kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

স্বাধীনতার সেনানীদের নীরবে শ্রদ্ধা জাতির

বিশেষ প্রতিনিধি ও সাভার প্রতিনিধি   

২৭ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বাধীনতার সেনানীদের নীরবে শ্রদ্ধা জাতির

স্বাধীনতা দিবসে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের গভীর শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় স্মরণ করে গোটা জাতি। এদিন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে লোকারণ্য হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধ। করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবায় এবার ভিন্ন চিত্র। গতকাল দুপুরের দৃশ্য। ছবি : কালের কণ্ঠ

স্বাধীনতা দিবসে ভোরের সূর্য উদিত হলেই বাংলাদেশের মানুষ গর্বভরে তাকায় আকাশ ছুঁতে চাওয়া জাতীয় স্মৃতিসৌধের দিকে। দলে দলে ফুল হাতে ছুটে যায় সাভারে স্মৃতিসৌধের চত্বরে, শ্রদ্ধায় স্মরণ করে স্বাধীনতা এনে দেওয়া সূর্যসন্তানদের। কিন্তু এবার বিশ্বব্যাপী আবির্ভূত হওয়া ভয়াল করোনাভাইরাসের কারণে সতর্কতা হিসেবে বন্ধ রাখা হয় আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা ও স্মরণ করার সব কর্মসূচি। তাই ঘরে বসেই মানুষ অন্তর থেকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে স্বাধীনতার বীর সেনানীদের। তাঁদের লড়াকু সংগ্রামকে হৃদয়ে ধারণ করে ভয়াল করোনার বিরুদ্ধেও জয়ী হওয়ার প্রেরণা নিয়েছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে সম্ভব না হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছিল স্বাধীনতা দিবসের উচ্ছ্বাস, শুভেচ্ছাবিনিময়। অনেকেই ফোনে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। কোনো কোনো জনপ্রতিনিধি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আলোচনার মধ্যে ঘুরে ফিরে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মানুষে মানুষে ঐক্য ও পারস্পরিক সহমর্মিতার প্রসঙ্গ। একাত্তরে যেভাবে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল এ জাতি তেমনটি এই দুর্যোগময় পরিস্থিতিও মোকাবেলা করতে পারবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে সাধারণ মানুষ।

প্রতিবছর লাল-সবুজ পোশাক পরে ঘুরে বেরিয়ে, নানামাত্রিক আয়োজনের সঙ্গে স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করে সব শ্রেণির মানুষ। রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের গন্তব্য থাকে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় নেতাদের সমাধি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান, বিনোদন পার্ক। নির্মল আনন্দে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে এ দেশের মানুষ। পথে পথে বসে যায় বাহারি পণ্যের মেলা। বিকেলের দিকে লোকেলোকারণ্য হয়ে ওঠে রাজপথ। এবার এ রকম কোনো কিছুই ছিল না, ছিল এক রকম নিস্তব্ধতা।

জাতি স্বাধীনতার ৪৯তম বার্ষিকী পার করল সম্পূর্ণ নিস্তরঙ্গ পরিবেশে। স্বাধীনতার ৪৯ বছরে এমন অস্বাভাবিক পরিবেশ আর কখনো আসেনি। অথচ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীকে সামনে রেখে এবং স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্্যাপনের এ বছরটিতে এবার স্বাধীনতা দিবস উচ্ছ্বাসমুখর পরিবেশে উদ্্যাপিত হওয়ার কথা ছিল।

জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে আগেই প্রস্তুত রাখা হয়েছিল জাতীয় স্মৃতিসৌধ। সাভার গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে স্মৃতিসৌধে ধোয়া-মোছা ও রং-তুলির আঁচড় দেওয়াসহ সব কার্যক্রম সফল করা হলেও লোকসমাগম করা যাবে না বলে সরকারি নির্দেশনা থাকায় স্মৃতিসৌধে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন ফুল দিতে  আসেনি। প্রতিবছর দিবসটির ভোরে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন বীর শহীদদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

গতকাল জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে নীরবতা। অন্যান্য বছর এই সময়ে লাখো মানুষের উপস্থিতির কারণে হাঁটা পর্যন্ত দায় হয়ে যায়। আর সেখানে এবার জনশূন্য পরিবেশ। স্মৃতিসৌধে প্রবেশপথের প্রধান ফটক ছিল তালাবদ্ধ। দ্বিতীয় পথে তিন-চারজন নিরাপত্তাকর্মী বসে ও দাঁড়িয়ে সময় পার করছেন। বন্ধ রয়েছে স্মৃতিসৌধের দৃষ্টিনন্দন পানির ফোয়ারাটিও। মূল বেদিতে নেই ফুলের অর্ঘ্য। ছোট্ট কোনো শিশুরও দেখা মেলেনি। তবে সকালের স্মৃতিসৌধের দিকে অপলোক তাকিয়ে থাকতে দেখা গেছে একজন সাংস্কৃতিককর্মীকে। কাছে গিয়ে কথা বললে জাগরণী থিয়েটার ও সাভারের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক স্মরণ সাহা বলেন, ‘দিনটিতে স্মৃতিসৌধের বেদিতে ফুল দিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে না পারলেও অন্তর দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছি।’ জাতীয় স্মৃতিসৌধের অফিস সহকারী মো. আবুল বাশার বলেন, ‘স্মৃতিসৌধ স্থাপনের পর এবারই প্রথম কোনো শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়নি। এবার কোনো লোক আসেনি।’ 

জাতীয় স্মৃতিসৌধের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান বলেন, স্বাধীনতা দিবস পালনের জন্য সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু করোনার জন্য বিশেষ সতর্কতার কারণে এবার দিবসটির সব কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে।

বাঙালির সৌর্যবীর্য আর অহঙ্কারের দিন স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে বিশ্বের বুকে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল বীর বাঙালি। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লাখ শহীদের রক্তসহ বহু ত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের।

দিবসটি উপলক্ষে ছিল সাধারণ ছুটি। করোনার প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় এই সাধারণ ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে সারা দেশের সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। জনসমাগম পরিহার করে প্রত্যেক মানুষকে ঘরে অবস্থান করার আহবান জানানো হয়। ফলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোসহ রাজপথে গতকাল ছিল সুনসান নীরবতা।

এ রকম পরিবেশে কিভাবে দিবসটি উদ্যাপন করলেন—প্রশ্নের জবাবে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের মহাসচিব লেখক-সাংবাদিক হারুন হাবীব কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যক্তিজীবন ও জাতীয় জীবনে স্বাধীনতা দিবসটি শ্রেষ্ঠ দিন। একটি নজিরবিহীন পরিবেশে দিনটি পার করলাম। তিনি বলেন, ‘একাত্তরে আমরা একটি চিহ্নিত শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছি। পারস্পরিক সহমর্মিতার মাধ্যমে বৈশ্বিক এই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়েও মানুষ জয়ী হবে বলে বিশ্বাস করি।’

মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ কালের কণ্ঠকে জানান, ‘স্বেচ্ছা গৃহবন্দি হয়ে আছি। কালরাতে (২৫ মার্চ) প্রদীপ জ্বালিয়ে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের ও করোনা আক্রান্ত মৃত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছি।’

এদিকে দিবসের তাত্পর্য তুলে ধরে সংবাদপত্রগুলোয় বিশেষ নিবন্ধ ও ক্রোড়পত্র এবং বেতার ও টিভি চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচারিত হয়। জাতির শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা