kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

সরকারি নির্দেশনা মানছে না বেসরকারি হাসপাতালগুলো

তৌফিক মারুফ   

২ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সরকারি নির্দেশনা মানছে না বেসরকারি হাসপাতালগুলো

রাজধানীর ধানমণ্ডির একটি বড় বেসরকারি হাসপাতালে নিয়মিত রোগী দেখেন ইন্টারনাল মেডিসিন ও রিউমাটোলজির একজন চিকিৎসক। গতকাল বুধবার তাঁকে দেখানোর জন্য চেষ্টা করেন তাঁরই এক পুরনো রোগী। ল্যাবএইডের কল সেন্টারে ফোন করলে তাঁকে জানানো হয়, ওই চিকিৎসক কয়েক দিন ধরেই চেম্বার করছেন না। কবে করবেন তাও জানাতে পারেনি কল সেন্টার থেকে।

চর্মরোগের জটিলতা নিয়ে রাজধানীর গ্রিন রোডের আরেকটি বড় বেসরকারি হাসপাতালের একজন চিকিৎসককে দেখাতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন এক রোগী। সিরিয়ালের জন্য নির্ধারিত ফোনে কল করলে ফোন রিসিভ করে একজন জানান, গত ১০-১২ দিন ধরে ওই চিকিৎসকের চেম্বার বন্ধ আছে। কবে নাগাদ তিনি চেম্বারে বসবেন তা এখনো ঠিক হয়নি।

জ্বর ও হালকা কাশি নিয়ে মধ্যবয়সী একজন রোগী রাজধানীর পান্থপথের বড় একটি বেসরকারি হাসপাতালে যোগাযোগ করে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেন। হাসপাতাল থেকে তাঁকে জানানো হয় যে এ ধরনের উপসর্গ আছে—এমন রোগী আপাতত এই হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে না। সরকারি হটলাইনে ফোন করে আগে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। তারপর সে অনুসারে সরকারি হাসপাতালেই চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে।

মাত্র এক দিন আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের সময় সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের প্রতি অনুরোধ জানান কাউকে যেন ফিরিয়ে দেওয়া না হয়। একইভাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক প্রেস ব্রিফিংয়েও ডাক্তারদের প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ না করে রোগী দেখার অনুরোধ করেন। কিন্তু বাস্তবে গতকাল বুধবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। বেশির ভাগ চিকিৎসকই করছেন না প্রাইভেট চেম্বার। বেসরকারি হাসপাতালেও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না জ্বর সর্দি কাশি গলাব্যথার মতো উপসর্গ থাকা রোগীদের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে মোট বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে পাঁচ হাজার ৫৫টি। যেখানে প্রায় এক লাখ শয্যা রয়েছে। এসব হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) প্রায় ৮০০ শয্যা রয়েছে। অন্যদিকে প্রায় এক লাখ আছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব সেন্টারে প্রতিদিনই বিভিন্ন রোগের চিকিৎসকরা বসতেন। কিন্তু দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ হতে শুরু করে প্রাইভেট চেম্বার, হাসপাতালগুলোও রোগী ফিরে দেয়। বিশেষ করে জ্বর সর্দি কাশির উপসর্গ শুনলে সেই রোগীদের ভেতরে ঢুকতেই দেওয়া হয় না। এমনকি গত কয়েক দিন কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরতে ঘুরতে রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি এলাকায়। সরকার নানাভাবে চেষ্টা করেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারছে না। যদিও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা উপকরণ (পিপিই) না পাওয়ার অভিযোগ লেগেই আছে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিস্থিতির উন্নতির জন্য আমাদের জায়গা থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমরা হাসপাতালগুলোতে ও চিকিৎসকদের মধ্যে নিরাপত্তা উপকরণ দিচ্ছি। হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে চিকিৎসকদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছি। তবে এ ক্ষেত্রে কেবল সরকারের নির্দেশই যথেষ্ট নয়, এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ের প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এমনকি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিজেদের দায়িত্ববোধ আরো সক্রিয় করতে হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা খুব করেই চেষ্টা করে যাচ্ছি সরকারি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও সঙ্গে আনার। যাতে তারা রোগী ফিরিয়ে না দেয় বা রোগী দেখা বন্ধ না করে। কিন্তু অনেকেই এটা করছে না। এ জন্য আমরা ৪ এপ্রিল বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের সংগঠনের নেতাদের নিয়ে আরেক দফা বৈঠক করব।’ তিনি জানান, এর আগেও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে একাধিকার বৈঠক করেছেন তাঁরা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন যাতে তাঁরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাকর্মীদের পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত নিরাপত্তা উপকরণের ব্যবস্থা নিজেরাই করে দেন। সেটা যদি কোনো প্রতিষ্ঠান না করে থাকে সে বিষয়ে তাঁদের আবারও সতর্ক করা হবে।

অবশ্য বড় হাসপাতালগুলো থেকে রোগী ফিরিয়ে দেওয়া কিংবা নিরাপত্তা উপকরণ না থাকার কথা অস্বীকার করে পাল্টা তারা করোনা মোকাবেলায় নিজেদের নানা ইতিবাচক উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।

ইউনাইটেড হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাগুফা আনোয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ও আছেন—এমন রোগীদের মধ্য থেকে ১৭ জনকে সন্দেহভাজন বলে করোনা পরীক্ষা করিয়েছি সরকারি প্রটোকল মেনে আইইডিসিআরের মাধ্যমে। সবারই ফল নেগেটিভ এসেছে। এ ছাড়া আমরা আমাদের প্রতি ফ্লোরে দুটি করে আইসোলেশন কক্ষ রেখেছি যদি প্রয়োজন হয় বা পজিটিভ কোনো রোগী পাওয়া যায় তাঁদের তাত্ক্ষণিক এসব কক্ষে নিয়ে যাওয়া হবে। পাশাপাশি আইসিইউ তো আছেই। এর সঙ্গে মুন্সীগঞ্জে থাকা ইউনাইটেড গ্রুপের আরেকটি হাসপাতাল এরই মধ্যে আমরা সরকারকে বুঝিয়ে দিয়েছি করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার জন্য।’

এভারকেয়ার হাসপাতালের (সাবেক অ্যাপোলো) মহাব্যবস্থাপক (হাসপাতাল) ডা. আরিফুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সব চিকিৎসক ও অন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের সবাইকে পিপিই দেওয়া হয়েছে। সবাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আইসোলেশন ইউনিট ও আইসিইউ প্রস্তুত আছে। এ ছাড়া আমাদের ল্যাবরেটরিতে করোনা পরীক্ষার অনুমতি চেয়ে আমরা সরকারের কাছে আবেদন করেছি। অনুমতি পেলে আমরাও পরীক্ষা করতে পারব।’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা রোগী ফিরিয়ে দিয়েছি—এমন কোনো ঘটনা নেই। তবে করোনার উপসর্গ নিয়ে কেউ এলো তাঁকে আগে আমরা সরকারি প্রটোকল অনুসারে পরীক্ষার কথা বলি।’

এ ছাড়া এরই মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপ তাদের নিজস্ব উদ্যোগে পাঁচ হাজার শয্যার একটি হাসপাতাল তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। একইভাবে আকিজ গ্রুপও একটি হাসপাতাল প্রস্তুত করছে। এর আগেই সাজিদা ফাউন্ডেশনসহ আরো একটি বেসরকারি সংস্থা তাদের নিজস্ব একাধিক হাসপাতালকে তুলে দিয়েছে সরকারের হাতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার জন্য।

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, চুয়াডাঙ্গার বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয় যেসব চিকিৎসক নিয়মিত রোগী দেখতেন তাঁদের প্রায় সবাই রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। অনেকেই চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসক না পেয়ে ফিরে আসছেন।

চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গার বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ যেসব চিকিৎসক আসতেন তাঁদের আসার জন্য আমরাই নিষেধ করেছি। কারণ, তাঁদের উপস্থিতিতে ভিড় অনেক বেশি হয়। যা করোনাভাইরাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।’ তবে, স্থানীয় চিকিৎসকরা বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগী দেখছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ফোন করেও অনেকে ব্যবস্থাপত্র নিচ্ছেন। আমি নিজেও অনেক রোগীর ফোন পাচ্ছি প্রতিদিন। সরকারি হাসপাতালগুলোতে জ্বর, কাশিতে আক্রান্ত রোগী দেখা হচ্ছে নিয়মিত।’ 

ফুলপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি জানান, উপজেলায় বিশেষজ্ঞ চিকিত্কদের প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগীদের। করোনা আতঙ্কে দুই সপ্তাহ ধরে ফুলপুর হাসপাতাল গেটসহ বিভিন্ন এলাকার প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। ফলে পল্লী চিকিত্করাই দিচ্ছেন এসব চিকিৎসা।

স্থানীয় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. প্রবাল দত্ত অধিকারী বলেছেন, প্রাইভেট চেম্বারে রোগীরা অনেক সময় সঠিক তথ্য দিতে চায় না। বর্তমানে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে রয়েছে রোগীর চাপ, করোনার জন্য বেশি সময় দিতে হচ্ছে। তা ছাড়া পিপিই নিয়ে ডাক্তারদের সংকট তো রয়েছেই।

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেওয়ার পর গতকাল জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান প্রাইভেট ক্লিনিক মালিকদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। পরে জেলা বিএমএ সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী ক্লিনিকগুলোকে সচল করার উদ্যোগ নেন।

ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ক্লিনিকগুলোতে প্রাইভেট প্র্যাকটিশনাররা যাতে আসেন তার জন্য আমি ১০০ পিপিইর ব্যবস্থা করেছি। পাশাপাশি প্রত্যেক ক্লিনিকে যাতে দুটি করে করোনা রোগীর চিকিৎসার জন্য আলাদা বেড নিশ্চিত করা হয় তার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা