kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

ত্রাণ বিতরণে হুড়াহুড়ি সুরক্ষার তোয়াক্কা নেই

► ব্যক্তি-সংগঠনের ত্রাণ বিতরণ কাঠামোর মধ্যে আনার তাগিদ
► তদারকি জোরদারের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
► সেনা ও নৌবাহিনীর উপস্থিতিতে ত্রাণে শৃঙ্খলা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



ত্রাণ বিতরণে হুড়াহুড়ি সুরক্ষার তোয়াক্কা নেই

স্বল্প আয়ের মানুষের পাশে ত্রাণ নিয়ে দাঁড়িয়েছে অসংখ্য মানুষ ও সংগঠন। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে ত্রাণ বিতরণ, মানুষের মধ্যে নিয়ম না মানার প্রবণতা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির জন্ম দিচ্ছে। গতকাল হাইকোর্টের সামনের দৃশ্য। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে দেশজুড়ে চলছে ‘ঘরে থাকা’র কর্মসূচি। বন্ধ রয়েছে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট এবং গণপরিবহন চলাচল। এই কর্মসূচি সফল করতে কর্মহীন ও গরিব মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে চলছে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে নির্দেশনা মেনে সুশৃঙ্খলভাবে বিতরণ হচ্ছে ত্রাণ। তবে বিভিন্ন স্থানে প্রশাসন, দলীয়, সামাজিক, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন সংগঠনের ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খলা ও সামাজিক দূরত্ব না মানার চিত্রও ফুটে উঠছে। ত্রাণ বিতরণে সামাজিক দূরত্ব (অন্তত তিন ফুট দূরত্ব রেখে অবস্থান করা) না মানায় করোনাভাইরাসে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকছে। এ ছাড়া অপেক্ষাকৃত অভাবী মানুষের কাছে ত্রাণ কম যাচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ অবস্থায় সরকারি নির্দেশনা মানার জন্য স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সচেতন পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ত্রাণ বিতরণের মানচিত্র বা একটি সুষ্ঠু রূপরেখা তৈরি করতে হবে। যাতে করে ভুক্তভোগী সবাইকে নিয়মের মধ্যে রেখে যথাযথভাবে ত্রাণ সুবিধা দেওয়া হয়। 

দেশের উত্তরের প্রান্তিক জেলা পঞ্চগড় শহরে গতকাল বুধবার দুপুরে পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য মজাহারুল হক প্রধানের উদ্যোগে ত্রাণ সহায়তা নিয়ে চারটি পিকআপ বিভিন্ন এলাকার উদ্দেশে রওনা হয়। অসহায় মানুষ ভিড় জমালেও তাদের আশাহত করে ত্রাণের পিকআপগুলো চলে যায় দূরে। ত্রাণ ছিল সামান্যই। এ ছাড়া সেখানে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা পাঁচ-দশ কেজি করে চাল বিতরণ করছেন। তা দিয়ে একটি পরিবারের দুই দিনেরও খাবার জুটছে না। শহরের রাজনগরের বৃদ্ধা আমিজান বেগম মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন। এখন কাজ বন্ধ বলে ঘরে খাবার নেই। গতকাল সাহায্য পেতে পথে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও পাননি জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের সামনে দিয়ে চাল-ডাল নিয়ে মানুষকে দেওয়া হচ্ছে, আমরা গরিবরা পাচ্ছি না।’

পঞ্চগড় সদর উপজেলার রজলি খালপাড়ার ভ্যানচালক আব্দুল গণি বলেন, ‘পাঁচ-দশ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। তা আমাদের পরিবারের দুই দিনের খাবারও হবে না। বাকি দিনগুলো আমরা কিভাবে চলব?’

জানতে চাইলে পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য মজাহারুল হক প্রধান বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকার তিনটি উপজেলা ও একটি পৌরসভায় ত্রাণ বিতরণের জন্য পাঠানো হয়েছে। সেখানে উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দরিদ্রদের মধ্যে চাল-ডালসহ খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করবেন। আমাদের এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। অসহায় দরিদ্রদের কেউ ত্রাণ সহায়তা থেকে বাদ যাবে না।’

অভিযোগ আছে, ত্রাণ বিতরণে গতকাল পঞ্চগড় শহরের বিভিন্ন স্থানে সামাজিক দূরত্ব মানা হয়নি। তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে প্রকৃত দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষকে ত্রাণ বিতরণের জন্য বলা হয়েছে।’

শুধু পঞ্চগড়ই নয়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খলা, বৈষম্য ও সামাজিক দূরত্ব না মানার চিত্র দেখা যাচ্ছে। ঢাকায় সমাজসেবা অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় কাউন্সিলর ও অন্যান্য সরকারি সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ চলছে। গুলিস্তান, পুরান ঢাকা, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, বাড্ডা ও নতুনবাজার ঘুরে গতকাল দেখা যায় রাস্তার দুই পাশে ছিন্নমূল মানুষের ভিড়। ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করছে মানুষ। ত্রাণ পেতে পুরুষের সঙ্গে নারী-শিশুরা অপেক্ষা করছিল। তাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্বে অবস্থান করার দৃশ্য দেখা যায়নি। দুপুর ১২টায় গুলশান লিংক রোডে একটি মার্কেটের সামনে ত্রাণ পেতে অপেক্ষা করছিল অনেক নারী-পুরুষ। ব্যক্তি উদ্যোগে এক দল তরুণ নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ত্রাণ দিচ্ছিলেন। ত্রাণপ্রত্যাশী বেশি হওয়ায় বিশৃঙ্খলার শঙ্কায় ত্রাণ বিতরণকারীরা বিপদে পড়েন। আধাঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও সেই ত্রাণ বিতরণ করতে দেখা যায়নি। সেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিয়ে ত্রাণ বিতরণে পুলিশকে খুঁজছিলেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাব্বির আহমেদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ত্রাণের গাড়ি দেখে মানুষ ঘিরে ধরে। অনেকে টানাটানি শুরু করে। খাবার দেওয়ার আগেই এমন টানাটানি দেখে পুলিশের সহায়তায় দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি।’

দুপুর ১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ত্রাণ বিতরণ করতে যায় ঢাকা মহানগরী দোকান মালিক সমিতি। নিম্নবিত্ত মানুষকে সহায়তা করতে প্রত্যেক দোকানদারের কাছে সাহায্য আহ্বান করার পর কেউ পেঁয়াজ, কেউ তেল, কেউ চাল, আবার কেউ ডালের ব্যবস্থা করেন। তিন হাজার মানুষকে সহায়তার লক্ষ্যে প্রেস ক্লাবের সামনে এক হাজার ৫০০ প্যাকেট খাবার বিতরণ করতে যান সমিতির লোকজন। ওই প্যাকেটে ছিল পাঁচ কেজি চাল, দুই কেজি করে ডাল, আলু ও আটা। নিম্নবিত্তদের সহায়তার জন্য খাবারভর্তি তিনটি ট্রাক প্রেস ক্লাবের সামনে পৌঁছলে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ছিন্নমূল মানুষ ঘিরে ধরে। খাবার দিতে আসা ব্যক্তিরা মাইকে সবাইকে লাইনে দাঁড়াতে বলেন। সবাই লাইনে দাঁড়ায়ও। কিন্তু খাবার দেওয়া শুরু হলে লাইন ভেঙে হুড়াহুড়ি ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বিতরণকারীরা ট্রাক নিয়ে পল্টনের দিকে চলে যান। পরে এলিফ্যান্ট রোডে ছিন্নমূল মানুষের মাঝে ওই খাবার বিতরণ করা হয়।

ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান টিপু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রেস ক্লাবের সামনে খাদ্য বিতরণ করতে গেলে মানুষ ঘিরে ধরে। খাবার গাড়ি নিয়ে যেতেই রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো ভিড় জমায়। লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার দিতে গেলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। অনেকে লাইন ভেঙে খাবার গাড়ির চারপাশ ঘিরে ধরে। অগত্যা গাড়ির ওপর থেকে কিছু খাবার দিয়ে ফেরত আসতে হয়েছে। পর্যাপ্ত খাবার ছিল কিন্তু বিশৃঙ্খলা হওয়ায় সবাইকে দিতে পারিনি। কেউ হয়তো একবার, আবার কেউ হয়তো দুবার পেয়েছে। কিন্তু সুশৃঙ্খলভাবে দেওয়া গেলে সবাইকে দিতে পারতাম। পরে এলিফ্যান্ট রোডে নিম্নবিত্ত মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এক হাজার ৫০০ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরো খাবার বিতরণ করা হবে।’

বাড্ডা থেকে নতুনবাজার সড়কের দুই পাশে দেখা যায় ছিন্নমূল মানুষের ভিড়। স্থানীয়রা জানায়, সকাল থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির উদ্যোগে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিসরে মানুষ খাবার বিতরণ করেছে। মানুষের চাহিদা বেশি থাকায় কেউ পাচ্ছিল, কেউ পাচ্ছিল না।

ত্রাণ নিতে রাজধানীর নিউ মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, জিগাতলা, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী ও মিরপুরে অপেক্ষায় ছিল ফুটপাতে ও বস্তিতে থাকা অনেক মানুষ। আজিমপুর মোড়ে দুপুর ২টার দিকে ব্যাগভর্তি ত্রাণের চাল, ডাল, আলু ও পেঁয়াজ নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন সোলায়মান মিয়া (৬৫)। কোথা থেকে নিয়ে এলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সকালে লালবাগের বাসা থেইক্কা বাইর হইয়া কেউ কিছু দেয় কি না অপেক্ষায় আছিলাম। পরে হাঁটতে হাঁটতে এলিফ্যান্ট রোডের দিকে যাইয়া দেহি দোকানদাররা বাজারের ব্যাগে কী জানি দিতাছে। তাই নিয়া আইলাম। পরে দেখি চাইল, ডাইল, পেঁয়াজ-টেয়াজ দিছে আরকি।’

আজিমপুর গোরস্তান রোডের পাশের ফুটপাতে বেশ কিছু নারী বসে ছিলেন। জাহানারা আক্তার নামের একজন বলেন, ‘গাড়িতে কইরা মানুষ চাইল-ডাইল নিয়া আহে। এই জন্যে অপেক্ষা করতাছি, যদি কেউ দিয়া যায়। তয় দিতে আইলেও রিকশাওয়ালারা টাইনা-টুইনা নিয়া যায়। আমরা ঠিকমতো পাইও না।’

এ বিষয়ে ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী বিশিষ্ট উন্নয়নকর্মী খুশী কবির গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সমন্বয় না থাকলে ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খলা থাকবেই। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় ও নিয়মিত তদারকি দরকার।’ তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ত্রাণ বিতরণের মানচিত্র তৈরি করতে হবে। আমি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, সমন্বয় না থাকলে কোনো এলাকায় একই ত্রাণ একই ব্যক্তি বা পরিবার তিন দফাও পায়। এ অবস্থা এখনো যে চলছে না তা নয়। বিভিন্ন স্থানে স্থানে ত্রাণ বিতরণকালে সংশ্লিষ্টরা মাস্ক পরছেন; কিন্তু নির্দিষ্ট সামাজিক দূরত্ব মানছেন না। যেহেতু এটা বিশেষ পরিস্থিতি, তাই সতর্কতার সঙ্গে স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশনা মানতেই হবে।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, এ পর্যন্ত ৩৯ হাজার ৪৪৪ টন ত্রাণ জেলাগুলোতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নগদ টাকা দেওয়া হয়েছে ১১ কোটি টাকার কিছু বেশি। তিনি জানান, প্রত্যেক জেলা প্রশাসনকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে করোনাভাইরাসের ঝুঁকি না বাড়ে।

ডা. এনামুর রহমান নিজের ত্রাণ কার্যক্রমের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘আজ (গতকাল) সাভার পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডসহ দুটি ইউনিয়নে ত্রাণ বিতরণ করেছি। ত্রাণের ভ্যান গাড়ি নিয়ে বাড়ি বাড়ি চলে গেছি। দুই-তিন বাড়ির ত্রাণ এক জায়গায় করে দিয়েছি, যাতে কেউ ভিড় করতে না পারে।’

জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সবাই বলছি মানুষকে মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। আর তার জন্য বড় উপায় হচ্ছে ঘরে থাকা। বিশেষ করে ১৪ দিন ঘরে থাকতে পারলে এই ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সহজ হবে। এ ছাড়া ত্রাণ নেওয়াসহ বিভিন্ন জরুরি কাজে বাইরে গেলেও এই সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। করোনোভাইরাস বাতাসে ছড়ায়নি, এটা মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে। তাই আমাদের আপাতত অন্য কোনো ভাবনায় না থেকে বরং কিভাবে মানুষের মাধ্যমে মানুষে ছড়ানো ঠেকানো যায় সেদিকেই বেশি নজর দিতে হবে। একজনের কাছ থেকে আরেকজন নিরাপদ দূরত্বে থাকবে, সেটা নিশ্চিত যত বেশি করা যাবে ততই মঙ্গল।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা