নি। এ অবস্থায় যদি একজন রোগীও ভর্তি নিই তবে অন্যদের ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। এ ছাড়া কিছু চিকিৎসা সরঞ্জামও দরকার। আমার কাছে টাকা থাকলেও খরচ করতে পারছি না পরের অডিটের কথা চিন্তা করে। অধিদপ্তর থেকে যেসব চিঠি দেয় সেগুলোতে আগের বিধি-বিধান মেনে কেনাকাটার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সব কিছুর দাম তো আগের মতো নেই। এখন যদি আমি বেশি টাকা দিয়ে কিছু কিনে ফেলি আর পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ঝামেলায় পড়ে যাই! আমি অধিদপ্তরকে এ বিষয়টি পরিষ্কার করে দিতে বলেছি।’

জনবলের সংকট ওই হাসপাতালে প্রকট। উদাহরণ দিয়ে পরিচালক বলেন, ‘রোগীরা যে এখানে আসবে তাদের শৃঙ্খলা কে রক্ষা করবে? আমার তো ন্যূনতম নিরাপত্তাকর্মীও নেই। কাগজে-কলমে ১৫ জন নিরাপত্তাকর্মী (আনসার) থাকলেও কার্যকরভাবে পাওয়া যায় মাত্র তিনজন। তারা গেট পাহারা দেবে নাকি রোগীর শৃঙ্খলা, দূরত্ব বজায় রাখার দায়িত্ব পালন করবে?’ আরো সমস্যার ফিরিস্তি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের গাড়িচালকদেরও সমস্যা হচ্ছে। যখনই তাদের বাড়িওয়ালা শুনছে এই হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তখন তাকে আর বাসা থেকে বের হতে দিচ্ছে না। আবার একজন গাড়িচালকের জ্বর-কাশি হয়েছে, সেও বাসায় আছে। অ্যাম্বুল্যান্সের জন্য চালক পাওয়া যাচ্ছে না।’

এদিকে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. বেলাল হোসেন এক অফিস আদেশে জানান, সরকারি ছুটির দিনেও করোনাভাইরাস পরীক্ষার সব কেন্দ্র খোলা থাকবে এবং স্বাভাবিকভাবে কাজ চলবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে আর অন্যদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিতে হবে।

এদিকে গতকাল পর্যন্ত ১৬টি কেন্দ্রে নমুনা পরীক্ষা পুরোপুরি চালু হয়েছে। আরো কয়েকটির প্রক্রিয়া চলছে বলে জানানো হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা