kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী ঢেউ রোখার কৌশলে জোর

তৌফিক মারুফ   

৩ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী ঢেউ রোখার কৌশলে জোর

নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবেলায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকার মানুষকে ঘরে রাখার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি আরো কিছু কৌশল অবলম্বন করেছে। এই মুহূর্তে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সংক্রমণের সম্ভাব্য ঊর্ধ্বমুখী ঢেউ যতটা সম্ভব নিচু বা দুর্বল করে রাখা।

এ ক্ষেত্রে আগের পদক্ষেপগুলোর সঙ্গে নতুন কৌশল বেছে নেওয়া হয়েছে। এ কৌশলের অংশ হিসেবে মানুষের ঘরে থাকাকে আরো দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর করা, নমুনা পরীক্ষা বৃদ্ধি, সংক্রমণ কী পর্যায়ে আছে তার সমীক্ষা, উপসর্গ থাকা ব্যক্তিদের আলাদা করা, আগে থেকেই জ্বর সর্দি কাশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্তদের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা, মৌসুমি ফ্লুতে আক্রান্তদের শনাক্ত করা, হাসপাতালে আসা কাউকে বিনা চিকিৎসায় ফিরিয়ে না দেওয়ার মতো আরো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় নেওয়া প্রথম দিকের প্রস্তুতিগুলোর মধ্যে এই পদ্ধতিকে তেমন একটা গুরুত্ব না দিয়ে শুধু প্রচার, সীমিত বা সংরক্ষিত পরীক্ষা, বন্দরগুলোতে তাপমাত্রা দেখা, হোম কেয়ারেন্টিনের মতো বিষয়গুলোতেই বেশি জোর দেওয়া হয়।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে কভিড-১৯ রোগের বিস্তার মোকাবেলায় গঠিত জাতীয় কমিটির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বিশেষজ্ঞ জানান, নতুন কৌশলগত পদ্ধতির অন্যতম অংশ হিসেবেই মানুষকে দীর্ঘ মেয়াদে ঘরে রাখতে এর মধ্যে এক দফা ছুটি বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া জরুরি ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ের সংক্রমণ পরিস্থিতি বুঝতে প্রতি উপজেলা থেকে উপসর্গ আছে—এমন ব্যক্তিদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শহরে বা গ্রামে মানুষ যাতে বেশি সংখ্যায় জড়ো হতে না পারে সেদিকেও নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। সংক্রমণের গতি কমাতে উপসর্গ অনুযায়ী সবার পরীক্ষার ওপরও এখন জোর দেওয়া হচ্ছে। শুরুর দিকে শুধু বিদেশফেরত ব্যক্তি বা তাঁদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পরীক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনাকে শুধু সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। সেই কৌশল থেকে সরে এসে এখন বেশিসংখ্যক পরীক্ষায় জোর দিয়েছে সরকার। গত তিন-চার দিনে পরীক্ষার কেন্দ্র বাড়ানো হয়েছে। যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে জরুরি ভিত্তিতে। অন্যদিকে প্রতিকারের জায়গায়ও গতি বাড়িয়েছে সরকার। বিভিন্ন জায়গায় করোনা সংক্রমণের সন্দেহজনক উপসর্গ নিয়ে গত কয়েক দিনে কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনায় বিভিন্ন মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এসব মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সন্দেহজনক উপসর্গ নিয়ে এখন যেখানে যার মৃত্যু হোক না কেন প্রত্যেক মৃতের নমুনা সংগ্রহ করে তা দ্রুত সময়ের মধ্যে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যদিও এ পর্যন্ত এ ধরনের মৃত ব্যক্তি, যাদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, তাদের কারো করোনা শনাক্ত হয়নি বলে আইইডিসিআর জানিয়েছে।

সরকারের বর্তমান কর্মকৌশল সম্পর্কে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কৌশল হিসেবে সংক্রমণের সম্ভাব্য উচ্চমাত্রার গতি মন্থর করে দেওয়ার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। যেসব দেশ এই কৌশল নিয়েছে সেসব দেশেই সংক্রমণ কমে এসেছে। এই কৌশল অনুযায়ী আমরা সর্বাত্মক কাজ চালিয়ে যাচ্ছি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দিকনির্দেশনা অনুসরণ করেই আমরা প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে থাকি। সেই সঙ্গে অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি। পাশাপাশি আমাদের দেশের গতিবিধিও সার্বক্ষণিক লক্ষ করছি। সার্বিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে আমরা সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী ঢেউ কতটা দুর্বল করে রাখা বা দমিয়ে রাখা সম্ভব সেই কৌশল কাজে লাগাতে শুরু করেছি। কারণ ঊর্ধ্বমুখী ঢেউ জোরালো থাকলে প্রাণহানি বেশি ঘটে, আর এটা দুর্বল রাখতে পারলে একদিকে আক্রান্তের গতি ধীর হবে, আবার আক্রান্ত হলেও মৃত্যু কম থাকবে এবং আক্রান্তদের চিকিৎসার বেশি সুযোগ পাওয়া যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংস্থা ও দেশীয় বিশেষজ্ঞরা সবাই মিলে এই কৌশলে এগিয়ে যাওয়ার বিষয় গুরুত্ব দিয়েছেন।’

সরকারের বর্তমান কৌশলকে ইতিবাচক বলে বিবেচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় আরো দক্ষ জনবল যুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের কারো কারো মতে, শুধু ‘লকডাউনের’ মতো পরিস্থিতি কিংবা ঘরে রাখার ব্যবস্থা নিয়ে স্বস্তিতে থাকলে হবে না। সেই সঙ্গে যারা ঘরে আছে, তাদের মধ্যে কোনো না কোনোভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে কি না সেটি দেখার জন্য পর্যবেক্ষণের মাত্রা আরো বাড়াতে হবে। যেহেতু এখন মৌসুমি ফ্লুর সময়, তাই স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে এলাকায় এলাকায় ঘুরে জ্বর সর্দি কাশির উপসর্গ আছে—এমন মানুষ খুঁজে বের করে তাদের আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্ততপক্ষে আরো ২৮ দিন এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের উচ্চ গতি রোধ করা সহজ হবে। মৃত্যুহার কমানোর ক্ষেত্রেও এটা কাজে দেবে। বিশেষ করে যাদের মধ্যে আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট রয়েছে এবং যারা বয়স্ক তাদের যদি এমন উপসর্গ থাকে তবে দ্রুত তাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তাহলেই মৃত্যুঝুঁকি কমে আসতে পারে।

আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বর্তমান উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, শুধু যন্ত্রপাতি কিংবা অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনা বাড়ালেই হবে না। এসব যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো পরিচালনা কিংবা সেবা কার্যক্রমের জন্য জনবলের ব্যবস্থা কিভাবে করা যাবে সেটা আগেভাগেই ঠিক করা উচিত। এ ক্ষেত্রে দেরি হয়ে গেলে পরে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো জনবল পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়বে। বিশেষ করে এখনই যেভাবে স্বাস্থ্যকর্মীরা ভয়ে রোগীদের সেবা দিতে চাচ্ছেন না, রোগীদের  হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে; সামনে এমন ঘটনা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বিকল্প দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী রাখা দরকার। প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করার ওপর আরো বেশি জোর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি আইইডিসিআরকে আরো শক্তিশালী করার তাগিদ দেন। এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে যাঁরা নমুনা সংগ্রহ করবেন এবং বাড়ি বাড়ি ঘুরবেন তাঁদের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা জোরালো করার তাগিদ দেন ড. মুশতাক। তিনি বলেন, অনেক দেশেই বিপুলসংখ্যক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু এবং আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যেটা এখানকার চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভয়ের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ড. মুশতাক হোসেন আরো বলেন, ‘আমাদের এখন যত বেশি নমুনা সংগ্রহ করা যাবে, ভাইরাস প্রতিরোধ তত সহজ হবে। কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশন ব্যবস্থাকেও আরো কার্যকর করতে হবে। সন্দেহজনক উপসর্গধারীদের আলাদা করে প্রয়োজনমতো কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনে রাখতে পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। পাশাপাশি দেশের বাইরে থেকে কোনো অবস্থাতেই যাতে আর কেউ দেশে ঢুকতে না পারে সেদিকেও কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশে করোনাভাইরাসের কতটা বিস্তার ঘটেছে সেটা দেখতে জরুরি ভিত্তিতে একটি সমীক্ষা চালানোর জন্য আমাদের কাছে নির্দেশ এসেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে নির্দেশ এসেছে, প্রতিটি উপজেলায় যাদের মধ্যে জ্বর সর্দি কাশি শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ যাদের আছে তাদের নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। সেই নমুনা নির্দিষ্ট ল্যাবরেটরিগুলোতে পরীক্ষার মাধ্যমে সমন্বিত একটি ফলাফল তৈরি করে সেই অনুসারে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।’

অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা সারা দেশে মাঠ পর্যায়ে আমাদের মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের নামিয়ে দিয়েছি নমুনা সংগ্রহের জন্য। এর আগে এসব টেকনোলজিস্টকে করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়েছি ভার্চুয়াল সিস্টেম ব্যবহার করে। তাদের একই সঙ্গে নিরাপত্তা উপকরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। আশা করি নতুন এই দিকনির্দেশনামূলক পদ্ধতি ব্যবহার করে সারা দেশের সার্বিক একটি চিত্র আমরা পেয়ে যাব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা