kalerkantho

রবিবার। ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৭ জুন ২০২০। ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

‘অত্যন্ত বেদনাদায়ক সপ্তাহ আসছে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য’

► দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ : জাতিসংঘ মহাসচিব
► ইউরোপে মৃত্যু ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে
► যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে মৃত্যুতে রেকর্ড

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘অত্যন্ত বেদনাদায়ক সপ্তাহ আসছে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য’

নভেল করোনাভাইরাস মহামারিকে ‘একটি প্লেগ’ হিসেবে বর্ণনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেমনটি আগে কখনো হয়নি। ট্রাম্পের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দুই-তিন সপ্তাহ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময় হবে। তিনি বলেছেন, ‘সামনের দুটি সপ্তাহ হবে অত্যন্ত বেদনাদায়ক—খুব খুব কষ্টকর দুটি সপ্তাহ। আমি চাই, সামনে যে খারাপ সময় আসছে, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ সে জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখুক।’

মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে তিনি এ মনোভাব পোষণ করেন। নিজ দেশে করোনার প্রভাব নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে দফায় দফায় অবস্থান পরিবর্তন করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মঙ্গলবার তিনি এ-ও বলেছেন, সাধারণ ফ্লুর সঙ্গে করোনার তুলনা করা ঠিক হবে না। যদিও এর আগে তিনি করোনাকে পাত্তা না দিয়ে সাধারণ ফ্লুর সঙ্গে তুলনা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মঙ্গলবার আরো পাঁচ বাংলাদেশি মারা গেছেন। তাঁদের চারজন নিউ ইয়র্কে এবং অন্যজন নিউ জার্সিতে মারা যান। এ নিয়ে করোনাভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫ বাংলাদেশির মৃত্যু হলো।

হোয়াইট হাউস মঙ্গলবার তাদের সংখ্যাতাত্ত্বিক মডেলের ওপর ভিত্তি করে শারীরিক দূরত্ব রাখার মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে আরো ৩০ দিনের জন্য বাড়িয়ে দিয়েছে। আক্রান্তের বিচারে শীর্ষ এ দেশটিতে এরই মধ্যে সংক্রমিতের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়েছে। চীনকে টপকে সেখানেও মৃতের সংখ্যা সাড়ে চার হাজার পেরিয়েছে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবারই মারা গেছে ৮৬৫ জন, যা দেশটিতে এক দিনের হিসাবে সর্বোচ্চ। আসন্ন কয়েক সপ্তাহে দেশটিতে দুই লাখ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে হোয়াইট হাউস সতর্ক করেছে।

এদিকে বর্তমান পরিস্থিতিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সাম্প্রতিক করোনাভাইরাস। গুতেরেস আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে এই ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে যে মন্দা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে যাচ্ছে সেরকমটা সম্ভবত নিকট অতীতে দেখা যায়নি।

গত মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের সম্ভাব্য আর্থসামাজিক প্রভাব নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।

গুতেরেস বলেন, ‘নতুন করোনাভাইরাস সমাজের মূলে আঘাত করছে, মানুষের জীবন ও জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে। জাতিসংঘ গঠিত হওয়ার পর কভিড-১৯ আমাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। সংক্রমণ রোধ করতে ও মহামারির ইতি ঘটাতে দ্রুত সমন্বিত স্বাস্থ্য উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’

শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতি স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, এটি না করা হলে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া রোগটির দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হতে হবে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে বিশ্বজুড়ে আড়াই কোটি কর্মসংস্থান নষ্ট হতে পারে বলে হিসাব করা হয়েছে। এই প্রাদুর্ভাবের কারণে বিশ্বব্যাপী বিদেশি বিনিয়োগ ৪০ শতাংশ অবনমন হতে পারে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এ আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে যে করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে সারা বিশ্বে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ চাকরি হারাতে পারে।

ইউরোপে মৃত্যু ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে

করোনার বর্তমান কেন্দ্রস্থল ইউরোপে মৃতের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টা নাগাদ ইউরোপে মোট ৩০ হাজার ৬৩ জন মারা গেছে এবং আক্রান্ত হয়েছে চার লাখ ৫৮ হাজার ৬০১ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে ইতালিতে। গতকাল দেশটিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ১৫৫ জনে।

যুক্তরাজ্য ফ্রান্সে মৃতে রেকর্ড

যুক্তরাজ্যে গত মঙ্গলবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রেকর্ড ৩৮১ জন মারা গেছে। এর মধ্যে ১৩ বছরের এক শিশুও রয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টার তুলনায় এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি।

সোমবার কিংস কলেজ হাসপাতালে ১৩ বছরের যে শিশুটি মারা গেছে সে সম্ভবত যুক্তরাজ্যে করোনায় মারা যাওয়া সবচেয়ে কম বয়সী। এদিকে শিশুটির পরিবার থেকে বলা হয়েছে, ইসমাইল মোহাম্মদ আবদুলওয়াহাবকে হাসপাতালে নেওয়ার আগে তার শরীরে করোনার উপসর্গ দেখা দেয় এবং তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনসহ প্রায় সাড়ে ২৯ হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। জনসন ভিডিও লিংকের মাধ্যমে ক্যাবিনেটকে বলেন, ‘মৃতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া মানে জনগণকে সামাজিক দূরত্ব কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। পরিস্থিতি ভালো হওয়ার আগে আরো খারাপ হবে। কিন্তু পরে ভালো হবে।’

এদিকে গত মঙ্গলবার ফ্রান্সেও রেকর্ড মৃত্যু হয়েছে। দেশটির হাসপাতালগুলোতে আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন ৪৯৯ জনের মৃত্যু নথিবদ্ধ হয়েছে। প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে দৈনিক মৃতের হিসাবে এটিই ছিল ফ্রান্সে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা। গতকাল পর্যন্ত দেশটিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৫২৩-এ।

স্পেনে আক্রান্ত লাখ ছাড়াল

গতকাল দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য বলছে, গতকাল নতুন করে আরো ছয় হাজার ২১৩ জন করোনা সংক্রমিত হয়েছে। এতে স্পেনে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ দুই হাজার ১৩৬ জনে পৌঁছেছে।

স্পেনে এক দিনে রেকর্ড ৮৬৪ জনের প্রাণ কেড়েছে করোনা। এর আগে মঙ্গলবার দেশটিতে ৮৪৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। সব মিলিয়ে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৫৩ জনে।

ইরানে মৃত্যু তিন হাজার ছাড়াল

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে করোনায় মৃতের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে। গতকাল নতুন ১৩৮ জনসহ মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৩৬ জনে। নতুন করে সংক্রমিত হয়েছে দুই হাজার ৯৮৮ জন। তাতে করে দেশটিতে সংক্রমিতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৫৯৩।

এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, করোনায় তাঁর দেশে আক্রান্তের সংখ্যা হ্রাসের ঘটনা প্রমাণ করছে তাঁদের গৃহীত পদক্ষেপ সঠিক ছিল। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে জনগণের সহযোগিতার প্রশংসা করে মন্ত্রিসভার বৈঠকে গতকাল তিনি বলেন, ইরানের সব প্রদেশেই করোনা রোগীর সংখ্যা কমছে।

বৈশ্বিক পরিস্থিতি

বৈশ্বিক পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত বিশ্বের ২০৩টি দেশ ও অঞ্চলে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। মোট শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ১১ হাজার ৫৭৮। এ সময়ের মধ্যে মারা গেছে ৪৫ হাজার ৫৩৮ জন। সুস্থ হয়েছে এক লাখ ৯০ হাজার ৯২১ জন।

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ইতালি। গতকাল পাওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ৭২৭। মোট মৃতের সংখ্যা ১৩ হাজার ১৫৫ জন। বেড়েছে নতুন সংক্রমণের সংখ্যাও। গতকাল সংক্রমিত হয়েছে চার হাজার ৭৮২ জন।

বেলজিয়ামে ১২ বছর বয়সী এক শিশু মারা গেছে কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে। ধারণা করা হচ্ছে, করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে ইউরোপে সবচেয়ে কম বয়সীর মৃত্যু এটি। বেলজিয়ামে গতকাল পর্যন্ত মোট মারা গেছে ৮২৮ জন।

মিয়ানমার করোনাভাইরাসে প্রথম মৃত্যুর খবর প্রকাশ করেছে। কয়েক সপ্তাহ আগে যদিও মিয়ানমার দাবি করেছিল যে তাদের দেশে কেউ করোনাভাইরাস আক্রান্ত নয়; তবে বিশেষজ্ঞরা সেই দাবির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। মিয়ানমারে বর্তমানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৫। সূত্র : বিবিসি, এএফপি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা