kalerkantho

বুধবার । ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩ জুন ২০২০। ১০ শাওয়াল ১৪৪১

মুক্তি পেয়ে বাসায় খালেদা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মুক্তি পেয়ে বাসায় খালেদা

৭৭৬ দিন কারাভোগের পর মুক্তি পেলেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গতকাল বুধবার বিকেল ৪টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্রিজন সেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি গুলশানের বাসা ‘ফিরোজা’য় রওনা হন। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই ওই সময় বাইরে কয়েক শ নেতাকর্মী ভিড় জমান। করোনার কারণে ভিড় না জমাতে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিষেধাজ্ঞা নেতাকর্মীরা মানেননি।

বিকেল সোয়া ৫টার দিকে খালেদা জিয়ার গাড়ি ফিরোজায় এসে পৌঁছলে নেতাকর্মীরা মুহুর্মুহু স্লোগান দেন। এ সময় তাঁর চিকিৎসক, পরিবারের কয়েকজন সদস্য, বোন সেলিমা ইসলাম এবং বিএনপির সিনিয়র কয়েকজন নেতা তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, সেলিমা ইসলামসহ অনেকে আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছিলেন। সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতারা ফিরোজায় অবস্থান করছিলেন। এ ছাড়া বিএনপিপন্থী কয়েকজন চিকিৎসকও সেখানে যান। খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে করণীয় নিয়ে আলোচনা করতে তাঁরা সেখানে যান বলে ধারণা করা হয়। গোলাপি শাড়িতে ও চোখে রোদচশমা পরে ভাই শামীম এস্কান্দারের গাড়িতে করে গতকাল গুলশানের ভাড়া বাসা ফিরোজায় গিয়ে ওঠেন খালেদা জিয়া।

বাসায় পূর্ণ কোয়ারেন্টিনে থাকবেন খালেদা জিয়া। গত রাতে বিএনপিপন্থী এক দল চিকিৎসক ও দলীয় নেতাদের এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। জানা গেছে, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কারাগারে যাওয়ার আগে এই চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানেই ছিলেন বিএনপিপ্রধান। রাতে সিদ্ধান্ত হয়েছে, বাসায় থাকাকালীন এখন থেকে তাঁরাই খালেদার চিকিৎসার দায়িত্বে থাকবেন। ইতিমধ্যে তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য পিপিই কেনা হয়েছে। চিকিৎসকদলে রয়েছেন ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, অধ্যাপক ডা. এফ এফ রহমান, ডা. রজিবুল ইসলাম, ডা. আব্দুল কুদ্দুস, ডা. হাবিবুর রহমান ও ডা. সিরাজউদ্দিন।

খালেদা জিয়ার দণ্ড স্থগিতের কাগজপত্রে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরের পর দুপুর ২টার দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশের কপি নিয়ে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে যান কারা কর্মকর্তারা। সেখানে মুক্তির প্রক্রিয়া শেষ করার পর বিকেল ৩টা ৫৫ মিনিটে কারাগারের নিরাপত্তাব্যবস্থা উঠিয়ে নেওয়া হয়। তখনই মুক্ত হন খালেদা জিয়া। এরপর পরিবারের সদস্যরা খালেদার সঙ্গে কিছু সময় ৫১২ নম্বর কেবিনে বসে কথা বলেন। সেখানে ছিলেন ভাই শামীম এস্কান্দার, বোন সেলিমা ইসলাম ও তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের বড় বোন শাহিনা খান জামান বিন্দু। পরে খালেদা জিয়াকে হুইলচেয়ারে করে নামিয়ে গাড়িতে উঠানো হয়।

এদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তি উপলক্ষে পুলিশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। পুলিশ তাঁকে নিরাপত্তা দিয়ে গুলশানের বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসে। তবে বিএসএমএমইউ থেকে খালেদাকে গাড়িতে উঠাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীদের বেগ পেতে হয়। ফিরোজা এবং বিএসএমএমই দুই জায়গায়ই নেতাকর্মীদের ভিড়ে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। তাঁরা কেউ কেউ খালেদা জিয়ার গাড়ি ঘেঁষে থাকেন। করোনাভাইরাসের আতঙ্কের কথা তুলে মির্জা ফখরুল ইসলাম মাইক দিয়ে বারবার সবাইকে দূরে সরে যেতে বললেও কেউ তাতে কর্ণপাত করেননি। খালেদা জিয়ার গাড়ি কারওয়ান বাজারে সার্ক ফোয়ারার সামনে দিয়ে ফার্মগেট যাওয়ার সময় কর্মীরা জটলার সৃষ্টি করলে পুলিশ লাঠিপেটা করতে বাধ্য হয়।

এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সচিবালয়ে খালেদার মুক্তির বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি জানান, দুই শর্তে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

করোনার কারণে রাজাধানীর রাস্তা ফাঁকা থাকলেও খালেদা জিয়ার গাড়িবহর গুলশানের বাড়িতে পৌঁছতে এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়। বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়িটি ফিরোজায় পৌঁছায়। বাসার সামনে পৌঁছানোর পর বিএনপির নেতাকর্মীদের আনন্দ মিছিল করতে দেখা যায়।

গত মঙ্গলবার খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হবে বলে সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা দেওয়ার পরপরই দলের নেতাকর্মীরা বিএসএমএমইউর সামনে যান। গতকাল দুপুর ১২টায় প্রথমে বিএনপিপন্থী চিকিৎসক সংগঠনের সদস্য ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করেন। এরপর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলসহ নেতাকর্মীরা জড়ো হন। করোনা পরিস্থিতির কারণে গত কয়েক দিন রাস্তা ফাঁকা থাকলেও বিএনপির নেতাকর্মীদের গাড়ি ও মোটরসাইকেলের কারণে প্রচণ্ড যানজট দেখা দেয় শাহবাগ থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত। এই জটের মধ্যেই খালেদাকে নিয়ে তাঁর গাড়িবহর কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারার সামনে দিয়ে ফার্মগেট, বনানী হয়ে গুলশানের বাসভবনে পৌঁছায়।

বাসায় পৌঁছে খালেদা জিয়া উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনের কাছে কিছুটা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বলে তাঁর পারিবারিক সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে। তিনি বলেছেন, স্বজনদের মধ্যে ফিরতে পেরে তিনি খুশি। স্বজনরা তাঁকে নিজেদের মধ্যে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

এদিকে বিএনপি নেতাদের মধ্যে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান ও সেলিমা রহমান ফিরোজায় গেলেও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেননি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন : গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তিনি বলেন, কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দণ্ড ছয় মাস স্থগিত করে মুক্তির ফাইল অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুক্তি পাচ্ছেন খালেদা জিয়া।

তিনি বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুই বছর দুই মাস ধরে কারাগারে বন্দি অবস্থায় আছেন। তিনি দুটি মামলায় দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে ছিলেন। তাঁর ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারের ব্যক্তিগত রিকোয়েস্ট এবং তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এটা কনসিডার করা যায় কি না, সেটা আমরা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলাম। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং হয়ে যখন আসে তখন আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে নির্দেশনা চাই। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁর (খালেদা জিয়া) ছোট ভাই এবং বোনের স্বামী ব্যক্তিগতভাবে তাঁর জন্য আবেদন করেন। প্রধানমন্ত্রী যে মানবতার নেতা, তাঁকে যে মাদার অব হিউম্যানিটি বলা হয়, সেটা তিনি আবার প্রমাণ করলেন। সমস্ত কিছু উপেক্ষা করে আজকে দণ্ড স্থগিত করে তাঁকে বের করার নির্দেশনা আমাদের দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা কিছুক্ষণের মধ্যে কার্যকর হতে যাচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আপনারা এও জানেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের পুত্র যখন মারা যান, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপারসনকে সমবেদনা জানানোর জন্য দৌড়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু খালেদা জিয়া তাঁর গেটটিও খোলার প্রয়োজন মনে করেননি। এও আপনারা দেখেছেন যেখানে তাঁর (শেখ হাসিনা) সবচেয়ে বেশি রক্তক্ষরণ সেই ১৫ আগস্ট বিএনপির চেয়ারপারসন তাঁর জন্মদিন পালন করতেন। এই সব কিছু ভুলে গিয়ে তাঁর ভাই, বোন, বোনের স্বামীর আবেদন-নিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আজকে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) সেই আদেশটি আমাদের হাতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই আদেশটি কার্যকর করতে যাচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আইনের কিছু জটিলতা আছে তাই দুটি শর্তে তাঁকে চিকিৎসাসেবার জন্য তাঁর ছোট ভাইয়ের জিম্মায় ছয় মাসের জন্য তাঁকে মুক্তি দেওয়া হলো। তিনি ঢাকাস্থ নিজ বাসায় চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করবেন এবং এ সময়ে তিনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না।’

খালেদা জিয়া এ সময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দেখুন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তিনি করবেন কেন? তিনি তো এখনো সাজাপ্রাপ্ত, দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তি। ছয় মাসের জন্য তাঁর দণ্ড স্থগিত করা হয়েছে।’ দুটি শর্ত ভঙ্গ করলে তাঁকে আবার জেলে যেতে হবে কি না, জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।’

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, তিনি (খালেদা জিয়া) যদি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দেন বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন তবে তাঁর মুক্তির শর্ত ভঙ্গ হবে। শর্ত ভঙ্গ করলে সরকার যেকোনো সময় তাঁর মুক্তির সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবে। গতকাল বুধবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল। 

এর আগে গত মঙ্গলবার বিকেলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে (করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট) সরকার তাঁর বয়স বিবেচনায় মানবিক কারণে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাঁর সাজা ছয় মাসের জন্য স্থগিত থাকবে। তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবেন এবং বিদেশ যেতে পারবেন না, এমন শর্তে এই সাজা স্থগিত থাকবে।

একটি দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান খালেদা জিয়া। তাঁকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। সেখনে তিনি অসুস্থ হলে তাঁকে দুই দফায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।

এরপর আবার তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় কারাগারে। অবশেষে ২০১৯ সালের ১ এপ্রিল বিএসএমএমইউয়ে ভর্তি করা হয়। তখন থেকে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা