kalerkantho

রবিবার । ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩১  মে ২০২০। ৭ শাওয়াল ১৪৪১

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তৃতি কম

করোনাভাইরাসের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ইউরোপে, কম আফ্রিকায়

তৌফিক মারুফ   

২৯ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তৃতি কম

নভেল করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) সারা বিশ্বকে ভীতসন্ত্রস্ত করে রেখেছে প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে। চীন থেকে শুরু করে এখন বিশ্বের ২০১টি দেশের মানুষের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। এ থেকে সুরক্ষা পেতে হাহাকার চলছে সব দেশে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ঘরবন্দি পুরো দেশের মানুষ। ভয়াল এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) দিকনির্দেশনায় চলছে দেশগুলো। সংস্থাটি বিশ্বের পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে ছয় অঞ্চলে বিভাজনের মাধ্যমে। শনিবার ভোর পর্যন্ত হিসাবে এ ছয় অঞ্চল মিলে মোট আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচ লাখ ৯ হাজার ১৬৪ জন এবং মারা গেছে ২৩ হাজার ৩৩৫ জন। ছয় অঞ্চলের মধ্যে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে ইউরোপীয় অঞ্চল। এ অঞ্চলের যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন, জার্মানিসহ ৫৩টি দেশে মোট আক্রান্ত দুই লাখ ৮৬ হাজার ৬৯৭ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৬ হাজার ১০৫ জনের।

আমেরিকা অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রসহ দেশগুলোতে আক্রান্ত ৮১ হাজার ১৩৭ জন এবং মৃত এক হাজার ১৭৬ জন। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসগরীয় অঞ্চলের চীন, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ ১৫টি দেশে আক্রান্ত ছিল এক লাখ ১৮ জন এবং মৃত্যু ছিল তিন হাজার ৫৬৭ জন। ইরান, সৌদি আরব, পাকিস্তানসহ পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ছিল ৩৫ হাজার ২৪৯ এবং মৃত্যু ছিল দুই হাজার ৩৩৬ জন। আফ্রিকা অঞ্চলে আক্রান্ত ছিল দুই হাজার ৪১৯ জন এবং মৃত্যু ছিল ৩৯ জনের।

বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশে শুক্রবার পর্যন্ত আক্রান্ত ছিল দুই হাজার ৯৩২ ও মৃত্যু ছিল ১০৫। ডাব্লিউএইচওর এই পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ধারাবাহিকভাবে একদিকে আফ্রিকা অঞ্চল এবং অন্যদিকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা তুলনামূলক কমই থাকছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শুধু থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় আক্রান্ত হাজারের ঘরে উঠেছে গত সাড়ে তিন মাসে। দৈনিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর হারও ইউরোপ ও আমেরিকা অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম, যা এ অঞ্চলের মানুষের জন্য অনেকটাই স্বস্তিদায়ক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ডাব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মুজাহেরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, যেসব অঞ্চলে মানুষের জীবনযাত্রা বেশি দ্রুতগতির, সেখানে এই ভাইরাস বেশি আক্রমণ করেছে দ্রুততার সঙ্গে। এ ছাড়া ওই দেশগুলো শুরুতে তেমন গুরুত্ব দেয়নি বা ভয় পায়নি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার মানুষদের জীবনযাত্রা তুলনামূলক ধীরগতির হলেও  পরিবেশ-পরিস্থিতির দিক থেকে আমরাও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছি। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো আগে যতটা কার্যকর কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল, আমরা ততটা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারিনি। সেটা পারলে হয়তো আরো ভালো ফল পাওয়া যেত; যেমনটা নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপের মতো ছোট দেশগুলোতে আমরা এখন পর্যন্ত মৃত্যু দেখছি না। আমরাও কিন্তু তেমনটা হয়তো দেখতে পারতাম আমাদের দেশে।’

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এখনো আমাদের অনেক বিপদের ঝুঁকি কিন্তু রয়েই গেছে। এ ক্ষেত্রে এখনো যারা হোম কোয়ারেন্টিনে আছে, অন্ততপক্ষে তালিকা ধরে তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের আওতায় এনে সবার পরীক্ষাটা করিয়ে ফেলতে পারি, তবে ছড়ানোর ঝুঁকি এখনো অনেকটাই কমিয়ে রাখা যাবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ কালের কণ্ঠকে বলেন, বেশি ঠাণ্ডাপ্রবণ অঞ্চলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেশি দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া উন্নত দেশগুলোতে যেহেতু বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেশি, তাই আক্রান্ত ও মৃত্যু বেশি হচ্ছে বয়স্কদের মধ্যেই। গড় আয়ু যেখানে বেশি সেখানে আক্রান্ত বেশি বলেও একটা অঙ্ক দেখা যাচ্ছে। তাই বয়স্ক মানুষদের যত বেশি সুরক্ষিত রাখা যাবে ততই মৃত্যু ঠেকানো যাবে। আর সংক্রমণ বেশি হলেও মৃত্যু যদি ঠেকানো যায়, তবে মানুষের আতঙ্ক কমে যাবে। আবার তুলনামূলক কম স্বাস্থ্য সুবিধাসংবলিত অঞ্চলে আক্রান্ত মানুষ সঠিকভাবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, যেটা উন্নত বিশ্বে খুবই সহজে পেয়ে যাচ্ছে।

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমাদের এখন দেখা উচিত কমিউনিটি ট্রান্সমিশন কী পর্যায়ে আছে। সেটা দেখে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলে আক্রান্ত ও মৃত্যু ঠেকানো সহজ হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, তাপমাত্রা নিয়ে অনেক ধরনের বিভ্রান্তি রয়েছে—এটা ঠিক, তবে তুলনামূলক গরম পরিবেশ বা তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা তৈলাক্ত আবরণযুক্ত করোনাভাইরাস কিছুটা হলেও দমিয়ে রাখতে সক্ষম বলে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে যুক্তি পাওয়া যায়। যদিও সব অঞ্চলে এটা সমানভাবে কাজ নাও করতে পারে। মহাপরিচালক বলেন, ‘আমরা এখন আর কম ঝুঁকির কথা মাথায় রাখছি না, বরং উচ্চ ঝুঁকিতে আছি মেনে নিয়েই তা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে কাজ করছি। এ ক্ষেত্রে আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে—যাতে করে হঠাৎ করে আক্রান্তরেখা দ্রুত একই সঙ্গে চূড়ায় উঠে না যায়।’ অন্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, লকডাউন একমাত্র সমাধান বা বিপদমুক্তির একমাত্র পথ না হলেও এ ধরনের ঘরে থাকা অবস্থা যদি ৭৫ শতাংশও কার্যকর করা যায় তবে আক্রান্তের হার ৬০ শতাংশ কমিয়ে রাখা যাবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলভুক্ত উত্তর কোরিয়া বাদে ১০টি দেশের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে শুক্রবার পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ায় আক্রান্ত ছিল এক হাজার ১৪৬ জন ও মৃত ৭৮ জন, থাইল্যান্ডে আক্রান্ত ছিল এক হাজার ১৩৬ জন ও মৃত্যু ছিল পাঁচজন, ভারতে আক্রান্ত ছিল ৭২৪ জন ও মৃত্যু ১৭ জন, শ্রীলঙ্কায় আক্রান্ত ১০৬ জন, মৃত্যু নেই, বাংলাদেশে আক্রান্ত ৪৮, মৃত্যু পাঁচজন (গতকালও একই সংখ্যা ছিল)। এ ছাড়া আক্রান্তদের মধ্যে মালদ্বীপে ছিল ১৩ জন, মিয়ানমারে পাঁচজন, ভুটান ও নেপালে তিনজন করে এবং পূর্ব তিমুরে একজন। গতকাল পর্যন্ত এই চার দেশে কোনো মৃত্যু ছিল না।

এমন পরিস্থিতির মুখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সারা বিশ্বের মানুষকেই করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষার জন্য ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। সেই সঙ্গে প্রতিটি রাষ্ট্রকে স্থানীয়ভাবে প্রতিরক্ষামূলক নানা ধরনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছে। গতকাল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গ্যাব্রিয়েসুস বেশ কিছু দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীদের নিয়ে এক ভার্চুয়াল বৈঠক করেন, যেখানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও অংশ নেন। এ বৈঠকে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় চলমান কার্যক্রম এগিয়ে নিতে আঞ্চলিক দেশগুলোর পরস্পরকে একই ধারায় কাজ করার তাগিদ দেওয়া হয় বলে বাংলাদেশ প্রান্তে থাকা এক সূত্র জানায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা