kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৪ জুন ২০২০। ১১ শাওয়াল ১৪৪১

নিম্নবিত্তের জীবন থমকে গেছে

দিনমজুর-শ্রমজীবীদের কাজ নেই, ত্রাণ অপ্রতুল

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নিম্নবিত্তের জীবন থমকে গেছে

‘চাইর দিন বাড়িত আছিনু। জমা এক হাজার টাকা আর হাওলাদি ৫০০ টাকা শ্যাষ করিনু। এলা হাতোত কিছুই নাই। বাধ্য হয়া রিকশাখান ধরি বাইরোত আসিনু।’ নীলফামারী জেলা শহরের সরকারপাড়া গ্রামের রিকশাচালক আব্দুস সালাম (৪৫) গতকাল সোমবার কথাগুলো বলছিলেন। চার দিন বাড়িতে ছিলেন। সংসার চালাতে শেষ করেছেন জমানো এক হাজার টাকা। ঋণ করে খরচ করেছেন ৫০০ টাকা। নিরুপায় হয়ে শেষে গতকাল সকালে রিকশা নিয়ে শহরে বের হয়েছেন তিনি। সকাল থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে আয় করেছেন ৩০ টাকা। এত কম উপার্জনে কিভাবে সংসার চলবে এ নিয়ে উদ্বেগ তাঁর চোখেমুখে।

অন্যদিকে প্রায় দুই কোটি মানুষের শহর ঢাকা এখন ফাঁকা। বহু কর্মজীবী মানুষ কাজ না পেয়ে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। ত্রাণের গাড়ির পেছনে ছুটেও অনেকে পাচ্ছে না ত্রাণ।

বিকল্প রোজগারের ব্যবস্থা না থাকায় সরকার ঘোষিত বন্ধের মধ্যেও আইন অমান্য করে ঘর থেকে বের হতে হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষকে। গতকাল সরকার ঘোষিত বন্ধের পঞ্চম দিনে রাজধানীর সড়কে বের হয়ে দেখা যায়, অনেক রিকশাচালক, অটোচালক গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন। যাত্রীর অপেক্ষায় তাঁরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে অপেক্ষা করছিলেন।

সেলুনের দোকান বন্ধ বলে নাপিতদের রোজগারও বন্ধ। হাতের জমানো অর্থ ফুরিয়ে যাওয়ায় গতকাল তারাও অলিগলিতে সেলুন খোলেন। দৈনিক কাজ করে আয়ের টাকা দিয়ে চলা মানুষ চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন। গতকাল সকালে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আজিজুল। বাড়ি ময়মনসিংহে। মিরপুর ১৪ নম্বরে একটি বস্তিতে থাকেন। কালের কণ্ঠকে তিনি জানালেন, প্রথম দুই দিন রিকশা নিয়ে তিনি বের হননি। ঘরে খাবার শেষ। তাই তিনি বাধ্য হয়ে রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন। তাঁর সংসারে সদস্য পাঁচজন। রিকশা চালিয়ে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চলে। ঘরে নগদ টাকা নেই। কিন্তু রাস্তায় বের হয়েও যাত্রী পাচ্ছেন না। ফলে কাটছে না তাঁর উদ্বেগ।

পাশেই আরেক রিকশাচালক সাহাদত বললেন, ‘পেটে ভাত নাই স্যার। কিন্তু রাস্তায় নাইম্যা দেহি লোকজনও নাই। তিন ঘণ্টায় মাত্র দুইটা টিপ (ট্রিপ) মারছি। ৬০ টাহা পাইছি। সন্ধ্যা নাগাদ চালাব। যা অয়, তাই দিয়া চলমু।’ সাহাদতের বাড়িতে মা-বাবা আছেন। প্রতি সপ্তাহে টাকা পাঠাতে হয়। ছোট বোন স্কুলে পড়ে। ঢাকায় স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে থাকেন। রিকশা চালিয়ে দুই সংসার সামলান তিনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে কী করবেন তিনি ভেবে পাচ্ছেন না!

বিকাল ৩টায় বাড্ডার নতুন বাজার মোড়ে দাঁড়িয়েছিলেন একদল নারী-পুরুষ। কারো হাতে কাজের ব্যাগ, কারো হাতে কাজের যন্ত্রপাতি। আধঘণ্টার বেশি সময় দাঁড়িয়েও কাউকে কাজে যেতে দেখা গেল না। কথা বলে জানা যায়, তারা সবাই কাজের খোঁজে এসেছেন। বাসা-বাড়িতে দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করতেও কেউ ডাকেনি। মাটি টানা, পণ্য উঠানামা বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজেও ডাক পাননি।

সাড়ে ৩টার দিকে ত্রাণভর্তি দুটি ট্রাক নতুন বাজারে এসে থামে। কাজের জন্য অপেক্ষমাণরা ছুটে যান ট্রাকের পাশে। কিন্তু বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ত্রাণ না দিয়েই সামনে এগোতে থাকে ত্রাণের ট্রাক। অপেক্ষমাণরা ছুটতে থাকেন ট্রাকের পিছু পিছু।

এঁদেরই একজন লোকমান মিয়া জানান, স্বাভাবিক সময়ে নতুন বাজার মোড়ে এসে বসলে কাজের সন্ধান মিলে। কিন্তু এখন কোনো কাজ নেই। গত কয়েক দিনে খাবারের সমস্যা হয়নি। কিন্তু এখন তাঁদের আর খাবার নেই।

চল্লিশোর্ধ রিজিয়া বসবাস করেন নতুন বাজারে। বাসা-বাড়িতে কাজ করে সংসার চলে তাঁর। তিনিও কর্মহীন। বাড়ির মালিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কাজে যেতে বারণ করেছেন। ফলে গতকাল সকাল থেকে কাজের সন্ধান করেও ফল হয় না।

ধানমণ্ডির সাতমসজিদ রোডে ঠেলাগাড়িতে ফল বিক্রি করেন হাসান মিয়া। গতকাল সকালে ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরের পাশে ফল বিক্রি করছিলেন তিনি। কালের কণ্ঠকে তিনি জানান, দৈনিক কমবেশি ছয় হাজার টাকার ফল তিনি বিক্রি করতেন। এখন আর বিক্রি নেই। ছয় ভাগের এক ভাগে নেমেছে বিক্রি। সংসার চলবে কিভাবে, বুঝতে পারছেন না তিনি।

একমাত্র ছেলে মারা গেছে বছর পাঁচেক আগে। দুই নাতনি এবং ছেলের বউকে নিয়ে রাজধানীর পলাশী এলাকায় থাকেন নাসিমা।  বউ-শাশুড়ি মিলে পলাশী এলাকার তিনটি বাসায় কাজ করতেন। করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে বাড়ির মালিকরা কাজে যেতে বারণ করে দিয়েছেন তাঁদের। গতকাল সকালে রাজধানীর শাহবাগে নাসিমা হাতে কয়েকটি মাস্ক নিয়ে বিক্রি করতে রাস্তায় ঘুরছিলেন। দুই দিনে ২০০ টাকার মাস্ক বিক্রি করে লাভ হয়েছে ২৫ টাকা। নাসিমা বলেন, ‘আমাদের তো ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার জায়গা নেই।’

তিন মাস আগে নীলফামারীর জলঢাকা থেকে রাজধানীতে এসেছেন আবদুল মজিদ। শাহবাগে ফুলের দোকানে ফুল গুছিয়ে দিয়ে ৫০ টাকা করে পেতেন। এখন সে কাজ নেই। রাতে ঘুমান রমনা পার্ক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংযোগ উড়াল সেতুর নিচে। গত রবিবার দুপুরে একটি ভ্যানে করে কয়েক প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে এসেছিলেন কয়েকজন যুবক। অন্যদের সঙ্গে মজিদও এক প্যাকেট বিরিয়ানি পেয়েছিলেন। তারপর আর পেটে কিছু জোটেনি।

গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার আশরাফ আলী নদী ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে সাত বছর আগে চলে আসেন রাজধানীতে। থাকেন রায়েরবাজার পুলপাড় বস্তিতে। পাঁচজনের সংসার চালান রিকশা চালিয়ে। ফলে গত রবিবার থেকে বাধ্য হয়ে রিকশা বের করা শুরু করেছেন। রবিবার ১৯০ টাকা আয় করেছিলেন। গতকাল সোমবার তা-ও হয়নি। দিন শেষে কী নিয়ে বাসায় ফিরবেন সেটাই ভাবছিলেন তিনি।

আসাদুল গাবতলী থেকে সদরঘাট রুটে ইজিবাইক চালান। তিনি জানান, গাবতলী থেকে বাস চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রী নেই। এলাকার লোকজন কম বের হওয়ার কারণে ভাড়া পাচ্ছেন কম। যা আয় হয়, তাতে সারা দিনে রাস্তার খরচ চলে না। সংসার চলবে কিভাবে? সারা দিনে ১৩৫ টাকা আয় করেছেন জুতা পালিশওয়ালা বিকাশ দাশ। মোহাম্মদপুর ঢালের বাজারের পাশে বসে জুতা পালিশ করেন। আগে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বসলেও এখন বসেন বিকেল থেকে। তিনি জানান, অফিসে যাওয়ার পথে, আবার অফিস থেকে ফেরার পথে অনেকেই জুতা পালিশ করিয়ে নিত। কিন্তু এখন অফিস-আদালত বন্ধ। ফলে তাঁর কাজও নেই বললে চলে।

সকালে চন্দ্রিমা উদ্যান, মানিক মিয়া এভিনিউ ও মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় কোনো ফেরিওয়ালার দেখা মেলেনি। বিকেলে কাদেরাবাদ হাউজিং এলাকায় টিনের পাতিলে মাছ বিক্রেতা হোসেন আলী বলেন, পেটের তাগিদে ভোরবেলা পায়ে হেঁটে কাওরান বাজারের এক মহাজনের কাছ থেকে কয়েকটি ইলিশ মাছ নিয়ে এসেছেন। মানুষ ঘর থেকে বের হয় না। তার পরও কিছু বিক্রি হয়েছে। রায়ের বাজার সাদেক খান রোডে বৈশাখী খেলার মাঠে দিনমজুরের হাট বসছে না। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থেকে ঢাকায় আশ্রয় নেওয়া দিনমজুর মোবারক আলী জানান, তাঁর এলাকার অনেকেই গ্রামের বাড়ি চলে গেলেও তিনি পরিবার নিয়ে এখানেই আছেন। দীর্ঘদিন আগে গ্রাম ছেড়ে চলে আসায় এখন গ্রামে ফিরে কাজ পাওয়া যায় না। আশরাফ আলী পেশায় একজন কুলি। বাসা পরিবর্তনের সময় আসবাবপত্র ওঠানো-নামানো, শোরুম থেকে ক্রেতার বাসায় আসবাবপত্র আনা-নেওয়ার কাজ করেন তিনি। অন্য সময় কাজের প্রচুর ব্যস্ততা থাকলেও বর্তমানে বেকার হয়ে পড়েছেন। গতকাল সকালে মহাখালীর টিবি গেটসংলগ্ন এলাকায় কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আগে কেউ আমারে কাজে নিতে চাইলে দু-তিন দিন আগে ফোন দিয়া কথা কইয়া রাখত, আর এহন গত সাত দিন ধইরা কোনো কাম নাই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দিনমজুর মানুষ। এত টাকা আমাগোর কাছে নাই যে বইসা বইসা খামু। কিন্তু এহন কাজও পাইতাছি না। কি যে হইব আল্লাহ মালুম।’

চট্টগ্রাম মহানগরীতে কর্মজীবীদের ঘরবন্দি রাখতে দরিদ্র পরিবারে খাদ্য সহায়তা দেবে চট্টগ্রামের শিল্পপ্রতিষ্ঠান কেএসআরএমের সহযোগিতায় পুলিশ। রাতের বেলা পুলিশ মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে খাবার পৌঁছে দেবে। মহানগরীর চারটি থানা কোতোয়ালি, বাকলিয়া, সদরঘাট ও চকবাজার থানা এলাকায় তিন হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন আশরাফ উল আলম, নিখিল ভদ্র, পার্থ সারথি দাস, লায়েকুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম, বাহরাম খান, তানজিদ বসুনিয়া, চট্টগ্রাম ও নীলফামারী প্রতিনিধি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা