kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

‘চাকরি বাঁচাতে’ কর্মস্থলমুখী ঢল পোশাককর্মীর

ভিড় ঠাসাঠাসিতে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির শঙ্কা

এম সায়েম টিপু   

৫ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘চাকরি বাঁচাতে’ কর্মস্থলমুখী ঢল পোশাককর্মীর

গার্মেন্ট খুলছে—এমন খবরে সারা দেশ থেকেই কর্মীরা ঢাকায় আসার চেষ্টা করছেন। হুড়াহুড়ি আর জটলা করে চরম ঝুঁকির মধ্যেই তাঁরা রাজধানীর উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। গতকাল মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ঘাট থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সাধারণ ছুটি অব্যাহত ও গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও করোনাভাইরাস আতঙ্কের মধ্যেই আজ রবিবার পোশাক কারখানাগুলো খুলছে। সে কারণে গতকাল শনিবার শত ভোগান্তি সঙ্গী করেই পোশাক শ্রমিকদের অনেকেই কর্ম এলাকায় ফিরেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ বিভিন্ন মহাসড়ক ও সড়কে মানুষকে দলে দলে পায়ে হেঁটে আসতে দেখা গেছে। দক্ষিণাঞ্চল থেকে ঢাকামুখী ফেরিঘাটে পোশাক শ্রমিকসহ মানুষের প্রচুর ভিড় দেখা গেছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবেলায় যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল তা প্রতিপালিত হয়নি।

কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পোশাক কারখানার মালিকরা তাদের চাকরিচ্যুত করা এবং বেতন কাটার ভয় দেখিয়ে কর্মস্থলে ফিরতে বাধ্য করছেন।

মহামারি করোনা রোধে বিশ্বব্যাপী ‘সামাজিক দূরত্ব’ মেনে চলার কর্মসূচি চলছে। বাংলাদেশেও সরকার সংক্রমণের ঢেউ সামলাতে সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহনসহ সব বন্ধ করে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে দুই দফায়। সে অনুযায়ী জরুরি সেবা ছাড়া অন্য সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। অবশ্য বাসায় থেকে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা কাজ করছেন, কিন্তু পোশাক কারখানা বন্ধ করার বিষয়টি সরকার বা মালিকদের কেউ বলেনি। সরকারের তরফ থেকে এবং পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠনগুলো বলে আসছে, যাদের কাজ আছে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করাতে পারবে তারা কারখানা খোলা রাখতে বলেছে। কিন্তু অনেক কারখানাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল প্রথম দফার সাধারণ ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে। সে অনুযায়ী, আজ রবিবার তাদের কারখানা খোলার কথা। সরকার এর মধ্যে দ্বিতীয় দফায় আরো সাত দিন ছুটি বাড়ালেও পোশাক কারখানার মালিকরা সেটা গ্রাহ্য না করে শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বলেছেন।

তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারদের সমিতির (বিজিএমইএ) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ফয়সাল সামাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা কারখানা বন্ধ করতে বলিনি। শ্রমিকের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ কারখানা বন্ধ করা হয়। তবে ওই সব কারখানার কত শতাংশ খুলবে এটা এখনই বলা যাচ্ছে না। কাজ না থাকলে শ্রম আইন অনুসারে মালিকরা চাকরিচ্যুত করতে পারে। তবে কলকারখানা অধিদপ্তরের ও বিজিএমইএ পরামর্শ দিয়েছে, এ দুর্যোগকালে যেন কাউকে চাকরিচ্যুত না করা হয়।’

বিজিএমইএ ও পোশাক খাতের অন্য সংগঠন বিকেএমইএর তালিকাভুক্ত ৪০ হাজার কারখানা রয়েছে, যেখানে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করে। ইতিমধ্যে সরকার রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।  

সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শ্রমিকদের নিয়ে উদ্যোক্তারা তামাশা করছেন। করোনার সংক্রমণ যখন বাড়ছে, তখন তাদের জোর করে কারখানায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।’

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, ‘চাকরি হারানোর ভয়ে ও মজুরি কর্তনের আতঙ্কে শ্রমিকরা পাঁয়ে হেটে শুক্রবার থেকে রাজধানীতে ফিরতে শুরু করেছে। সারা দেশ বন্ধ থাকলেও অসাধু মালিকরা শ্রমিকদের ঠকানোর জন্য এমন উদ্যোগ নিয়েছে।’

জানা গেছে, কারখানায় নিরাপত্তার কথা বলা হলেও কোনো কোনো কারখানার মালিক শ্রমিকদের হাত ধোয়ার জন্য সাবান পর্যন্ত দিতে চান না। এমনকি সাবান চাওয়ায় অনেক শ্রমিককে কারখানা থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন।

সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, বিজিএমইএ সভাপতি এই সংকটে কোনো শ্রমিক চাকরি হারাবে না—এমন নিশ্চয়তা দিলেও আশুলিয়ায় আইডিএস গ্রুপের একটি কারখানায় ১৮৪ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে।

কলকারখানা প্রতিষ্ঠান ও পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক শিবনাথ রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেসব কারখানা ব্যক্তিগত সুরক্ষার সরঞ্জাম (পিপিই), টুপি ও মাস্ক তৈরি করে এমন কারখানাগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা রাখার জন্য সরকারের নির্দেশনা রয়েছে। কোনো কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না—এমন অভিযোগ আমরা পাইনি। এমনকি আমাদের পরিদর্শকরা দেখেননি। তবে কোনো কোনো ছোট কারখানায় প্রাপ্যতার অভাবে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিলেও দিতে পারে। এর পরও আমরা অভিযোগ পেলে এসব কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’

শিবনাথ রায় জানান, ৩০ মার্চ পর্যন্ত রপ্তানি খাতের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর মধ্যে এক হাজার ৯০০ কারখানা বন্ধ ছিল। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্য মতে, মোট কারখানার সংখ্যা চার হাজার।

গাজীপুরের মাওনার এক পোশাক শ্রমিক জানান, তাঁর বাড়ি টাঙ্গাইলের নান্দাইলে। মাওনার খান টেক্সে কাজ করেন। এই কারখানায় প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কাজ করছে। বেশির ভাগ শ্রমিক বাড়ি গেছে। যারা এখন বাড়ি থেকে ফিরছে তাদের অনেক কষ্ট করে ফিরতে হচ্ছে।

পোশাক শ্রমিকরা গত শুক্রবার থেকে রাজধানী ও আশপাশের কর্ম এলাকায় ফিরতে শুরু করে। গতকাল বলতে গেলে তাদের ঢল নামে। ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন মহাসড়কে তাই ছোট যানের ভিড় ছিল।

রাজবাড়ী থেকে সাভার আসেন রিতা আক্তার। তিনি জানান, ভোর ৫টায় রাজবাড়ী সদর থেকে রওনা দিয়ে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত আসেন বিকেল ৩টায়। গাড়ি পাল্টাতে হয়েছে ছয়বার। এই প্রতিবেদকের সামনেই তিনি মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি ট্রাকে ওঠেন।

মানিকগঞ্জের আব্দুল সালাম কালের কণ্ঠকে জানান, গার্েমন্ট খোলা থাকায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় ফিরছেন। চাকরি চলে গেলে পরিবারকে নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে, তাই যাচ্ছেন।

মো. ফারুক নামের আরেকজন বলেন, ‘আমরা কি মানুষ হলাম ভাই! একদিকে গণপরিবহন বন্ধ করে রাখা হয়েছে, আবার আমাদের কারখানাও খোলা থাকবে। তাহলে আমরা কিভাবে পৌঁছাব? আমাদের অফিসও বন্ধ রাখতে পারত। তাহলে এ দুর্ভোগে পড়তে হতো না।’

ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের লৌহজং এলাকার মেদিনীমণ্ডলে সেনাবাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে অনেক গাড়িকে লৌহজং-টঙ্গিবাড়ী-মুন্সীগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকায় আসতে দেখা গেছে। পুলিশ বা ট্রাফিকের কোনো প্রকার বাধা ছাড়া এসব যানবাহনে ঠাসাঠাসি করে যাত্রীরা ঢাকায় আসে।

ট্রাক, খোলা পিকআপ, পিকআপ ভ্যান ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় গাদাগাদি করে ময়মনসিংহের ভালুকা হয়ে গাজীপুর ও ঢাকায় ফেরে পোশাক শ্রমিকরা। মোটরসাইকেলে চেপে এসেছে অনেকেই। গাড়ি পাওয়ার জন্য অনেকে মাইলের পর মাইল হেঁটেছে।

নান্দাইল থেকে আসা একজন শ্রমিক জানান, তিনি গাজীপুর চৌরাস্তায় একটি প্যাকেজিং কারখানায় কাজ করেন। আজ (রবিবার) থেকে তাঁর কারখানা খোলা। মালিকের পক্ষ থেকে কারখানার একজন নিরাপত্তাকর্মী ফোন করে তাঁকে কাজে যোগ দিতে বলেছেন। কাজে না গেলে চাকরিটা চলে যেতে পারে। এই ভয়ে তিনি কাজে যোগ দেবেন।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার, সাধারণ সম্পাদক জুলহাস নাইন বাবু ও সাংগঠনিক সাম্পদক আমিনুল ইসলাম শামা যৌথ বিবৃতিতে বলেন, চাকরি রক্ষায় শ্রমিকরা পরিবহন না পেয়ে বহু কিলোমিটার হেঁটে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জে আসে। কোথাও কোথাও বাড়িওয়ালা করোনা আতঙ্কে শ্রমিকদের ঘরে ঢুকতে দিচ্ছে না।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা