kalerkantho

বুধবার । ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩ জুন ২০২০। ১০ শাওয়াল ১৪৪১

করোনা মোকাবেলা

স্বল্প সুদে ঋণ নিচ্ছে সরকার

► ২২,০০০ কোটি টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা
► এডিপির অব্যয়িত টাকা নেওয়া হবে : পরিকল্পনামন্ত্রী

আরিফুর রহমান   

৪ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্বল্প সুদে ঋণ নিচ্ছে সরকার

করোনাভাইরাসের প্রভাবে সরকারের আয় কমে গেছে। সারা দেশ কার্যত বিচ্ছিন্ন থাকায় ভ্যাট, আয়কর ও শুল্ক আদায় স্থবির। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য বলছে, করোনার কারণে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

অন্যদিকে সরকারের ব্যয় দিন দিন বাড়ছে। পাশাপাশি একের পর এক রপ্তানি পণ্যের ক্রয় আদেশ স্থগিত হচ্ছে। উৎপাদন খাত বন্ধ। অনেক প্রবাসী ফিরে আসায় প্রবাসী আয়েও বিরূপ প্রভাব পড়বে। এ ছাড়া স্বল্প আয়ের মানুষ পড়েছে সবচেয়ে বেশি বিপাকে। রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশাচালক, ফুটপাতের হকার, নির্মাণ শ্রমিকসহ শ্রমজীবী মানুষের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, দুগ্ধশিল্প, পোল্ট্রিশিল্প, পর্যটন খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। ৭৩ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ছোট পুঁজির উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবীসহ স্বল্প আয়ের মানুষকে সহায়তা দিতে সরকার উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে স্বল্প সুদে ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঋণের টাকায় স্বাস্থ্যসেবার সরঞ্জাম কেনা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, সামাজিক সুরক্ষার আওতায় স্বল্প আয়ের মানুষকে সহায়তা দেওয়ার জন্য বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ৭৫ কোটি ডলার চেয়েছে সরকার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ছয় হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। আরেক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ৫০ কোটি ডলার বা চার হাজার ২৫০ কোটি টাকা চেয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির কাছ থেকে ‘বাজেট সাপোর্ট’ বাবদ এই টাকা চাওয়া হয়েছে। ‘বাজেট সাপোর্ট’ অর্থ হলো, সরকার এই টাকা চাইলে যেকোনো খাতে খরচ করতে পারে বিনা প্রশ্নে এবং এই টাকা দ্রুত পাওয়া যায়।

অন্যদিকে চীনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত নতুন ব্যাংক এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংকের কাছে চাওয়া হয়েছে ২৫ কোটি ডলার বা দুই হাজার ১২৫ কোটি টাকা। বিনিময় ভারসাম্য বা ব্যালান্স অব পেমেন্ট ঠিক রাখতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে চাওয়া হয়েছে ৭৫ কোটি ডলার বা ছয় হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) থেকে চাওয়া হয়েছে ১০ কোটি ডলার বা ৮৫০ কোটি টাকা। আইডিবির আরেক সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইটিএফসি) কাছে চাওয়া হয়েছে  পাঁচ কোটি ডলার বা ৪২৫ কোটি টাকা।

এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) থোক বাবদ যে এক হাজার ৬৩০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে, সেই টাকাও স্বল্প ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য খরচ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ২২ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার আশা করছে সরকার। জাতিসংঘের কাছেও সরকার সহযোগিতা চেয়েছে। যদি আরো টাকার প্রয়োজন হয়, সে ক্ষেত্রে এডিপির আওতাভুক্ত প্রকল্প থেকে অব্যয়িত টাকা সরিয়ে এনে চলমান মানবিক দুর্যোগ মোকাবেলা করা হবে বলে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেন, ‘আমাদের টাকার কোনো সমস্যা হবে না। আমাদের এখন অগ্রাধিকার হলো মানুষের জীবনের সুরক্ষা দেওয়া। তারপর তাদের জীবিকার জন্য আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে পিপিই (পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট), কিটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কিনতেও এখান থেকে খরচ করা হবে।’

গত রবিবার ও আগের দিন শনিবার উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে বলেও জানান অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক বলছেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার হার বেশি হয়ে যাওয়ায় নতুন করে আর ব্যাংক খাতের ওপর চাপ দিতে চায় না সরকার। কারণ চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। কিন্তু অর্থবছরের সাত মাস না যেতেই এ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। আবার সরকার এখনই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে চায় না।

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, চলমান দুর্যোগ মোকাবেলায় এই মুহূর্তে তাঁদের সামনে দুটি উপায় আছে। একটি হলো এডিপির অব্যয়িত টাকা নিয়ে আসা। আরেকটি হলো উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণ নেওয়া। এই দুটি পথেই হাঁটছে সরকার।

জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ একটি সংগঠিত সংগঠন। তারা সরকারের কাছে শ্রমিকদের মজুরির জন্য দাবি জানিয়েছে। সরকার পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। কিন্তু স্বল্প আয়ের যারা আছে, তাদের জন্যও আমাদের পরিকল্পনা আছে। সরকারি অফিস বন্ধ থাকায় এডিপির আওতায় প্রকল্পের কার্যক্রমও বন্ধ। এ বছর সংশোধিত এডিপি শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। তাই এডিপিতে অব্যয়িত টাকা আমরা মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলায় খরচ করব। জনগণের জন্য জরুরি কাজে সেই টাকা খরচ করা যাবে।’

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। প্রকল্প আছে এক হাজার ৬০০টি। অনেক মন্ত্রণালয় আছে; যারা তাদের বরাদ্দের পুরো টাকা খরচ করতে পারবে না।

পরিকল্পনা বিভাগের সচিব নূরুল আমিনও কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, এডিপিতে থোক বাবদ এক হজার ৬৩০ কোটি টাকা আছে। চাইলে সরকার এই টাকা করোনাভাইরাস মোকাবেলায় খরচ করতে পারে। থোক বরাদ্দের বাইরেও প্রকল্পে অব্যবহৃত টাকাও আনা যাবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে যে টাকা চাওয়া হয়েছে সেটি পাওয়া গেলে স্বাস্থ্য খাতের সরঞ্জাম কেনা হবে। একই সঙ্গে শ্রমজীবীদের পেছনে খরচ হবে। বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ প্রবাসী দেশে ফিরে এসেছে। এতে আগামী দিনে প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের ধাক্কা আসবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। প্রবাসী আয় কমে গেলে রিজার্ভের ওপরও প্রভাব পড়বে। এসব দিক বিবেচনা করে আইএমএফের কাছে ‘ব্যালান্স অব পেমেন্ট’ বাবদ ৭৫ কোটি ডলার চেয়েছে সরকার।

ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার পোশাক শ্রমিকদের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। এমন প্রণোদনা অন্য খাতের জন্যও জরুরি। সরকার চাইলে সেই টাকা নগদ সহায়তা বাবদ দিতে পারে। এটি করতে পিকেএসএফ (পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন), বিকাশ ও ব্র্যাকের মতো সংস্থাকে কাজে লাগাতে পারে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা