kalerkantho

বুধবার । ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩ জুন ২০২০। ১০ শাওয়াল ১৪৪১

ভারতে এক দিনে সংক্রমণে রেকর্ড

► দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সর্বোচ্চ প্রাণহানি ইন্দোনেশিয়ায়
► যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্ত তিন লাখ ছাড়াল
► ইতালির পরিস্থিতি উন্নতির আভাস

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৫ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভারতে এক দিনে সংক্রমণে রেকর্ড

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের গতি বাড়ছে। ভারতে ২৪ ঘণ্টায় ৬০১ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এক দিনের হিসাবে দেশটিতে এটি সর্বোচ্চ সংক্রমিত সংখ্যা। সব মিলিয়ে গত রাতে প্রতিবেশী দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সেখানকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশে গতকাল নতুন করে ৯ জনের শরীরে মিলেছে করোনা, মারা গেছে আরো দুজন। আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানে আক্রান্তের সংখ্যা দুই হাজার ৭০০ পেরিয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেশটির পাঞ্জাব প্রদেশে। মোট আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশই সেখানকার বাসিন্দা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের হিসাবে গত রাতে  উত্তর কোরিয়া বাদে এ অঞ্চলের বাকি ১০ দেশে মোট সাত হাজার ৫১১ জনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে করোনা শনাক্ত হয়েছে ভারতে ৩০৭২, ইন্দোনেশিয়ায় ২০৯২, থাইল্যান্ডে ২০৬৭, শ্রীলঙ্কায় ১৫৯, বাংলাদেশে ৭০, মিয়ানমারে ২০, মালদ্বীপে ১৯, নেপালে ছয়, ভুটানে পাঁচ ও পূর্ব তিমুরে একজন। এখন পর্যন্ত এ অঞ্চলে মারা গেছে ৩০০ জন। অর্থাৎ মৃত্যুর হার ৩.৯৯ শতাংশ। এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ইন্দোনেশিয়ায় ১৯১ জন। আর এখন পর্যন্ত মৃত্যুশূন্য আছে মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান ও পূর্ব তিমুর।

ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত শুক্রবার সকালে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৩০১। গতকাল বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ ২৪ ঘণ্টায় এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৯০২। এক সপ্তাহ আগে ২৯ মার্চ এ সংখ্যা ছিল ৯০২। এর পর থেকেই আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

করোনা সংক্রমণ এড়াতে বর্তমানে ভারতজুড়ে ২১ দিনের লকডাউন চলছে। আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে এ অবস্থা। এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে দেশটির সরকার। তবে আশার কথা হলো, আক্রান্তের সংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠার সংখ্যাও বাড়ছে। বর্তমানে সেই সংখ্যা ২১২।

আক্রান্তের সংখ্যায় ভারতে শীর্ষস্থানে রয়েছে মহারাষ্ট্র। সেখানে আক্রান্ত হয়েছে ৪৯০ জন। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১৫৫ জন। মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের। দিল্লিতে এক লাফে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৪৫ জন। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ২২৬ জন। মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের। আক্রান্তের সংখ্যার নিরিখে তৃতীয় স্থানে রয়েছে তামিলনাড়ু। সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ৪১১। সেখানে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১০২ জন। আক্রান্তের সংখ্যায় এর পরে রয়েছে কেরালা (২৯৫), রাজস্থান (২০০), উত্তর প্রদেশ (১৭৪), অন্ধ্র প্রদেশ (১৬১) ও তেলেঙ্গানা (১৫৯)। আর পশ্চিমবঙ্গে এ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬৯। মৃতের সংখ্যা তিন। রাজ্য সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসাধীন আক্রান্তের সংখ্যা ৪৯।

অন্যদিকে ভারতের প্রতিবেশী পাকিস্তানে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির হিসাব অনুযায়ী, গতকাল পাকিস্তানে ভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা ২৭০৮-এ পৌঁছেছে। এর মধ্যে ১০৭২ জনই পাঞ্জাব প্রদেশের।

দেশটির ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের প্রতিবেদন বলছে, পাঞ্জাবের পরই দুরবস্থা সিন্ধু প্রদেশের। সেখানে কভিড-১৯ পজিটিভ ৮৩৯ জন। খাইবার-পাখতুনখোয়াতে সংক্রমিত ৩৪৩, বেলুচিস্তানে ১৭৫, গিলগিট-বালটিস্তানে ১৯৩, ইসলামাবাদে ৭৫ এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরে ১১ জন।

বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আব্দুল সাত্তার জানিয়েছেন, পাকিস্তানে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বন্ধ আছে। রেল যোগাযোগও বন্ধ। তবে রাস্তাঘাট, দোকান-বাজারে লোকজন অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সামাজিক মেলামেশাও বন্ধ হয়নি। ফলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে দেশের নানা প্রান্তে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় করোনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির দেশে পরিণত হয়েছে ইন্দোনেশিয়া। দেশটিতে প্রথমবারের মতো করোনা শনাক্ত হয় গত ২ মার্চ। এক মাসের মাথায় গতকাল সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ২০৯২ জনে। এর মধ্যে মারা গেছে ১৯১ জন। গত শুক্রবার করোনায় ইন্দোনেশিয়ায় মৃত্যুহার ছিল ৯.১ শতাংশ, একই সময়ে বৈশ্বিক মৃত্যুহার ছিল ৫.২ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার পাদজাদজারান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিনের ফ্যাকাল্টি মেম্বার পানজি ফরচুনা হাদিসোয়েমাত্রো বলেন, ‘করোনাভাইরাসের বিস্তার নিয়ে সরকার কয়েক কদম পিছিয়ে আছে দেখতে পাচ্ছি। ল্যাবরেটরি ও পরীক্ষার যন্ত্রপাতির ব্যবস্থায় বিলম্ব এবং কমসংখ্যক পরীক্ষা করা হয়েছে।’ করোনা সংক্রমণের পর চীন থেকে প্রায় পাঁচ লাখ কিট সংগ্রহ করে ইন্দোনেশিয়া। অনলাইন সংবাদমাধ্যম কাটাডাটাডটকমের হিসাব অনুযায়ী, ২ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতি দশ লাখের মধ্যে মাত্র ২৫ জনের করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হয়েছে। এশিয়ার মধ্যে এই হার সর্বনিম্ন।

বৈশ্বিক পরিস্থিতি : বৈশ্বিক পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত বিশ্বের ২০৫টি দেশ ও অঞ্চল কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৭২ হাজার ৮৮৯ জনে। মোট মৃত্যু হয়েছে ৬২ হাজার ৮৮৯ জনের। সুস্থ হয়েছে দুই লাখ ৪২ হাজার ১০০ জন। ফলে সব শেষ কভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আট লাখ ৬৭ হাজার ৯৬০। এদের মধ্যে সোয়া আট লাখ বা ৯৫ শতাংশ রোগীর শারীরিক অবস্থা গুরুতর নয়। বাকি ৪০ হাজার মানুষের শারীরিক অবস্থা সংকটজনক। অর্থাৎ সর্বোচ্চ প্রাণঝুঁকিতে আছে এই ৫ শতাংশ রোগী।

যুক্তরাষ্ট্রে ২৪ ঘণ্টায় ১,৪৮০ জনের মৃত্যু : নভেল করোনাভাইরাসে ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় দেড় হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। এক দিনের হিসাবে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণহানি। জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টা থেকে শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে এক হাজার ৪৮০ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। গত রাতে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়েছে। একই সময়ে মৃতের সংখ্যা আট হাজার পেরিয়েছে। এদিকে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে গবেষণায় এমন তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তার জনগণকে ঘরের বাইরে মাস্ক পরার পরামর্শ দিয়েছে।

ফ্রান্সে আরো ৫৮৮ জনের মৃত্যু : ফ্রান্সের বিভিন্ন হাসপাতালে শুক্রবার করোনাভাইরাসে আরো ৫৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ মহামারি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে দেশটিতে ২৪ ঘণ্টায় এটি সর্বোচ্চসংখ্যক মৃত্যুর ঘটনা। দেশটির শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জারোমি সালোমন বলেন, এ নিয়ে দেশটির হাসপাতালে কভিড-১৯ ভাইরাসে মারা যাওয়া লোকের সংখ্যা বেড়ে মোট পাঁচ হাজার ৯১ জনে দাঁড়াল। এ ছাড়া বৃদ্ধানিবাসে মোট এক হাজার ৪১৬ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে ফ্রান্সে করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে মোট ছয় হাজার ৫০৭ জনে দাঁড়িয়েছে।

এ বৈশ্বিক মহামারি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধে ফ্রান্স গত ১৭ মার্চ থেকে দেশে অবরুদ্ধ অবস্থা ঘোষণা করে। এ পরিস্থিতিতে শুধু জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে ঘরের বাইরে বের হওয়া ব্যক্তিকে উপযুক্ত প্রমাণ সঙ্গে রাখতে হবে।

ইতালির পরিস্থিতি উন্নতির আভাস : ইতালিতে করোনাভাইরাসে গতকাল শনিবার নতুন করে ৬৮১ জনের মৃত্যু হওয়ায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৩৬২ জন। কভিড-১৯ মহামারিতে ভয়ংকর ক্ষতিগ্রস্ত দেশটিতে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও এ মহামারি কাটিয়ে ওঠার ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বেসরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থার নতুন পরিসংখ্যানে দৈনিক নিবন্ধিত আক্রান্তদের সংখ্যা ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় যারা পুরোপুরি সুস্থ হয়েছে তাদের হার ১৭.৩ শতাংশ বেড়ে ১৯ হাজার ৭৫৮ জনে দাঁড়িয়েছে। ইতালির সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকার পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে এমন আভাস মিলেছে। ইতালির উত্তরের লোমবারডিতে আক্রান্তদের সংখ্যা কমছে। সেখানে প্রধান হাসপাতাল কর্মকর্তা গিউলি গ্যাললেরা বলেছেন, আক্রান্তদের সংখ্যা কমছে। আমাদের হাসপাতালগুলোতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসছে।

সূত্র : এএফপি, আনন্দবাজার, দ্য ওয়াল।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা