kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদ গ্রেপ্তার হয়ে জেলে

২০ থেকে ২২ বছর কলকাতায় আত্মগোপনে ছিলেন!

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদ গ্রেপ্তার হয়ে জেলে

আবদুল মাজেদ

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমানের খুনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদকে অবশেষে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় ৪৫ বছর আত্মগোপনে ছিলেন আত্মস্বীকৃত এই খুনি। গতকাল মঙ্গলবার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয় পলাতক খুনি আবদুল মাজেদকে গ্রেপ্তার করার বিষয়টি। গতকালই তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল দুপুরে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের নির্দেশে মাজেদকে কারাগারে পাঠানো হয়। দুপুর ১২টার দিকে তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে মুখ্য মহানগর হাকিম জুলফিকার হায়াৎ নিজেই শুনানি গ্রহণ করেন।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গতকাল ভোর পৌনে ৪টার দিকে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের সামনে দিয়ে সন্দেহভাজনভাবে রিকশায় করে যাওয়ার সময় থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় মাজেদকে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি তাঁর পরিচয় দিয়ে স্বীকার করেন, তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য দীর্ঘদিন তিনি ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে ছিলেন বলেও জানান।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জানিয়েছেন, আবদুল মাজেদ সম্পর্কে সব শেষ ভারতে থাকার তথ্য ছিল গোয়েন্দাদের কাছে।

তবে আদালতে হাজির করার পর মাজেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি হেমায়েত উদ্দিন খান হিরণ। তখন মাজেদ বলেন, গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি গত ২০ থেকে ২২ বছর কলকাতায় আত্মগোপনে ছিলেন।

আদালতে দেওয়া ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন যাবৎ পলাতক ছিলেন বঙ্গবন্ধুর এই খুনি। তাঁকে আপাতত ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার না দেখানো পর্যন্ত মাজেদকে কারাগারে আটক রাখার  আরজি জানানো হয়।

দেশে ফেরার বিষয়ে আদালতে আইনজীবীর জিজ্ঞাসাবাদে মাজেদ কিছু না বললেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নভেল করোনাভাইরাসের কারণে ভারত থেকে অনেকেই দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। এ অবস্থায় মাজেদও সেখান থেকে গত ২৬ মার্চ ময়মনসিংহের সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঢুকে থাকতে পারেন।

সূত্র মতে, এর আগে লিবিয়া ও পাকিস্তানে আত্মগোপনে ছিলেন মাজেদ। ১৯৯৫ সালের দিকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যান তিনি। সেখান থেকে পাকিস্তানে, এরপর লিবিয়ায় যান। ২০১৬ সালে আবার ভারতে ফেরেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বললেন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে দণ্ডাদেশ কার্যকর করার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। তাঁদেরই একজন ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদ আমাদের পুলিশের কাছে ধরা পড়েছেন। আমরা কিছুক্ষণ আগে তাঁকে আদালতে সোপর্দ করেছি। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।’ মন্ত্রী বলেন, ‘তাঁর স্ত্রী সালেহা বেগম। বাড়ি নম্বর-১০/এ, রোড নম্বর-১, ক্যান্টনমেন্ট আবাসিক এলাকা। তিনি সেখানে বসবাস করতেন। আমাদের গোয়েন্দাদের কাছে তাঁর সব তথ্য ছিল।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় এই দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদ, নূর ও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন এই তিনজনের অবস্থান ছিল। আরো কয়েকজন ছিলেন। মাজেদ তখন লেফটেন্যান্ট ছিলেন। এই খুনি শুধু বঙ্গবন্ধুর খুনেই অংশগ্রহণ করেননি, তিনি জেলহত্যায়ও অংশ নিয়েছিলেন বলে আমাদের জানা আছে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘খুনের পরই তিনি জিয়াউর রহমানের (প্রয়াত) নির্দেশ মোতাবেক বঙ্গভবনসহ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছেন। আমরা আশা করি, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁর দণ্ডাদেশ কার্যকর করতে পারব। তাঁকে গ্রেপ্তারে যাঁরা সম্পৃক্ত ছিলেন তাঁদের সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে আমি মনে করি, মুজিববর্ষের একটা শ্রেষ্ঠ উপহার আমরা দেশবাসীকে দিতে পেরেছি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর খুনিদের তৎকালীন জিয়াউর রহমানের সরকার বিচারের বদলে নানাভাবে পুরস্কৃত করেছে। তাঁদের যাতে বিচার না হয় সে ব্যবস্থাটি পাকাপোক্ত করেছেন ইনডেমনিটি বিলের মাধ্যমে। এই খুনিকে আমরা দেখেছি সেই সরকারের আশীর্বাদে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরিরত অবস্থায়। বিভিন্ন অবস্থায় তিনি দেশে এবং বিদেশে চাকরিরত অবস্থায় ছিলেন। এরপর আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে ১৯৯৬ সালে, তার আগেই তিনি আত্মগোপন করেন। আমাদের গোয়েন্দা তৎপরতা ছিল তাঁকে ধরার জন্য। গোয়েন্দা বাহিনী এবং যারা তাঁকে গ্রেপ্তারের কাজে ছিল, তারা সবাই ভালো কাজ করেছে বলে আমি মনে করি।’

মন্ত্রী বলেন, ‘অন্য যেসব খুনি যেখানে যেখানে আছেন, তাঁদের ফিরিয়ে নিয়ে আসার সর্বোচ্চ চেষ্টা আমরা করব। মাঝে মাঝে বিস্ময়ে হতবাক হই, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি দেশে না ফিরতেন তাহলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার কোন পর্যায়ে যেত। তিনি দেশে ফিরে এসে দৃঢ়তার সঙ্গে হাল ধরেছিলেন বাংলাদেশের। শুধু বাংলাদেশকেই তিনি পাল্টে দেননি, তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ও জেলহত্যার আসামিদের পর্যায়ক্রমে ধরে নিয়ে আসছেন এবং আনছেন। তাঁদের বিচার  সম্পন্ন হয়েছে। আমরা যে কালিমালিপ্ত ছিলাম, সেটাও মুছে গেছে।’

ফাঁসি কার্যকর হবে যে প্রক্রিয়ায় : দেশের সর্বোচ্চ আদালতে রিভিউ আবেদন ও রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন নিষ্পত্তিসহ সব আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার পাঁচ আসামির। পলাতক আসামি আবদুল মাজেদকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই আসামির ফাঁসি এখনই কার্যকর করা যাবে কি না কিংবা আইনগত কোনো প্রতিকার তিনি পাবেন কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, এ মামলায় বিচারিক সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে গেছে ১০ বছর আগেই। তাই এ পর্যায়ে তাঁর আর স্বাভাবিকভাবে আপিল করার সুযোগ নেই। এ পর্যায়ে শুধু রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করতে পারবেন তিনি। তবে কারা কর্তৃপক্ষ এখন থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে ফাঁসি কার্যকর করার সব প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে পারবে। যদি রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন তবে ওই আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসি কার্যকর করার প্রক্রিয়া বন্ধ থাকবে।

তবে কোনো কোনো আইনজীবী বলছেন, আবদুল মাজেদ শুধু তামাদি আইনের ৫ নম্বর ধারানুযায়ী কারাগার থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে একটি আবেদন (জেল আবেদন) করার সুযোগ পাবেন। আদালত তাঁর এই আবেদন গ্রহণ করলেই শুধু হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল আবেদন করার সুযোগ পাবেন। অন্যথায় সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করা ছাড়া আইনগত আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।

ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় আইনগত সকল প্রক্রিয়া অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় এই আসামি গ্রেপ্তার হলেন। এখন এই আসামির কোনো আইনগত প্রতিকার পাওয়ার পথ কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমি মনে করি, এই আসামি কারাগার থেকে আপিল বিভাগের কাছে জেল আবেদন করতে পারবেন। এই আবেদনে তাঁকে বলতে হবে, ঠিক কী কারণে তিনি এত দিন বিচারিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেননি। যুক্তিসংগত কারণ দেখাতে না পারলে তাঁর রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা থাকবে না।’

তবে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, তামাদি আইনে আবেদন করতে হলে যথাযথ ও যুক্তিসংগত কারণ দেখাতে হয়। সেই যুক্তিসংগত কারণ দেখানোর কোনো সুযোগ নেই এই আসামির। তাই এখন তাঁর রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আর রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করলেই যে সেটা গ্রহণ করা হবে তারও কোনো কারণ নেই। কারণ জাতির জনকের হত্যাকারীকে অনুকম্পা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী যা হওয়ার তাই হবে। আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, এই আসামি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। সুতরাং সাধারণ কোনো হত্যা মামলা এটা নয়। তাঁর পক্ষে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি তাঁর আইনজীবী নই। তার পরও বলব, একজন ব্যক্তিকে ফাঁসি দিতে হলে আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। আইন অনুযায়ী বিলম্ব মাফ করে আপিল করার অনুমতি চেয়ে একটি আবেদন দেওয়ার সুযোগ আছে এ আসামির। আপিল বিভাগ তা গ্রহণ করবে কি করবে না সেটা আদালতের বিষয়। আদালত আবেদন গ্রহণ না করলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করার সুযোগ পাবেন। এরপর ফাঁসি কার্যকরের প্রশ্ন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা