kalerkantho

বুধবার । ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩ জুন ২০২০। ১০ শাওয়াল ১৪৪১

করোনাভাইরাস

রটছে গুজব, নেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৮ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রটছে গুজব, নেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা

নভেল করোনাভাইরাস নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। এর মধ্যে এ ভাইরাস থেকে ‘মুক্তির উপায়’ বাতলে দেওয়ার নামে ছড়ানো হচ্ছে নানা গুজব। হবিগঞ্জে ছড়ানো হয় ভূমিকম্প ও কেয়ামত আসার গুজব। তবে এসব গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে প্রশাসন।

আজান কেয়ামত ভূমিকম্প মিছিল

চট্টগ্রামের একটি ফেসবুক আইডিতে বলা হয়েছিল, ‘করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে রাত ১০টায় সারা দেশে আজান দিতে হবে।’ বিষয়টি দেখে ফেসবুকে শেয়ার করে ও মোবাইল ফোনে ছড়িয়ে দেওয়া হয় হবিগঞ্জে। জেলায় বৃহস্পতিবার রাতের ওই সময়ে শুরু হয় আজান দেওয়া। পরে চট্টগ্রামের যে ব্যক্তির (হুজুর) নামে এই গুজব রটানো হয় তিনি ফেসবুকে লাইভে এসে আজান দেওয়ার নির্দেশনার বিষয়টি অস্বীকার করেন। এরপর রাত ১২টায় গুজব ছড়ায়, ভূমিকম্প ও কেয়ামত আসছে। এতে জেলাজুড়ে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আতঙ্কিত মানুষজন ঘরবাড়ি থেকে বাইরে বের হয়ে আসে। এ সময় মুসলমানরা ‘আল্লাহ আকবার’ আর হিন্দুরা কীর্তন ও উলু ধ্বনি দেয়। পরে ঢাকাফেরত হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা যুবকরা রাস্তায় নেমে উচ্চৈঃস্বরে মিছিল করতে থাকে। এতে সাধারণ মানু্ষ আরো আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এ রকম চলে গভীর রাত পর্যন্ত। পরে পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে নেমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। মাধবপুর থানার ওসি ইকবাল হোসেন বলেন, তরুণরা রাতে বিভিন্ন স্থানে মিছিল করেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, জরিমানা

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির অভিযোগে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় এক নারীকে ২০০ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত বৃহস্পতিবার রাতে এ আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আইরিন আক্তার।

সূত্র জানায়, কয়েক দিন ধরে ওই নারী লোকজনের কাছে বলে আসছিলেন, তাঁর গ্রামে সৌদি আরব থেকে এক ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে বাড়িতে এসেছেন। তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। পরে কথাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলা প্রশাসনের লোকজন এলাকাটিতে অভিযান চালায়। তাঁরা জানতে পারেন, সৌদি আরব থেকে ওই ব্যক্তি দেশেই আসেননি। ইউএনও বলেন, কেউ মিথ্যা তথ্য প্রচার করলে বা গুজব ছড়ালে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কালজিরা-আদা বাটা খাওয়ার ধুম!

কালজিরা, গোলমরিচ আর আদা পিষে খেলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবে না মানুষ—বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ এই গুজব ছড়িয়ে পড়ে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে। এতে গ্রামাঞ্চলের বাড়িতে বাড়িতে শিল-পাটায় এসব বেটে খাওয়ার ধুম পড়ে। অনেকেই এসব কিনতে ভিড় করে দোকানে। গতকাল শুক্রবারও বিভিন্ন বাড়িতে কালজিরা-গোলমরিচ-আদা বেটে খেতে দেখা যায়। উপজেলা হাসপাতালের চিকিৎসক নজরুল ইসলাম বলেন, এসব গুজবে কান না দিয়ে বাড়িতে অবস্থান করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। পীরগঞ্জের ইউএনও সংবাদকর্মীদের বলেন, এই গুজবে যেন কেউ কান না দেয়। 

শহরের রঘুনাথপুর মহল্লার শরিফুলের স্ত্রী জরিনা বেগম বলেন, ওই কথা শোনার পর তিনি, তাঁর বাড়ির আশপাশের সবাই ও বাপের বাড়ির লোকজন ওই সব বেটে খেয়েছেন।

রাত জেগে মসলা খেল মানুষ

রংপুরে একটি ক্লিনিকে এক নবজাতক পাঁচ মিনিট বেঁচে ছিল। তখন ওই শিশু নাকি বলেছে, ‘কালিজিরা, আদা, লবঙ্গ ও এলাচ একত্রে পানিতে গরম করে খেলে করোনাভাইরাস আক্রমণ করবে না। এসব খেতে হবে রাত ১২টার আগেই।’ বৃহস্পতিবার রাতে এমন গুজব মোবাইল ফোন, ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলাসহ উত্তরের বিভিন্ন জেলায় হয়। গুজবের ফাঁদে পড়ে রাত জেগে উপজেলার হাজার হাজার মানুষ এসব খায়। মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবদুল হাকিম বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ গুজব। দেশের দুর্যোগময় মুহূর্তে সাবধান থাকতে হবে।’

পুলিশকে মিথ্যা তথ্য, যুবককে অর্থদণ্ড

ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে করোনাভাইরাস নিয়ে পুলিশকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে হয়রানি করায় এক যুবককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ইউএনও ঝোটন চন্দ গতকাল সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল আইনে এ দণ্ড দেন। দণ্ডিত মাহাবুবুল ইসলাম (৩২) বোয়ালমারীর চরবর্নি গ্রামের মোফাজ্জেল শেখের ছেলে। বোয়ালমারী থানার ওসি মো. আমিনুর রহমান বলেন, মাহাবুবুুল বৃহস্পতিবার বিকেলে ফোন করে জানান, তাঁদের গ্রামে একটি পরিবার ইতালি থেকে এসে এলাকায় ঘোরাঘুরি করছে। পরে পুলিশ জানতে পারে, পরিবারটি ইতালিতেই আছে। রাতে মাহাবুবুলকে আটক করা হয়।

গুজবে সয়লাব ফেসবুক

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে করোনাভাইরাস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন পোস্ট ও মেসেজ দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। আবার পরিকল্পিতভাবে ভুয়া তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে করোনাভাইরাস নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপকে অকার্যকর এবং ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি ফেসবুকে একটি আইডি থেকে গুজব রটানো হয়, ‘চীনের বিখ্যাত করোনাভাইরাস বিশেষজ্ঞ মৃত্যুর আগে বলে গেছেন তিনটি কেমিক্যাল করোনাভাইরাসকে মেরে ফেলতে পারে। এই তিন কেমিক্যাল চায়ের মধ্যে রয়েছে। কেউ দিনে তিন কাপ চা খেলে তার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নেই এবং হলেও কয়েক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যাবে।’ আরেক আইডি থেকে বলা হয়েছে, ‘গফরগাঁওয়ের পুখুরিয়ায় এক নারীর সদ্যজাত শিশু হঠাৎ কথা বলে জানায়, কালিজিরা, লং-আদা খেলে করোনাভাইরাসে সৃষ্ট রোগ ভালো হয়ে যায়। পরে শিশুটি মারা যায়।’ এক আইডি থেকে বলা হয়েছে, ‘রাত ১১টা ৪০ মিনিটে কেউ বাইরে থাকবেন না। এ সময় হেলিকপ্টার দিয়ে বাতাসে জীবাণুনাশক ছিটানো হবে।’ আরেক আইডি থেকে বলা হয়, ‘সন্ধ্যায় নারিকেলগাছে পানি দিলে করোনাভাইরাস সৃষ্ট রোগ ভালো হয়ে যাবে।’ এ ছাড়া ‘সৌদি আরব নাকি অন্ধকার হয়ে গেছে? ইমাম মাহাদী নাকি আসার সময় হয়ে গেছে?’ এ রকম কথায় সয়লাব ফেসবুক। এতে করোনাভাইরাস নিয়ে মানুষের সতর্কতা আতঙ্কে পরিণত হচ্ছে।

স্কুলশিক্ষক নূরুজ্জামান বলেন, মানুষের এই দুঃসময়ে আবেগ-অনুভূতি নিয়ে গুজব রটনাকারীরা মেতে উঠেছে। গুজব রটানো ধর্মীয় আমান-আমলের পরিপন্থী। গুজব রটনাকারীদের আইনের আওতায় আনা উচিত। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন খানও এসবকে গুজব উল্লেখ করে রটনাকারীদের দণ্ডের বিধান স্মরণ করিয়ে দেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গফরগাঁও সার্কেল) আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, অনলাইনে গুজব বা মিথ্যা তথ্য রটনাকারীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ট আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইনের আওতায় আনার নির্দেশ

রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় কয়েক দিন ধরেই গুজব রটে, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফ্রিজ ভেঙে ফেলছেন। ফ্রিজে রাখা জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছেন। এরপর অনেকে আত্মীয়স্বজনকে মোবাইল ফোনে এ ‘খবর’ জানিয়ে দেন। ফলে অনেকে ফ্রিজের মাছ-মাংস বের করে রান্না করেন। ইউএনও শাহিন রেজা বলেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। গুজব রটনাকারীদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর এবং মানিকগঞ্জ, পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও), রংপুর (আঞ্চলিক), গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) ও বাঘা (রাজশাহী) প্রতিনিধি]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা