kalerkantho

বুধবার । ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩ জুন ২০২০। ১০ শাওয়াল ১৪৪১

নারায়ণগঞ্জ রাজশাহীতে পূর্ণ ‘লকডাউন’

গাইবান্ধা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’, আংশিক লকডাউন আরো কয়েক জেলায়

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৭ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নারায়ণগঞ্জ রাজশাহীতে পূর্ণ ‘লকডাউন’

ঢাকার প্রবেশমুখে সেনাবাহিনী ও পুলিশের অবস্থান। নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কাউকে ঢুকতে কিংবা বেরোতে দেওয়া হচ্ছে না। ছবি : কালের কণ্ঠ

নভেল করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে নারায়ণগঞ্জ সিটি, উপজেলা সদর, ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করা হয়েছে। ওই সব এলাকার কোনো বাসিন্দা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বেরোতে পারবে না। গত রবিবার রাতে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে এক জরুরি সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহীসহ আরো কয়েকটি এলাকায়। ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে গাইবান্ধাকে। কালের কণ্ঠ’র আঞ্চলিক অফিস, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের খবর—

নারায়ণগঞ্জ : জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন গণমাধ্যমে জানান, সিটি ও সদর উপজেলা এলাকার কোনো বাসিন্দা অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের হতে পারবে না; বাইরে থেকেও কেউ ঢুকতে পারবে না। রিকশা ছাড়া সব যানবাহন বন্ধ থাকবে। খাবার বহনকারী গাড়ি ও অ্যাম্বুল্যান্স চলাচল করতে পারবে। এ ছাড়া যেসব পোশাক কারখানা খুলেছে, শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের পর সেগুলোও বন্ধ করে দিতে মালিকদের আহ্বান জানানো হয়েছে।

পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম জানান, আইইডিসিআরের পরামর্শে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সভায় অন্যদের মধ্যে মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী, জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ইমতিয়াজ, সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোত্তাকিম, র‌্যাব-১১ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইমরান উল্লাহ সরকার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সেলিম রেজা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

নারায়ণগঞ্জে গতকাল পর্যন্ত করোনাভাইরাসে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা ২০ ছাড়িয়েছে। গতকাল সোমবার এক ভিডিও বার্তায় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আগেই এটাকে রোধ করতে হবে। তাই আমি প্রশাসনকে অনুরোধ করব, যত দ্রুত সম্ভব পুরো নারায়ণগঞ্জকে লকডাউনের আওতায় আনুন। সেই সঙ্গে প্রশাসনকে আহ্বান জানাব, লকডাউন মানে লকডাউন; এর কোনো ব্যত্যয় ঘটতে দেওয়া যাবে না।’

এর আগে করোনা নিয়ন্ত্রণে পুরো এলাকা লকডাউন করতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর অনুরোধ জানান নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী।

রাজশাহী : রাজশাহী শহরসহ গোটা জেলা লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে এক সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া শহরের বাইরে থেকে কোনো যানবাহন ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না শহরে। আবার শহর থেকে বেরোতেও দেওয়া হচ্ছে না। সেনাবাহিনী ও পুলিশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে। শহরে বাইরের কোনো যানবাহন ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না গতকাল সকাল থেকেই। আবার সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে সব ধরনের যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এমনকি দোকানপাটও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওষুধের দোকান ছাড়া কোনো দোকানপাট খোলা রাখা যাবে না বলেও মাইকিং করে দেওয়া হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।

গাইবান্ধা : গুচ্ছ সংক্রমণের কারণে দেশের কয়েকটি এলাকার মতো গাইবান্ধাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণার পর জেলায় উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জেলা সদর, সাদুল্যাপুর,  সুন্দরগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জের নাকাইহাট এলাকায় মানুষ নানাভাবে পরিস্থিতি জানতে সরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও সংবাদকর্মীদের কাছে খোঁজখবর নিচ্ছে। প্রশাসনিকভাবেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করা হয়েছে।  আমেরিকাপ্রবাসী মা ও তাঁর ছেলে গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলায়  এক আত্মীয়র বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়াসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে  ঘুরে বেড়ানোর পর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। পরে তাঁদের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হলে সেখানেও পজেটিভ ফলাফল আসে। তাঁরা গাইবান্ধা শহরের একটি পাড়ায় হোম কোয়ারেন্টিনে থাকলেও পরে বিভিন্ন এলাকায় তাঁদের সংস্পর্শে আসা আরো তিনজন  সংক্রমিত হন।

সিলেট : সিলেট নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকা লকডাউন করা হয়েছে। গত রবিবার ওই এলাকার বাসিন্দা এক চিকিৎসক করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথমে ওই বাসা এবং পরে রাতেই হাউজিং এস্টেট এলাকা লকডাউন করা হয়।

এদিকে ওই চিকিৎসককে বর্তমানে বাসায় কোয়ারেন্টিনে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।

জামালপুর : মেলান্দহ উপজেলায় এক যুবক করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। ওই যুবকের এলাকা উপজেলার ঘোষেরপাড়া ইউনিয়ন এবং তাঁর সংস্পর্শে আসা পাশের ইউনিয়নের আরো ৩০টি বাড়ি লকডাউন ঘোষণা করেছে উপজেলা প্রশাসন। বকশীগঞ্জ উপজেলায়ও মাঝপাড়া গ্রামের ১০টি বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ওই যুবককে গত রবিবার গভীর রাতে জামালপুর সদর হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন সেন্টারে ভর্তি করেছে। অন্যদিকে লকডাউন করায় ঘোষেরপাড়া ইউনিয়নের মানুষের জীবনযাত্রা একেবারেই থমকে গেছে।

চট্টগ্রাম : সেখানে গতকাল রাত ১০টা থেকে ঢোকা ও বেরোনো বন্ধ করা হয়েছে। এর আগে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব ধরনের দোকান-মার্কেট বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এ লক্ষ্যে নগরের প্রবেশমুখে তল্লাশি চৌকি বসিয়েছে পুলিশ।

একইভাবে গতকাল সন্ধ্যা ৭টা থেকে নগরের ওষুধের দোকান ছাড়া অন্য সব ধরনের দোকান-মার্কেট বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল আগেই। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টায় নগরের সব ধরনের দোকান বন্ধ হয়েছে। এখন নতুন করে আরেকটি নির্দেশনা দেওয়া হলো নগর পুলিশের পক্ষ থেকে।

এ বিষয়ে নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (জনসংযোগ) মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক কালের কণ্ঠকে বলেন, সোমবার রাত ১০টা থেকে জরুরি সেবা, চিকিৎসা, ভোগ্যপণ্য এবং রপ্তানিকাজে নিয়োজিত যান এবং লোকজন ছাড়া অন্য সব ধরনের যানবাহন এবং লোকজনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। একইভাবে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত নগরে ঢোকা ও বেরোনো বন্ধ থাকবে। এ নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কমলগঞ্জ : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পতনউষারে চারটি বাড়ি লকডাউন করেছে প্রশাসন। পার্শ্ববর্তী রাজনগর উপজেলায় করোনায় মৃত ব্যক্তির পার্শ্ববর্তী গ্রাম গোপালনগর থেকে এক ব্যক্তি কমলগঞ্জের পতনউষারে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ায় এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। গতকাল বিকেল ৩টায় উত্তর পতনউষার মফিজ মিয়ার বাড়িসহ চারটি বাড়ি লকডাউন করে লাল পতাকা টাঙিয়ে দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশেকুল হক।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশেকুল হক বলেন, রাজনগরের টেংরা ইউনিয়নটি লকডাউন করা হয়েছে। মৃত ওই ব্যক্তির পাশের গ্রাম গোপালনগর থেকে এক ব্যক্তি পতনউষারে শ্বশুরবাড়ি আসায় চারটি বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে, যাতে অন্য মানুষের সংস্পর্শে বাড়ির লোকজন না যায়। পাঁচটি পরিবারকে স্থানীয় চেয়ারম্যান খাদ্যসামগ্রী বাড়িতে পৌঁছে দেবেন।

মুন্সীগঞ্জ : টঙ্গিবাড়ী ও গজারিয়া উপজেলার সাতটি বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে যাওয়ার কারণে বাড়িগুলো লকডাউন করা হয়। গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান সাদী জানান, এক পুলিশ সদস্য নারায়ণগঞ্জ থেকে ভবেরচর এলাকায় তাঁর শ্বশুরালয়ে এসে অবস্থান নিয়েছেন। এই ব্যক্তি সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে ছিলেন। তাই ওই বাড়িটি প্রশাসন পুরোপুরি লকডাউন করেছে।

কেরানীগঞ্জ : কেরানীগঞ্জের জিনজিরা, গোলজারবাগ, জিনজিরাবাগ ও শুভাঢ্যার চুনকুটিয়া এলাকায় আরো তিন ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মীর মোবারক হোসাইন। এদিকে গতকাল বিকালে আক্রান্ত ব্যক্তিদের তিনটি বাড়িসহ আশপাশের ৩০টি বাড়ি লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা