kalerkantho

সোমবার । ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ১  জুন ২০২০। ৮ শাওয়াল ১৪৪১

করোনায় আক্রান্ত মানেই ভয়ংকর কিছু নয়

ডা. মো. জুলহাস উদ্দিন

৩১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



করোনায় আক্রান্ত মানেই ভয়ংকর কিছু নয়

করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) একটি ভাইরাল সংক্রামক রোগ, যেটি মানবদেহের শ্বাসপ্রণালী, বিশেষ করে ফুসফুসকে আক্রান্ত করে, যার ফলে রোগী জ্বর, বুক ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও কাশি অনুভব করে। আমরা যেটাকে ‘নিউমোনিয়া’ বলে থাকি। পক্ষান্তরে ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস নাক-গলাকে আক্রান্ত করে। ফলে রোগী হাঁচি, নাক-ঝরা, গলা ব্যথা, শরীর ম্যাজম্যাজ করা ইত্যাদি উপসর্গ অনুভব করে। উভয় ধরনের সংক্রমণই হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায় এবং দুটি একই প্রজাতির রোগ। সুপ্তকাল অর্থ হলো, জীবাণু শরীরে প্রবেশ করার পর উপসর্গ দেখা দেওয়ার সময়কাল পর্যন্ত, যা কভিড-১৯ ও ফ্লুর ক্ষেত্রে ভিন্ন। করোনা নিচের শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করে বলে সর্বোচ্চ ১৪ দিন এবং ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা ওপরের শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করে বলে সর্বনিম্ন এক দিন বা দুই দিন। আর এর ওপর নির্ভর করেই করোনায় সংগনিরোধ বা কোয়ারেন্টিন ১৪ দিন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

উপরোক্ত উপসর্গগুলোর সঙ্গে যদি সংস্পর্শ বা কন্টাক্টের ইতিহাস থাকে তবে আমরা তাকে সাসপেক্টেড কভিড-১৯ রোগী হিসেবে বিবেচনা করি এবং উল্লিখিত সময়ের জন্য ‘নিজ বাড়ি বা হাসপাতাল কোয়ারেন্টিন’ বা সংগরোধে পাঠাই। সুখের বিষয় হলো, এ পর্যন্ত কোয়ারেন্টিনদের মধ্য থেকে খুবই কমসংখ্যক রোগী আমাদের দেশে সংক্রমিত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং এর মধ্যে অনেকেই উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও সুস্থ হয়ে সংগরোধমুক্ত হয়েছে।

এবার আসা যাক কভিড-১৯ চিহ্নিতকরণ পরীক্ষা যেমন : আরটি-পিসিআর ও সেরোলজিক্যাল পরীক্ষা শুধু সন্দেহজনক রোগীদের ওপর। আরটিপিসিআর অর্থাৎ সরাসরি জীবাণু নির্ণয়কারী পরীক্ষা যা প্রথম দিন থেকেই পরীক্ষার জন্য নাক ও গলা থেকে নমুনা নেওয়া যায়, যদিও রিপোর্ট পেতে দু-তিন দিন সময় লাগে এবং পজিটিভ হলেই আমরা তাকে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত বলি। এখন সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, আক্রান্ত ব্যক্তির উপসর্গ দেখা না দিলেও পজিটিভ হতে পারে, আর যদি হয়েও যায় তবে ইতিমধ্যে প্রতিরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি রক্তে তৈরি হতে শুরু করে। আর প্রাকৃতিক নিয়মে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি জীবাণু শরীরে প্রবেশের সপ্তাহখানেক পর থেকেই দেখা দিতে শুরু করে, যা সারা জীবনই ওই সংশ্লিষ্ট রোগীকে ডিফেন্স দিতেই থাকবে। আমরা এ-ও জানি, চিকিৎসাশাস্ত্রে যখন অ্যান্টিবায়োটিক ছিল না, তখন সুস্থ হওয়া রোগীর কাছ থেকে এ ধরনের প্রটেকটিভ অ্যান্টিবডি-সমৃদ্ধ রক্ত নিয়ে চিকিৎসা করা হতো। বর্তমান করোনা ক্রাইসিসের সময় এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের সুস্থ হওয়া রোগীর ইমিউন প্লাজমা দিয়ে চিকিৎসা প্রদানের কথা ভাবছে।

সুতরাং করোনা প্রতিরোধে অসংখ্য গণমাধ্যম ও গণসংযোগের মাধ্যমে জনসচেতনতা থেকে শুরু করে সরকারের মানবিক প্রচেষ্টায় কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ রোগের ন্যাচারাল হিস্টোরি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানের প্রসার ঘটানো এবং সর্বোপরি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি সামনে রেখে আমরা বলতেই পারি যে করোনায় আক্রান্ত মানেই ভয়ংকর কিছু নয়। সর্বশেষ চীনের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, করোনার উৎপত্তিস্থল উহানে প্রথম দিকে আবহাওয়া অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা ও স্যাঁতসেঁতে ছিল। অর্থাৎ বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়াতে পারলে এর সংক্রমণ কিছুটা হলেও রোধ করা সম্ভব ছিল। সেদিক থেকেও করোনা আক্রান্ত রোগীদের তথা সর্বস্তরের জনসাধারণের জন্য বাংলাদেশে বর্তমান অপেক্ষাকৃত গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া কিছুটা হলেও স্বস্তিবোধ করবে।

অতএব, অহেতুক ভীতিকর অবস্থায় না থেকে নিজের ঘরে বসে পরিবারের সঙ্গে থেকে মিলেমিশে ইবাদত-বন্দেগি করে দিনাতিপাত করুন।

লেখক : সিনিয়র কনসালট্যান্ট, ল্যাবএইড গুলশান এবং অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত মেজর) ও বিভাগীয় প্রধান, মার্কস মেডিক্যাল কলেজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা