kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

আক্রান্তদের শনাক্ত করা কঠিন হচ্ছে

► এখন পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার ৪ শতাংশ
► কমিউনিটিতে ছড়িয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ কারো কারো
► দ্রুত সময়ের মধ্যে আরো পরীক্ষাকেন্দ্র চালু হচ্ছে

তৌফিক মারুফ   

২০ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আক্রান্তদের শনাক্ত করা কঠিন হচ্ছে

দেশে ধীরে ধীরে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১৭ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে একজন মারা গেছেন। শনাক্তকৃত ব্যক্তিরা কেউ বিদেশফেরত আর কেউ তাঁদের পরিবারের সদস্য। পরিবারের বাইরে এলাকাবাসীর মধ্যে কারো করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়নি—সরকার এমনটাই দাবি করছে।

ভাইরাস শনাক্তকরণে সরকারের অবস্থান নিয়ে ঢাকা থেকে শুরু করে সারা দেশে এবং বিভিন্ন মহলে এক ধরনের অস্থিরতা বাড়ছে। আইইডিসিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে জ্বর-সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ থাকা কিংবা সুস্থ মানুষের মধ্যেও তাদের কাছে করোনাভাইরাস সম্পর্কে তথ্য জানার প্রবণতা বেড়েছে। বাড়ছে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যাও। যদিও উপসর্গযুক্ত মানুষের সংখ্যার তুলনায় নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা অনেক কম। আবার শনাক্ত হওয়ার হারও কম। তবে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ জোরালোভাবেই কালের কণ্ঠকে বলেছেন, রোগতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ অনুসারে ইতিমধ্যেই কমিউনিটিতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে গেছে।

সরকারি কন্ট্রোল রুমের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উপসর্গ অনুসারে আইইডিসিআরের যে ৩৯৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে তাঁদের মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৭ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া ২১ জানুয়ারি থেকে দুই লাখ ৪ হাজার ৯৬৪ মানুষ করোনাভাইরাস বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য জানার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য বাতায়ন ও আইইডিসিআরে ফোন কল করেছিলেন। দিনে এই সংখ্যা এখন প্রায় ৩০ হাজারের মতো। যাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই কেবল তথ্য জানতে চেয়ে কল করেন। বাকিরা কল করেন জ্বর-সর্দি-কাশির উপসর্গ নিয়ে।

এদিকে নমুনা পরীক্ষার সুযোগ আইইডিসিআরের পাশাপাশি আরো বাড়ানোর ব্যবস্থা করেছে সরকার। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত করা হয়েছে। গণস্বাস্থ্য সংস্থার তৈরি করা কিটেরও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকভাবে পরীক্ষা ও আক্রান্তদের শনাক্তকরণ কাজ শুরু হতে পারে। যদিও এ ক্ষেত্রে মানের ওপর কঠোরভাবে নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে সতর্ক অবস্থান রয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।

বিশেষজ্ঞরা জানান, এ মুহূর্তে ভাইরাস আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ জরুরি হয়ে পড়েছে। উচ্চমাত্রায় আক্রান্ত দেশগুলো থেকে আগতদের শনাক্ত করতে পারলেই তাঁদের নজরদারির মাধ্যমে যাঁদের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেবে তাঁদের শনাক্তকরণের আওতায় আনতে সহজ হবে। এ ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই কিছুটা দেরি হলেও এখনো পরিস্থিতি যতটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে তাতেও অনেক উপকার হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপদেষ্টা ও আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, একজন রোগতত্ত্ববিদ হিসেবে আমার বিশ্লেষণ বলছে, দেশে ইতিমধ্যেই কমিনিউটি পর্যায়ে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে। ফলে আর দেরি করা ঠিক হচ্ছে না। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। প্রয়োজনে অন্য প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিয়ে কিংবা সরকারি ব্যবস্থাপনা বাড়িয়ে আক্রান্তদের খুঁজে বের করতে হবে। পরীক্ষার সুযোগ ও পরিসর বাড়িয়ে দিতে হবে দ্রুত। এই রোগ বিজ্ঞানী বলেন, যাঁদের শনাক্ত করা যাবে না তাঁদের মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়ানোর ভয় ও ঝুঁকি থেকেই যাবে।

বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা ঠেকাতে শনাক্তকরণ, পরীক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ওপরে জোর দিয়ে বলেছেন, কেবল দু-তিনটি প্রতিষ্ঠানেই এর পরীক্ষা ও ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট নয়। জেলা পর্যায়ে যেসব হাসপাতাল চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলোয় একই সঙ্গে পরীক্ষা এবং চিকিৎসা সুবিধা থাকা উচিত।  তিনি বলেন, এখন কেবল করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ বা বিদেশ থেকে আগতদের সংস্পর্শ দেখার দরকার নেই। এখন উপসর্গ দেখে, বিশেষ করে জ্বর-সর্দি-কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট থাকলেই পরীক্ষা করা উচিত।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কমিউনিটিতে করোনাভাইরাস ছড়ায়নি বলেই আমি মনে করি। এখনই যাঁরা শনাক্ত হয়েছেন তাঁরা সবাই পরিবারের ভেতরেই আছেন। তবে আমরা কমিউনিটিতে ছড়ানো ঠেকাতে কাজ শুরু করেছি। গত দু-তিন দিনে অনেক নতুন নতুন পদক্ষেপ নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সার্বক্ষণিক বিষয়গুলো মনিটর করছে। আমরা ইতিমধ্যেই নমুনা পরীক্ষার ব্যাপ্তি বাড়ানোর কাজ শুরু করেছি। কিটের সংকট নেই। পর্যাপ্ত কিট আছে, আরো আসছে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে আরো কিছু জায়গায় আমরা পরীক্ষার ব্যবস্থা করে ফেলেছি। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় নমুনা পরীক্ষা শুরু হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিও সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আরো এক লাখ কিট পাইপলাইনে আছে। আগের প্রায় দুই হাজার কিটের সঙ্গে আরো দুই হাজার কিট হাতে এসেছে।’

মহাপরিচালক বলেন, স্বাস্থ্য ভবনে ২৪ ঘণ্টা কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের সুবিধার জন্য। এই কন্ট্রোল রুম থেকে কোথায় কী লাগে না লাগে, কোথায় কোন উপকরণ পাঠানো হবে সব কিছুই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এমনকি চিকিৎসাকর্মীদের জন্য পিপিই (পার্সোনাল প্রটেকশন ইক্যুইপমেন্ট) সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন হাসপাতালে তা পাঠানো হচ্ছে। রাত-দিন এসব কাজ চলছে। কারণ আমরাও বুঝি, এখন আর ধীরে কাজ করার সুযোগ দেওয়া যাবে না। মহাপরিচালক বলেন, কেবল বিদেশ থেকে আগতরাই নয়, আমাদের সবাইকেই সচেতন ও সতর্ক হতে হবে। যাতে কারো মাধ্যমেই এই ভাইরাস ছড়াতে না পারে বা কারো মধ্যে এটা আসতে না পারে।

তবে পরীক্ষার ক্ষেত্রে মান সুরক্ষার ওপর জোর দিয়ে অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘একজন আক্রান্ত শনাক্ত করা না গেলে যতটা সমস্যা, তার চেয়ে বড় সমস্যা ভুল ফলাফল। যদি একজন আক্রান্তের নমুনা পরীক্ষার ফল ভুলে বা সঠিক মানের অভাবে নেগেটিভ (আক্রান্ত নয়) আসে, সেটা বড় বিপদ হবে। অর্থাৎ ওই ব্যক্তি নিজেকে নিরাপদ মনে করে ঘুরতে থাকবে, যার মাধ্যমে আরো অনেকের মধ্যে এটি ছড়াবে।’

অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, নমুনা পরীক্ষার পরিধি বাড়ালেও পুরো প্রক্রিয়াটি অবশ্যই সরকারের আইইডিসিআরের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। নয়তো অন্য ধরনের বিশৃঙ্খলা শুরু হবে; বিপদ হবে।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা