kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

করোনার প্রভাব

প্রবীণদের উদ্বেগ কমাতে প্রয়োজন গভীর মমতা

নওশাদ জামিল   

৮ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রবীণদের উদ্বেগ কমাতে প্রয়োজন গভীর মমতা

নাতি-নাতনি ও স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ-আলাপ, সমবয়সীদের সঙ্গে আড্ডা, নিয়মিত প্রার্থনা, শরীরচর্চা, ডাক্তারের কাছে চেকআপ—এভাবেই অবসরজীবন দিব্যি পার করছিলেন রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা ইকরাম হোসেন খান। বেসরকারি এ ব্যাংক কর্মকর্তা অত্যন্ত বিমর্ষ কণ্ঠে মোবাইলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বয়স ৭০ পেরিয়ে গেছে। শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, জোরও কম। করোনাভাইরাস যদি আমাকে আক্রান্ত করে, সহজেই কাবু করবে। অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্ট আছে আমার। করোনা ছাড়াও তো এখন ডাক্তার পাওয়া যায় না। অন্য কোনো সমস্যা হলে এখন চিকিত্সা পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। এসব ভেবে উৎকণ্ঠায় থাকি।’

রাজধানীর মগবাজারের ডাক্তার গলিতে বাস করেন অবসরপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী। স্ত্রী মারা গেছেন গত বছর। তখন থেকে মেয়ের কাছে থাকেন তিনি। মেয়ে, মেয়ের জামাই, দুই নাতি-নাতনি নিয়ে অবসরজীবন ভালোই কাটছিল তাঁর। করোনাভাইরাসের কারণে দুশ্চিন্তায় ভীষণ অবসাদে ভুগছেন তিনি। ভারী কণ্ঠে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘ডায়াবেটিস থাকায় আগে সকাল-সন্ধ্যা হাঁটতে বের হতাম। ভাইরাসের কারণে সেটা এখন বন্ধ। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি সপ্তাহে ক্লাস নিতাম। এখন সেটিও বন্ধ। সারা দিন বাসায় ঘরবন্দি থাকি। কত দিন যে এভাবে চলতে হবে জানি না!’

জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় যাঁরা অবসরজীবন কাটাচ্ছিলেন, সেই প্রবীণদের জীবন এখন করোনা আতঙ্কে বিষাদযুক্ত। প্রাত্যহিক জীবনের ছন্দপতনে এখন পদে পদে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। এমন পরিস্থিতিতে প্রবীণদের প্রতি গভীর মমতা ও ভালোবাসা জানানোর কথা বলেছেন মনোবিদ ও চিকিৎসকরা।

প্রতিদিনই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। আর আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই হার প্রবীণদের মধ্যে বেশি। ফলে অধিকাংশ সময় তাঁরা ঘরেই থাকছেন। মন চাইলেও পারছেন না বাইরে স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। অনেকে নিয়মিত ডাক্তারের চেক আপও করাতে পারছেন না। এ অবস্থায় প্রবীণদের মধ্যে বিমর্ষতা ভর করাই স্বাভাবিক। প্রবীণদের এই বিমর্ষতা কাটাতে প্রয়োজন আন্তরিক সহমর্মিতা। প্রবীণদের প্রতি বাসার সবার গভীর মমতা পারে এই বিমর্ষতা দূর করতে।

বেসরকারি তথ্যানুসারে দেশে ষাটোর্ধ্ব নাগরিকের সংখ্যা দেড় কোটির বেশি। বয়সজনিত কারণে এই প্রবীণদের অধিকাংশ নানা অসুখ-বিসুখে ভুগছেন। ফলে করোনাভাইরাসের কারণে এই প্রবীণরাই রয়েছেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। এ অবস্থায় তাঁদের প্রতি বাড়তি যত্ন ও মমতার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর ইস্কাটনের বাসিন্দা আবদুল আহাদ মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি ছয় বছর আগে। চলমান অবস্থায় এককথায় গভীর উদ্বেগের মধ্যে আছি। সন্তানরা বাইরে যেতে নিষেধ করেছে। সারা দিন ঘরেই থাকছি। হাঁটাহাঁটি ও নামাজের জন্য আগে বের হতাম। এখন আর হই না। সারা দিন বাসায় থেকে হাঁসফাঁস লাগছে।’

প্রবীণদের নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে তাঁদের সন্তান-সন্ততিদেরও। বয়স্ক মা-বাবার অসুস্থতা ও করোনাভাইরাস নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা সৈয়দ মোদাব্বির হোসেন বলেন, ‘মা-বাবা আমাদের সঙ্গেই থাকেন। দুজনেরই বয়স সত্তরোর্ধ্ব। তাদের হাঁটাহাঁটি বাধ্যতামূলক। বাবার হার্টে তিনটা ব্লক, মায়ের কিডনি সমস্যা রয়েছে। প্রতিদিন তাঁরা বাসার বাইরে হাঁটাহাঁটি করতেন। এখন সব বন্ধ। দুজনকে নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই।’

প্রবীণদের ইতিবাচক রাখতে, মনের জোর বাড়াতে তাগিদ দিয়েছেন মনোবিদ ও লেখক আনোয়ারা সৈয়দ হক। প্রবীণদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বয়সে আমিও প্রবীণ। ফলে প্রবীণদের মানসিক অবস্থা বুঝতে পারি। তাঁদের নিত্যনৈমিত্তিক জীবনে যে বিষাদ নেমে এসেছে, সেটা দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে। প্রতিদিন পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। ঘরের মধ্যেই শরীরচর্চা করতে হবে। প্রয়োজনে বাসার ছাদে হাঁটাহাঁটি করতে হবে।’

অবসাদ কাটাতে আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে আনোয়ারা সৈয়দ হক আরো বলেন, ‘প্রবীণরা সারা দিন ঘরে থেকে বিমর্ষ বোধ করছেন। এ সময় ঘরে থেকে ফোনে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। নিয়মিত প্রার্থনা করা, টেলিভিশন দেখা, বই পড়ার আগ্রহ বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, শরীরের জোর কমলেও বাড়াতে হবে মনের জোর।’

মনোচিকিৎসক আহমেদ হেলাল বলেন, ‘সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করতে হবে। রুটিন বিষয়গুলো যেমন—ঘুম, ঠিক সময়ে খাওয়া, বাড়িতে হালকা ব্যায়াম ইত্যাদি বন্ধ করা যাবে না। সুষম আর নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান করাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।’

 

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা