kalerkantho

বুধবার । ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩ জুন ২০২০। ১০ শাওয়াল ১৪৪১

উৎকণ্ঠায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা

নওশাদ জামিল   

৭ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উৎকণ্ঠায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা

জীবন-জীবিকার তাগিদে প্রবাসে বাস করেন অসংখ্য বাংলাদেশি। বৈশ্বিক করোনাভাইরাস মহামারিতে প্রতিদিনই প্রবাসী বাংলাদেশিদের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। গত রবিবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৬৪ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর জানা গেছে বেসরকারি সূত্রে। সেখানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন আরো অনেক বাংলাদেশি। আক্রান্ত বাংলাদেশির সংখ্যা কয়েক শ। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাসে এ পর্যন্ত ২৭ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সরকারিভাবে সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পৃথিবীর ১০টি দেশে এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে শতাধিক বাংলাদেশি মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন হাজারের বেশি। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায় দিন পার করছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

কয়েকজন প্রবাসীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, তাঁরা সবাই গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, কেউ জানে না। জন্মভূমির মানুষের জন্যও তাঁরা উত্কণ্ঠিত।

বেসরকারি হিসাবে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৬৪ জন বাংলারদেশি। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যে ২৭ জন, ইতালি ও সৌদি আরবে তিনজন করে, কাতারে দুজন, কানাডা, স্পেন, সুইডেন, লিবিয়া ও গাম্বিয়ায় একজন করে বাংলাদেশি মারা গেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে ইতালিতে বাস করছেন কবি মজনু শাহ্। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি যে শহরে থাকি, তার নাম ব্রেসা। এ শহরে বর্তমানে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা চলছে পাশের শহর বেরগামোতে। বাচ্চারা দেড় মাস ধরে টানা বাসায়। বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। আমাদের কারখানা বন্ধ থাকার পর খুলেছে। আমি মেডিক্যাল লিভ নিয়ে বাসায়। ইতালির অবস্থা কবে স্বাভাবিক হবে, কেউ তা জানে না।’

ফ্রান্সে বাস করেন কবি ও আবৃত্তিশিল্পী রবিশঙ্কর মৈত্রী। করোনা পরিস্থিতিতে নিজের ও ফ্রান্সের অবস্থা সম্পর্কে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাড়ে পাঁচ বছর হলো আমি ফ্রান্সপ্রবাসী। সপরিবারে আলেস শহরে থাকি। ফ্রান্সে করোনা মহামারি আকার নেবে, এ বিষয়ে গণমাধ্যমে আশঙ্কা করা হয়েছিল। কিন্তু সরকার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে। ফলে এখন তা বিশাল মারণব্যধিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই ফ্রান্সে আক্রান্ত ও মৃত্যের সংখ্যা বাড়ছে। গত ১৬ মার্চ থেকে গোটা ফ্রান্সে চলছে লকডাউন। অসংখ্য বাংলাদেশি আছেন এ দেশে। প্রত্যেকে আছেন শঙ্কা ও সতর্ক অবস্থায়।’

জার্মানির বন শহরে ১০ বছর ধরে বাস করছেন সাংবাদিক-গবেষক মারুফ মল্লিক। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুরো জার্মানিতে অচলাবস্থা বিদ্যমান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, বিপণিবিতান সবই বন্ধ। শুধু ওষুধ ও খাবারের দোকানগুলো খোলা। বন শহরে ১০ বছর ধরে আছি। এই শহরের জল-হাওয়া অনেকটাই পরিচিত। কিন্তু হুট করে যেন শহরটা অচেনা হয়ে গেল! চারদিকে সুনসান নীরবতা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো জার্মানিও করোনার বিরুদ্ধে লড়ছে। প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এখানে বাংলাদেশিরা সবাই কমবেশি ঘরেই অবস্থান করছেন। এ পর্যন্ত জার্মানিতে ১০ বাংলাদেশির আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ দিয়েছে বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাস।’

কানাডায় দীর্ঘদিন সপরিবারে বাস করছেন কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। গত রবিবার করোনায় আক্রান্ত হয়ে এক বাংলাদেশির মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টরন্টোর বাঙালিপাড়া বলে খ্যাত ড্যানফোর্থের মেসি স্কয়ারে স্ত্রী আর দুই মেয়েসহ থাকি। একটি আমেরিকান-কানাডিয়ান কম্পানিতে কাজ করি। এ প্রতিষ্ঠানে একজন করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি ১৪ দিনের জন্য লকডাউন। লকডাউন পুরো অন্টারিও প্রদেশ। পাশের প্রদেশ কুইবেকেও যাওয়া নিষিদ্ধ। বর্তমানে কুইবেকের অবস্থা জটিল। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে। এখানে মার্চের মাঝামাঝি থেকে পার্লামেন্ট, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব কিছু বন্ধ। কানাডায় আক্রান্তের সংখ্যা ১৩ হাজার ৮৭২ আর মারা গেছেন ২২৮ জন। এ সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, কেউ জানে না।’

দীর্ঘদিন ধরে ইংল্যান্ডে বাস করছেন সাংবাদিক তানভীর আহমেদ। সেখানকার পরিস্থিতি জানিয়ে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইংল্যান্ডে যেভাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে, আমরা আসলেই জানি না, কবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব। আমি বাড়িতে বসে কাজ করছি। আমার স্ত্রী ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে কাজ করে। ফলে তাকে প্রতিদিন কাজে যেতে হয়। নিজের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে মানুষের জীবন বাঁচাতে তাকে প্রতিদিন ছুটতে হচ্ছে। এখানে এ পর্যন্ত ২৭ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর আমরা জেনেছি। আর শতাধিক বাংলাদেশি বাড়ি এবং হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়ে সরকারি সহায়তার জন্য অপেক্ষা করছেন।’

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির বাস। তাদেরই একজন হলেন শামসুজ্জোহা ডন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে নিউ ইয়র্কের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসে ৬৪ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। আক্রান্ত কয়েক শ। পরিস্থিতি কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠেছে আমেরিকায়। আমি হোম কোয়ারেন্টিনে আছি প্রায় তিন সপ্তাহ। সরকারি নির্দেশ মেনে চলছি। প্রায় রাতে ঘুম ভেঙে যায় অ্যাম্বুল্যান্সের শব্দে। মনে অজানা এক উত্কণ্ঠা কাজ করে সব সময়।’

স্পেনে বাস করেন সাংবাদিক নুরুল ওয়াহিদ। সেখানকার পরিস্থিতি জানিয়ে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্পেনে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। এ পর্যন্ত একজন বাংলাদেশি করোনাভাইরাসে মারা গেছেন। আক্রান্তের সংখ্যা শতাধিক। প্রতিদিন বাড়ছে এ সংখ্যা। সঙ্গে উত্কণ্ঠাও। অনেকের বাসায় খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। খাবার কিনতে ঘর থেকে বাইরে যেতে সাহস করছেন না অনেকে। অবস্থা কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, জানি না।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা