kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

বৈশ্বিক আক্রান্ত সোয়া দুই লাখ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৯ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বৈশ্বিক আক্রান্ত সোয়া দুই লাখ

নভেল করোনাভাইরাসে বৈশ্বিক আক্রান্তের সংখ্যা সোয়া দুই লাখ ছাড়াল। ১৭০টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া কভিড-১৯ রোগে এরই মধ্যে সাড়ে আট হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। ভাইরাসটির উৎপত্তিস্থল চীনে মৃতের সংখ্যাকে ধাক্কা দিতে চলেছে ইতালি। ইউরোপের অন্য দেশগুলোর পরিস্থিতিও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বহিরাগত ভ্রমণকারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

বৈশ্বিক পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত পৌনে ১টা পর্যন্ত বৈশ্বিক আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ১৫ হাজার ২২৮ জনে। মৃত্যু হয়েছে আট হাজার ৮৮৭ জনের। সুস্থ হয়েছেন ৮৪ হাজার ৩১৪ জন।

এদিকে স্পেনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেড়ে ১৬ জন হয়েছে। দেশটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তথ্যানুযায়ী, রাজধানী শহর মাদ্রিদে ১৫ জন ও কাতালোনিয়ার বার্সেলোনায় একজন বাংলাদেশি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মাদ্রিদে যে ১৫ জন বাংলাদেশি আক্রান্ত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে ১০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি পাঁচজন হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন। তাঁদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

গত বছরের শেষ দিকে ভাইরাসটি প্রথমবারের মতো শনাক্ত হয় চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে। শুরুতে এ নিয়ে দেশটির কর্তৃপক্ষ গা না করলেও পরে কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। দেশটির অভ্যন্তরে গতকাল সংক্রমিত হয়েছেন মাত্র একজন। এর বাইরে আরো ১২ জনের শরীরে ভাইরাসটি পাওয়া গেছে, যাঁরা সবাই বিদেশফেরত। পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি হওয়ায় বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা স্বাস্থ্যকর্মীরা আনুষ্ঠিকভাবে উহান থেকে বিদায় নিতে শুরু করেছেন। গতকাল পর্যন্ত দেশটিতে করোনায় প্রাণহানি হয়েছে মোট তিন হাজার ২৩৭ জনের। আক্রান্ত হয়েছেন ৮০ হাজার ৮৯৪ জন।

করোনার বর্তমান কেন্দ্রস্থল ইউরোপের দেশ ইতালিতে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। গতকাল নতুন করে সংক্রমিত হয়েছে চার হাজার ২০৭ জন। তাতে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৭১৩ জনে। ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গতকাল মারা গেছেন ৪৭৫ জন। এর ফলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৯৭৮ জন। ইতালিতে আক্রান্তদের মধ্যে দুই হাজার ৬২৯ জন স্বাস্থ্যকর্মী আছেন, যা মোট আক্রান্তের ৮.৩ শতাংশ। গতকাল দেশটিতে মারা যাওয়াদের মধ্যে একজন চিকিৎসকও ছিলেন। এর আগে গত সপ্তাহে এক নারী চিকিৎসকের প্রাণহানি ঘটে। বর্তমানে অবরুদ্ধ ইতালিতে খাবার ও ওষুধের দোকান ছাড়া সব ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। ঘরের বাইরে বেরোলে জরিমানার মুখে পড়ছে বাসিন্দারা। এর পরও বয়স্কপ্রধান দেশটিতে মৃতের লাগাম টানা যাচ্ছে না।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানেও করোনার সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যা কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গতকাল সেখানে নতুন করে ১১৯২ জন সংক্রমিত হয়েছেন, মারা গেছেন ১৪৭ জন। তাতে করে দেশটিতে মৃত ও সংক্রমণের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১১৩৫ জন ও ১৭ হাজার ৩৬১ জন।

সংক্রমণে উল্লম্ফন হয়েছে স্পেন ও জার্মানিতে। গতকাল স্পেনে আক্রান্ত হয়েছেন ২০৮৪ জন, মারা গেছে ৯০ জন। তাতে সেখানে মোট সংক্রমিতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৯১০ জনে। গতকাল বৈশ্বিক হিসাবে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ঘটেছে জার্মানিতে। সেখানে নতুন করে অন্তত ২৬০৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন দুইজন। তাতে দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ১১ হাজার ৯৭৩ জন; আর মৃতের সংখ্যা ২৮ জন।

তুলনামূলকভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। গতকাল সেখানে আক্রান্ত হয়েছেন ৯৩ জন, মারা গেছেন তিনজন। সব মিলিয়ে দেশটিতে আট হাজার ৪১৩ জন আক্রান্ত হয়েছে; মোট মৃতের সংখ্যা ৮৪ জন।

যুক্তরাষ্ট্রে গতকাল পর্যন্ত মারা গেছেন অন্তত ১২২ জন। দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে সাত হাজার ছাড়িয়েছে। বেশি মৃত্যু হয়েছে রাজধানী ওয়াশিংটনে; সেখানে এ পর্যন্ত ৫০ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এরপর বেশি মানুষ মারা গেছেন নিউ ইয়র্কে। সেখানে মারা গেছেন ১২ জন। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ অঙ্গরাজ্য হিসেবে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় একজনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যের সবখানেই এখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়েছে।

বন্ধ হচ্ছে ইইউ সীমান্ত

করোনা মোকাবেলায় ৩০ দিনের জন্য বহিরাগত ভ্রমণকারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইইউর ২৬টি সদস্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি আইসল্যান্ড, লিচেনস্টাইন, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডও এই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হবে না। 

ইইউ দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়—এমন সব দেশের নাগরিকরা এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বেন। তাঁরা ওই ৩০ দিন ইইউ ব্লকের দেশগুলোতে প্রবেশ করতে পারবেন না। তবে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বাস করা লোকজন, ইইউয়ের নাগরিকদের পরিবারের সদস্য ও কূটনীতিকরা, সীমান্ত ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মী এবং পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত লোকজন এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবেন। যুক্তরাজ্য ও রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডকে এই পদক্ষেপের অংশ হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হবে। এর মধ্যে আয়ারল্যান্ড ইইউয়ের অংশ হলেও ইউরোপের মুক্ত সীমান্তের শেনজেন অঞ্চলভুক্ত নয়।

সৌদিতে মসজিদে নামাজ বন্ধ

করোনাঝুঁকি এড়াতে মক্কা ও মদিনার প্রধান দুই মসজিদ বাদে সৌদি আরবের অন্য সব মসজিদে জামাতে নামাজ আদায় বন্ধ করা হচ্ছে। দেশটির জ্যেষ্ঠ আলেমদের কাউন্সিল গত মঙ্গলবার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সৌদি গেজেটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এখন মক্কার মসজিদুল হারাম ও মদিনার মসজিদে নবাবিতেই শুধু জামাতে নামাজ আদায় হবে।

রিয়াদে কাউন্সিলের ওই বিশেষ অধিবেশনে সিদ্ধান্ত হয়, নামাজ বন্ধ থাকলেও সব মসজিদ থেকে আগের মতোই আজান দেওয়া হবে। ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে মসজিদে জুমাসহ সব ধরনের নামাজের জামাত বন্ধ রাখার সুযোগ আছে। যেহেতু করোনাভাইরাস অতি সংক্রামক এবং যেকোনো ধরনের জমায়েত এই ভাইরাসের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে; সেহেতু কাউন্সিল মসজিদ আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

করোনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যে নতুন শঙ্কা

রয়টার্স জানিয়েছে, করোনাভাইরাস পরিস্থিতি ভয়াবহ হলে যুক্তরাজ্যে লাখো মানুষ মারা যেতে পারে—সমীক্ষার নিরিখে এমন এক প্রতিবেদন প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকার কভিড-১৯ প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।

সমীক্ষায় বলা হয়, ভাইরাসটি সবচেয়ে খারাপ মাত্রায় ছড়ালে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ মারা যেতে পারে। এ ছাড়া মারাত্মক অসুস্থ রোগীতে উপচে পড়বে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা। এই ভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রে মারা যেতে পারে ২২ লাখ মানুষ।

কঠোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বরিস জনসনের সরকার যুক্তরাজ্যের জীবনযাপনে সব সামাজিকতা নিষিদ্ধ করেছে। ৭০ বছরের বেশি বয়সী লোকজনকে আলাদা করে রাখার পরামর্শ দিয়েছে। ক্যাফে, পাবে, সিনেমা হলে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গাণিতিক জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক নিল ফার্গুসন ও তাঁর দল সম্প্রতি এই গবেষণা করে। ওই গবেষণা তৈরিতে ইতালি থেকে সংগৃহীত নতুন তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

১৯১৮ সালের এক ফ্লুর সঙ্গে এ পরিস্থিতির তুলনা করে ফার্গুসনের গবেষকরা বলছেন, কোনো নিবারণ পদ্ধতি এখনো পাওয়া যায়নি। এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে চলেছে।

পাঞ্জাবে কারাবন্দিদের ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত

ছোটখাটো অপরাধ করে ধরা পড়া বন্দিদের ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতের পাঞ্জাব সরকার। রাজ্যের কারামন্ত্রী সুখজিন্দর সিং রণধাওয়া জানিয়েছেন, কম পরিমাণে মাদক নিয়ে ধরা পড়া এবং ছোটখাটো অপরাধীদের জামিনে ছেড়ে দেওয়া হবে। রাজ্যের জেলে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে ভারতে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সব রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে জাতীয় রেস্তোরাঁ সমিতি। তারা বলেছে, লাখ লাখ গ্রাহক ও কর্মীকে করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে ৩১ মার্চ পর্যন্ত রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখা উচিত। পাঁচ লাখেরও বেশি রেস্তোরাঁ মালিক এই সংগঠনটির সদস্য।

এর আগে ভারতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো রাজ্যে সিনেমা হল, থিয়েটারও বন্ধ হয়ে গেছে।

ইরানে কারাবন্দিদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি দেশটির বহু কারাবন্দিকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। দেশটিতে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর তিনি এ ঘোষণা দিয়েছেন।

ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান ইব্রাহিম রাইসির অনুরোধের প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ নেতা বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দেন। সারা বিশ্বে যখন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই চলছে, তখন বন্দি ও আদালতের পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই চিঠি লেখেন ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান। বন্দিদের মুক্তির ব্যাপারে তাঁদের সাজা খাটার মেয়াদ এবং অপরাধের ধরন বিবেচনা করা হবে।

এর এক দিন আগে ইরানের বিচার বিভাগের মুখপাত্র গোলাম হোসেন ইসমাইলি জানান, ৮৫ হাজার বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেক বন্দি দেশের নিরাপত্তাসংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে অভিযুক্ত ছিলেন।

 

মন্তব্য