kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

বন্ধ করা যাচ্ছে না মানুষের চলাচল

►সড়কে বেড়েছে গাড়ির চাপ হ খুলেছে অলি-গলির ছোট দোকান
► কাজের সন্ধানে নিম্ন আয়ের মানুষ
►সাহায্যের আশায় মোড়ে মোড়ে জটলা
► গ্রামের হাট-বাজারে মানুষের ভিড়

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বন্ধ করা যাচ্ছে না মানুষের চলাচল

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা মানছে অনেকেই। শান্তিনগর থেকে তোলা (ওপরে); নিয়ম না মানার প্রবণতাও লক্ষণীয়। পরিবহনস্বল্পতার কারণে সিএনজিচালিত অটোরিকশা পেলেই এভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়ে মানুষ। আবদুল্লাহপুর এলাকা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে গত বৃহস্পতিবার থেকে প্রায় সব কিছু বন্ধের সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। প্রথম তিন দিন মানুষ সরকারের সেই নির্দেশনা পুরোপুরিই মেনে চলেছে। তবে রবিবার থেকেই মানুষ ঘরের বাইরে বের হতে শুরু করেছে। আর গতকাল মঙ্গলবার ষষ্ঠ দিনে এসে সড়ক ও বাজারগুলোতে মানুষের পদচারণ আগের চেয়ে বেড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ, প্রচার এবং সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশের টহল সত্ত্বেও বন্ধ করা যাচ্ছে না মানুষের স্থানান্তর।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজধানীসহ সারা দেশেই নিম্ন আয়ের মানুষ কাজের সন্ধানে ঘরের বাইরে বের হচ্ছে। ছোটো ছোটো দোকারগুলোও খুলতে শুরু করেছে। নিম্ন আয়ের পরিবারের নারীরাও কাজের পাশাপাশি সাহায্যের আশায় মহল্লায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা রাস্তায় বের হচ্ছে কেনাকাটাসহ বিভিন্ন কাজের নামে। নগরের রাস্তায় বেড়েছে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলও। আর গ্রামের হাট-বাজারগুলোতে মানুষ করোনাভাইরাসের ভয়াবহতাকে যেন সেভাবে আমলে নিচ্ছে না। মানুষ অনেকটা আগের মতোই চলাফেরা করছে।

মানুষের চলাচল বাড়লেও রাজধানীসহ সারা দেশেই বন্ধ রয়েছে অফিস-আদালত, গণপরিবহন, বিপণিবিতান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে মূল সড়কে খুব বেশি লোকজন দেখা যাচ্ছে না। দূরপাল্লার যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। তবে রিকশা, অটোরিকশাসহ নানা যানবাহনে মানুষজন স্বল্প দূরত্বে চলাচল করছে। মূলত প্রধান সড়কের চেয়ে অলিগলিতে মানুষের ভিড় বেশি। বেশ কিছু চায়ের দোকানে অনেকটাই আগের মতো আড্ডা চলছে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গত পাঁচ দিনের তুলনায় এদিন বেশি যানবাহন চলাচল করেছে। রিকশা ও প্রাইভেট কারের পাশাপাশি চলাচল করছে ট্যাক্সি, ইজি বাইক, পিকআপ, ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহন। মোড়ে মোড়ে ছিল রিকশার অবস্থান। রাইড শেয়ারিং বন্ধ থাকলেও অনেক স্থানেই মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছেন চালকরা। অলিগলির প্রায় বেশির ভাগ দোকানই খুলতে শুরু করেছে।

বিকেলে গাবতলী-সদরঘাট (বেড়িবাঁধ) রুটে বসিলা চার রাস্তার মোড়ে রিকশা, ট্যাক্সি ও ইজি বাইকের ভিড় জমে যায়। আশপাশের গাড়ি মেরামতকারী কিছু ওয়ার্কশপও খুলেছে। সেখান থেকে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের দিকে যেতে কয়েকটি চায়ের দোকানও খোলা দেখা গেছে। অনেকেই ওই সব দোকানে চা পানের পাশাপাশি আড্ডা দিয়ে অলস সময় পার করেছে।

বসিলা ব্রিজ পার হয়ে কেরানীগঞ্জের আটিবাজারেও মানুষ ও যানবাহনের ভিড় দেখা যায়। অবশ্য দুপুর ১টার দিকে ওই বাজারে সেনাবাহিনীর দুটি গাড়িসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল চোখে পড়ে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে টহল গাড়িগুলো থেকে হ্যান্ড মাইকে মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না আসার অনুরোধ জানানো হয়। গাড়ি থেকে অনেককে ঘরে ফেরার অনুরোধ করতে দেখা যায়। অন্যান্য দিনের তুলনায় মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, টাউন হল ও ফার্মগেট এলাকায় যানবাহনের চাপ ছিল বেশি। কারওয়ান বাজার এলাকায় মানুষের ভিড় ছিল। এর মধ্যে ক্রেতা-বিক্রেতার সংখ্যা ছিল বেশি। মানুষজন সামাজিক দূরত্বও সেভাবে মেনে চলছে না।

মহাখালী ও গুলশান এলাকায় প্রাইভেট কার, ট্রাক-পিকআপ, অটোরিকশা ও রিকশার সরব উপস্থিতি ছিল। ট্রাফিক উত্তর বিভাগের (মহাখালী জোন) কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু প্রাইভেট কার, মাইক্রো ও পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক যাতায়াত করছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ বাইরে যত কম বের হবে ততই সবার জন্য মঙ্গলজনক।’

মিরপুর ১৪ নম্বরের মোড়ে একসঙ্গে বসে ছিল ২০ জনেরও বেশি মানুষ। তাদের বেশির ভাগই আবার নারী। সেলিনা খাতুন নামের তাদের একজন জানান, স্বামী রিকশা চালান। তবে আগের মতো আয়-রোজগার নেই। তিনি বাসাবাড়িতে কাজ করলেও এখন বন্ধ। এই মোড়ে অনেকেই সাহায্য নিয়ে আসে। আগেও তিনি এখান থেকে সাহায্য পেয়েছেন। তাই আজও বসে আছেন।

জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়ার নির্দেশনা সিলেটে যথাযথভাবে পালন হচ্ছে না। দুই দিন ধরে সড়কে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নগরের মদীনা মার্কেট, বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, আম্বরখানা ও শিবগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকার পাশাপাশি উপশহর, যতরপুর, মীরাবাজার, সোবহানীঘাট, কাষ্ঠঘর, বিলপাড়, ছড়ারপাড়, চালিবন্দর, কামালগড়, সেনপাড়া, কুমারপাড়া, রায়নগর, শাহি ঈদগাহ ও বনকলাপাড়ায় গলি-রাস্তায় নানা বয়সী মানুষ চলাচল করছে। তাদের অনেকেই মাস্ক পরা। কারো হাতে গ্লাভসও রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে কেউই চলাফেরা করছে না। কেউ কেউ জটলা বেধে আড্ডা দিচ্ছে।

বগুড়ায় রিকশা, ভ্যান, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট গাড়ি, মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ছে মানুষ। গতকাল সকালে শহরের প্রধান সড়ক ও অভ্যন্তরীণ সড়কে যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে। পাড়া-মহল্লা ও বাজারগুলোতে ছিল স্বাভাবিক সময়ের মতোই ভিড়। আর গত পাঁচ দিনের চেয়ে গতকাল মানুষের চলাচল ছিল বেশি। শহরের জিরো পয়েন্ট, সাতমাথা, পার্ক রোড, খান্দার মোড়, শেরপুর রোড, স্টেশন রোড, কাজী নজরুল সড়ক, থানা রোড, বড়গোলা টিনপট্টি, কালীতলাসহ ছোট-বড় সব সড়কেই ছিল যানবহন ও মানুষের ভিড়।

বগুড়ার জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহম্মেদ বলেন, ‘জনগণকে সচেতন করতে আমাদের পক্ষ থেকে যথেষ্ট প্রচার চালানো হচ্ছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী ও প্রশাসন তৎপর রয়েছে।’

চুয়াডাঙ্গা শহরে গতকাল হাটের দিন থাকায় ভিড় ছিল বেশি। মানুষকে রীতিমতো যানজট ঠেলে বাজারে ঢুকতে ও বের হতে দেখা গেছে। বিশেষ করে চাল, আটা, মাছ, মুরগি ও মুদি দোকানে ভিড় বেশি দেখা গেছে। জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, সন্ধ্যা ৬টার পর ওষুধ ছাড়া সব ধরনের দোকানপাট বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঘরে থাকার কথা বলা হয়েছে।

রাজবাড়ীর সড়ক ও বাজারগুলোতে বাড়তে শুরু করেছে মানুষ ও ছোট যানবাহনের চাপ। প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দোকানের পাশাপাশি অন্য কিছু দোকান এক শাটার খোলা রেখে বেচাকেনা করছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের টহলের পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করতে মাইকিংও করতে দেখা গেছে।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে প্রশাসনের নির্দেশনা মানছে না সাধারণ মানুষ। দুই দিন ধরে গ্রামের হাটবাজারেগুলোতে বিকেল হলেই লোকসমাগম বাড়ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশেকুল হক বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি লোকজন যেন ঘরের বাইরে না আসে।’

মাদারীপুরের রাজৈরেও হাট-বাজারগুলোতে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করছে। টেকেরহাট বন্দরে আগের মতোই শনিবার ও বুধবারের হাটে শত শত লোক আসে। টেকেরহাট বন্দরের সড়ক ও জনপথ অফিসের সামনে প্রতিদিন ভোরে বসছে শ্রমবাজার। তারা কেউই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছে না। গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও ইঞ্জিনচালিত ভ্যান, ইজি বাইক ও মহেন্দ্র চলছে প্রায় আগের মতোই। চলছে চায়ের দোকানে আড্ডা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহানা নাসরিন বলেন, ‘জনগণের মধ্যে সচেতনতা কম। এত প্রচার সত্ত্বেও মানুষ ঠিকমতো নির্দেশনা মেনে চলছে না। তবে এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

[প্রতিবেদনের তথ্য জুগিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক এবং জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিরা]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা