kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

অঘোষিত লকডাউনের চতুর্থ দিনে ভিন্ন দৃশ্য

► সড়কে যানবাহন ও মানুষের সংখ্যা বেড়েছে
► পাইকারি ও খুচরা বাজারে আনাগোনা

জহিরুল ইসলাম   

৩০ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অঘোষিত লকডাউনের চতুর্থ দিনে ভিন্ন দৃশ্য

করোনার বিস্তার রোধে সতর্ক দেশ। মাঠে তত্পর সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশ। সরকার ঘোষিত টানা ১০ দিন সাধারণ ছুটির চতুর্থ দিনে গতকাল রবিবারও দেশজুড়ে মানুষ ছিল ঘরবন্দি। মহাসড়কগুলোও যাত্রীবাহী যানবাহনশূন্য। নৌ, ট্রেন, বিমান চলাচলও যথারীতি বন্ধ। ফাঁকা সব বিভাগীয় শহরের রাস্তাঘাটও। তবে এদিন রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই থেমে থাকা জনজীবনে কিছুটা সচলতা লক্ষ করা গেছে।

প্রায় দেড় কোটি মানুষের ঢাকা মহানগরীসহ সারা দেশেই ২৬ মার্চ থেকে অঘোষিত লকডাউন চলছে। করোনা সচেতনতায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বাসায় থাকার নির্দেশনা রয়েছে। এর মধ্যেও ঢাকাসহ সারা দেশে গতকাল তুলনামূলক বেশি সংখ্যায় যানবাহন ও লোকজন রাস্তায় নেমে আসে। অবশ্য কিছু কিছু ব্যাংকে সামান্য সময়ের জন্য লেনদেন হয়েছে। সেই প্রয়োজনেও বিশেষ ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের আনা-নেওয়ার গাড়ির সংখ্যাও এদিন তুলনামূলক বেশি ছিল রাস্তায়।

বন্দর নগর চট্টগ্রামে গতকাল সকাল ১১টার দিকেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যানবাহন রাস্তায় দেখা যায়। ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি অটোরিকশা ও রিকশা চলেছে হরদম। সেসব যানবাহনে যাত্রীও দেখা গেছে। রাজশাহী বিভাগীয় শহরে গতকাল অটোরিকশার আধিক্য ছিল চোখে পড়ার মতো। মহানগরীর প্রধান সড়কে পণ্যবাহী যান চলাচল করেছে। একই সঙ্গে ছিল রিকশা। লোকজনও কাঁচাবাজারসহ নানা প্রয়োজন সারতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে। খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও দিনাজপুরের মতো বিভাগীয় শহরগুলোয় নিতান্ত পেটের তাগিদে অটো ও রিকশাচালকরা বাইরে বের হয়। তবে বড় গাড়ির চলাচল বন্ধ ছিল। সিলেট শহরে প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সচেতনতামূলক তত্পরতা ছিল। আবার কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ অনেক জেলা শহরেই মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে নাগরিক চলাচলে কিছুটা শিথিলতা ঘোষণার পর গতকাল রাজধানীতে সাধারণ মানুষের বাইরে বের হওয়ার প্রবণতা বেশি লক্ষ করা গেছে। কেউ বের হয়েছেন খাবার কিনতে, কেউবা বাজার করতে; সীমিত পরিসরে কয়েকটি খাবারের দোকানও খোলা রাখতে দেখা গেছে। বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি জানিয়েছে, এ মুহূর্তে সক্ষমতা অনুযায়ী সীমিতভাবে রেস্তোরাঁ খোলা রাখার কথা ভাবছে তারা।

গত শনিবার ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ১০টি নির্দেশনা পাঠান। তাতে বলা হয়, অনেক মানুষের রান্না-বান্নার ব্যবস্থা নেই, তাই তাদের জন্য খাবার হোটেল, বেকারি খোলা থাকবে। এসব হোটেল-বেকারিতে কর্মরতদের সড়কে চলাচল করতে দিতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ও অপরিহার্য পণ্যের দোকান খোলা থাকবে এবং এসব দোকানে কর্মরতরা কাজে যোগ দিতে পারবেন। হোটেল থেকে গ্রাহকদের খাবারের পার্সেল নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিতে হবে। তবে কিছু ক্ষেত্রে ‘সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে’ কেউ হোটেলে বসে খেতে পারবেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঢাকায় যেকোনো নাগরিক একা যেকোনো মাধ্যম ব্যবহার করে চলাফেরা করতে পারবেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর সড়কগুলোয় গত কয়েক দিনের তুলনায় পরিবহন বেড়েছে। অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে রাস্তা নামে। জীবিকার তাগিদে শ্রমজীবী মানুষও রাস্তায় নেমেছে এদিন। বেড়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। আজিমপুর, শাহবাগ, নয়াবাজার, গুলিস্তান, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন সড়কে গত তিন দিনের চেয়ে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বেশি দেখা গেছে।

চকবাজারে অটোরিকশা নিয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষারত শহীদ মিয়া বললেন, ‘বাসায় থাকলে না খাইয়া মরমু, আর বাইরে করোনার ভয়! কী করমু আমরা। বাইচাত থাকতে হইব। এইজন্যে গাড়ি নিয়া বের হইছি। কয়েক দিন গাড়ি না চালাইয়া এখন খাওনের টাকার জন্যও চিন্তায় আছি।’

পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, মূল সড়কগুলোয় মানুষের উপস্থিতি না থাকলেও অলিগলিতে বিভিন্ন বাসার নিচে আড্ডা দিচ্ছেন অনেকেই। লালবাগ এলাকার শহীদনগর ৮ নম্বর গলির এক মুদি দোকানের সামনে কয়েকজনকে আড্ডা দিতে দেখে যায়। শাহাবুদ্দিন নামে তাঁদের একজন বলেন, ‘বাসায় বইসা কী করমু? এইজন্যে বাইরে আইসা একটু আড্ডা দিতাছি। আমরা সচেতন আছি তো; এলাকা থেকে কোথাও যাইতাছি না।’

চকবাজার এলাকার প্রায় সব দোকান বন্ধ থাকলেও সড়কে মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। বুড়িগঙ্গার পার ঘেঁষে বেড়িবাঁধ এলাকার সড়কে মানুষ কম থাকলেও পাশের মৌলভীবাজার, মিডফোর্ড এলাকার অলিগলিতেও ছিল একই চিত্র। লালবাগ এলাকার জে এন শাহা রোড, শহীদনগরের ৯টি গলি, বালুর মাঠসহ বিভিন্ন স্থানে মানুষের উপস্থিতি ছিল বেশি।

লালবাগ থানার ওসি কে এম আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা সারাক্ষণ মানুষকে সচেতন করছি। বারবার বলছি বাসায় থাকার জন্য। কিন্তু সবাই বলছে জরুরি প্রয়োজনে বের হয়েছে। মাইকিং করছি, লিখে জানাচ্ছি; কিন্তু মানুষ মানতে চায় না।’

চকবাজার থানার ওসি মওদুদ হাওলাদার বলেন, ‘বিভিন্নভাবে এলাকাবাসীকে সচেতন করা হচ্ছে। যাতে কিছুতেই কোথাও জড়ো না হয়। কেউ মানছে আবার কেউ মানছে না। তবে সবাই মাস্ক পরে বাসা থেকে বের হচ্ছে।’

পাইকারি বাজারে খুচরা বিক্রেতার ভিড় : গতকাল দুপুরে পুরান ঢাকার বাদামতলী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফলের পাইকাররা নিজেদের আড়তে অলস সময় পার করছে। সব সময় যানজট লেগে থাকা বাদামতলীর সড়কটিতে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান আগের মতো ফল বিক্রির জন্য অপেক্ষায় থাকলেও নেই আগের মতো ক্রেতা। তবে যে জনসমাগম আছে তাই করোনার প্রসারে বড় হুমকি হতে পারে। একই অবস্থা শ্যামবাজারে।

বাদামতলীর ফল বিক্রেতা জাবেদ হাওলাদার বলেন, ‘সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি আমাদের জানা আছে। দেশজুড়ে ফলের দোকান খোলা থাকায় চাহিদা মেটাতে আমরা ঝুঁকি নিয়েই আড়ত খোলা রেখেছি। ক্রেতারা যদি সাবধানে এসে কাজ সেরে চলে যায় তবে আর সমস্যা হয় না।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা