kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

বিশেষজ্ঞ মত

ঘরের মধ্যেও বয়োজ্যেষ্ঠরা দূরে থাকুন

ডা. সাকিল আহম্মদ

২৯ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঘরের মধ্যেও বয়োজ্যেষ্ঠরা দূরে থাকুন

অদৃশ্য এক শত্র‌ু হানা দিয়েছে। যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। সব দেশ/সরকার জনসাধারণকে নিরাপদ বাংকারে (বাসায়) থাকতে বলেছে। পথে গাড়ি

নেই। ঢাকা ও বাংলাদেশের রাস্তায় সেনাটহল। অদৃশ্য শত্র‌ু কিভাবে হানা দেয় তার কিছু তথ্য জানা। এর বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান অস্ত্র সামাজিক বিচ্ছিন্নকরণ (Social Distancing)| বাংলাদেশ এখন তা-ই করছে।

আমরা চীন, ইতালি, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ থেকে জেনে গেছি শত্রুর সহজ টার্গেট। ৬০ থেকে ৭০-এর বেশি বয়সী মানুষ। নারী-পুরুষের ভেদাভেদ আছে—পুরুষ মারা যাচ্ছে বেশি। এই শত্রু ইতালিতে হত্যা করেছে আট হাজার ২১৫ জনকে। এর ভেতর ৭০-এর বেশি বয়সী সাত হাজার ৩২ জন (৮৫.৬ শতাংশ)। নিউ ইয়র্কের গভর্নর এন্ড্রু কোম বলছেন, ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে সেখানে মৃত্যু হয়েছে ৭৫ শতাংশের। একই তথ্য দিচ্ছে গণচীন। ৫০ বছরের নিচে মাত্র এক শতাংশ। ৯ বছরের কম বয়সী কেউ মারা যায়নি। বাংলাদেশেও যে পাঁচজন মারা গেছেন, সবাই বেশি বয়সী।

পপুলেশন পিরামিড ডট নেট (Populationpyromid.net) বলছে, বাংলাদেশের সত্তরোর্ধ্ব জনগোষ্ঠী ৩.৩ শতাংশ অর্থাৎ ৫৬ লাখ। ইতালিতে ২৩ শতাংশ জনগোষ্ঠীর বয়স ৬৫ বছরের বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা পাঁচ কোটি ৫৭ লাখ। এই বয়সী মানুষের সামাজিক আচরণ দেশভেদে ভিন্ন। আমাদের মুরব্বিরা কী করেন! মূলত ঘরের মধ্যেই থাকেন, অনেকে মসজিদে নামাজ পড়তে যান, হাঁটতে বের হন ডায়াবেটিসের জন্য অথবা সমবয়সীদের সঙ্গে গল্প করার জন্য। বিছানায় অথবা চেয়ারে বসে টিভির নানা চ্যানেল দেখেন রিমোট দিয়ে। কেউ কেউ বাড়ির আর্থিক লেনদেন করেন। সেবা নেন ছেলে-মেয়ে অথবা গৃহ সাহায্যকারীর। একটু বেশি বয়সীরা ভুলে যান করণীয়, যেমন—সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করা (করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে এই মুহূর্তের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজ)। নাতি-নাতনিদের সঙ্গে গল্প করে, আদর করে সময় কাটান। কেউ কেউ হয়তো একেবারেই একাকী/দুজন থাকেন।

এই সময়ে তাঁরা যদি ওপরের কাজগুলো একইভাবে করতে থাকেন, তাহলে শত্রুর মোকাবেলার জন্য এই যুদ্ধের অন্যতম অস্ত্র সামাজিক বিচ্ছিন্নকরণ যথাযথভাবে পালন করা হবে না এবং করোনাভাইরাস তাঁদের সহজ টার্গেট অর্থাৎ আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের আক্রান্ত করবে। মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হবে।

বয়োজ্যেষ্ঠরা কী করবেন এবং আমরা তাঁদের কিভাবে সাহায্য করব

১. মসজিদে না গিয়ে বাসায় দু-তিনজন মিলে জামাতে নামাজ পড়ুন।

২. ঘরের বাইরে যাবেন না, ছাদে হাঁটতে যেতে পারেন (রেলিং ধরবেন না, লিফটের বাটন চাপবেন না)। ফিরে এসে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।

৩. নাতি-নাতনিদের সঙ্গে দূরত্ব রেখে (অন্তত চার ফুট) গল্প করুন। শিশুরা লক্ষণ ছাড়া অথবা মৃদু লক্ষণযুক্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে।

৪. বাড়ির বাইরে যান অথবা বাইরে থেকে আসেন (যেমন—গাড়িচালক, গৃহকর্মী), এমন ব্যক্তিদের সঙ্গেও নিরাপদ দূরত্ব রেখে কাজ করুন।

৫. নিজ হাতে নগদ টাকা লেনদেন যথাসম্ভব পরিহার করুন (করোনাভাইরাস কোনো স্থানে ৯ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে অর্থাৎ বিগত ৯ দিন যত জন টাকা লেনদেন করেছে, তারা এই টাকায় করোনাভাইরাস সংক্রমিত করতে পারে)।

৬. টিভির রিমোট ব্যবহারের আগে স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করা অথবা কাউকে ধরতে না দেওয়া অথবা অন্যকে দিয়ে চালানো।

৭. খাবার আগে ভালোভাবে সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করা (ভুলে যেতে পারেন, তাই অন্য কেউ মনে করিয়ে দেবেন)।

৮. অন্য বাসায় থাকেন, এমন কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ না করা (এমনকি ছেলে-মেয়ে পর্যন্ত)। অবশ্য কারো সঙ্গে যোগাযোগ না হলে একাকিত্ব অথবা বিষণ্নতা পেয়ে বসতে পারে। সে জন্য একান্তই দেখা করতে হলে নিরাপদ দূরত্ব রাখুন এবং মাস্ক পরিধান করুন। মোবাইল ফোন অথবা কম্পিউটারে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করুন ভিডিও চ্যাট/ফোন করার জন্য।

৯. নিজ হাতে ওষুধ খান।

১০. বইপত্র পড়ুন, পুরনো দিনের সিনেমা দেখুন, গান শুনুন।

১১. বিদেশ থেকে কেউ এলে ১৪ দিনের মধ্যে তার সঙ্গে দেখা করবেন না এবং তার দেওয়া জিনিস ব্যবহার করবেন না।

লেখক : অধ্যাপক, শিশু বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা