kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা

বাড়ছে সন্দেহ অবিশ্বাস!

তৌফিক মারুফ   

১৯ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাড়ছে সন্দেহ অবিশ্বাস!

দেশের করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রতিদিনই নানা ধরনের পদক্ষেপের কথা বলে আসছে শুরু থেকেই। বিশ্বের অনেক বড় বড় দেশের সঙ্গে তুলনা করে দেশে এখন পর্যন্ত মাত্র একজনের মৃত্যু এবং ১৪ জন আক্রান্ত থাকার বিষয়টিকে নিজেদের পদক্ষেপের ফল বলেও কৃতিত্ব নেওয়ার মতো অভিব্যক্তি তুলে ধরছেন সরকারের কেউ কেউ। তবে এত কমসংখ্যক আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের অনেক বিশেষজ্ঞের মধ্যেও দেখা দিয়েছে সংশয় ও সন্দেহ। কেউ কেউ মনে করছেন, সরকার দেশের মানুষের মাঝে যাতে আতঙ্ক না ছড়িয়ে পড়ে সে জন্য কৌশল হিসেবে সঠিক তথ্য প্রকাশ করছে না। আবার কেউ মনে করছেন করোনাভাইরাস বিষয়ে সরকারের মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করা আইইডিসিআর হয়তো ঠিকভাবে রোগ শনাক্ত করতে পারছে না। এ ছাড়া বেসরকারি সংস্থাসহ কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন মনে করছে, এরই মধ্যে দেশে কমিউনিটি পর্যায়ে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে কিন্তু তা প্রতিরোধে কোনো কাজ করা হচ্ছে না।

গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাশেই রিকশাচালক আজগর আলী খুব জোরেই বলেন, ‘অনেকেই তো কইতাছে দ্যাশে করোনায় অনেক মানুষ আক্রান্ত অইছে, অনেকে মইর‌্যা গেছে কিন্তু সরকার হেইগুলা চাইপ্যা রাখতাছে।’ একটু পরেই যোগ করেন, ‘আমার রিকশায় তো কত মাইনসেই ওঠে-নামে, কার মইধ্যে যে করনা আছে হেইডা আমি কেমনে জানমু!’

কাছেই একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলেন, কী যে হচ্ছে বুঝতে পারছি না। মানুষ তো সরকারের সব কথা বিশ্বাস করতে পারছে না। কোথায় যেন এক ধরনের আস্থার সংকট রয়ে যাচ্ছে। এটা তো দূর করা জরুরি।

কেবল সাধারণ মানুষ বা শিক্ষার্থীই নয়, বিশিষ্টজনদের কারো কারো মধ্যেও আছে এমন সন্দেহ আর উদ্বেগ। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-বিএমএর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহবুব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথম থেকে ধাপে ধাপে সরকার যে কাজগুলো করছে তার ফাঁক গলে অনেকগুলো ত্রুটি বেরিয়ে এসেছে। এসব ত্রুটির বেশির ভাগই পরিকল্পনাজনিত। যদি শুরু থেকেই সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পরিকল্পিতভাবে করা যেত, তবে মানুষের মধ্যে এমন সন্দেহ ও সংশয় তৈরি হতো না। অনেকের কাছেই মনে হয় সরকার যে কাজগুলো করছে তার মধ্যে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই। এ থেকেও সন্দেহ হয়ে থাকে। বিশেষ করে কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক ধরনের লেজেগোবরে অবস্থা তৈরি হয়েছে। এটা হওয়া উচিত ছিল না।’

বিএমএর বর্তমান মহাসচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষের আস্থা তো পরের কথা, চিকিৎসকরাই তো আস্থার সংকটে ভুগছেন। তাঁদের নিরাপত্তাটুকুই তো এখন পর্যন্ত আমরা নিশ্চিত করতে পারলাম না। উপসর্গ নিয়ে কেউ এলেই তাঁরা দূরে সরে যান। এই আস্থার সংকট দূর করতে না পারলে সন্দেহ তো হবেই।’

এদিকে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ গতকাল দুপুরে কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে নিজ কার্যালয়ে মতবিনিময়কালে বলেন,  ‘করোনাভাইরাসের বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে আমাদের দেশে গত কিছুদিনে ইতালিসহ উচ্চমাত্রায় আক্রান্ত দেশগুলো থেকে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের মাধ্যমে ভাইরাস বিভিন্ন এলাকায়-সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। কারণ আমরা দেখতে পাচ্ছি এবং সরকারও স্বীকার করছে, যাঁদের হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে বলা হচ্ছে, তাঁরা তা পালন করছেন না বরং ঘরের বাইরে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু তাঁরা যেসব এলাকায় ঘোরাফেরা করছেন, সেখানে তাঁদের কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। কোনো সার্ভেইল্যান্স হচ্ছে না।’ যদিও তাঁর কাছে এর দালিলিক প্রমাণ এখনো নেই বলেও তিনি জানান।  

আসিফ সালেহ বলেন, পরীক্ষার পরিসর আরো বাড়ানো উচিত। শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটি সীমাবদ্ধ রাখলে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের বিভ্রান্তি, উত্কণ্ঠা তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রেই শোনা যাচ্ছে—মানুষ সরকারের হটলাইনে ফোন করে পাচ্ছে না, আবার সরাসরি কোথাও পরীক্ষা করতে যেতে পারছে না। এই ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী এই নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে ৮০ শতাংশের মৃদু পর্যায়ে সংক্রমণ থাকে, বাকি মাত্র ২০ শতাংশের হাসপাতালে যেতে হয়। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা যা আছে তাতে করে ওই ২০ শতাংশও যদি হাসপাতালে নিতে হয় বা যেতে হয়, তা সামাল দেওয়ার মতো পরিস্থিতি থাকবে না বা আমাদের সেই সক্ষমতা নেই। 

ধানমণ্ডির বাসিন্দা ও একটি সরকারি সংস্থা থেকে অবসরে যাওয়া প্রকৌশলী নিজের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনাভাইরাস নিয়ে যা হচ্ছে এর কোনোটাই বিশ্বাস হচ্ছে না। বিশেষ করে শুরু থেকেই বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিন পালন করাতে পারছে না সরকার। আরো কিছু প্রক্রিয়ায় মনে হচ্ছে, আক্রান্তরা যাতে শনাক্ত কম হয় তারই প্রক্রিয়া চলছে।

‘আপনার উপস্থাপিত তথ্য নিয়ে অনেকের সন্দেহ আছে, অনেকে মনে করছেন তথ্য লুকানো হচ্ছে’—কালের কণ্ঠ’র এই প্রশ্নের মুখে সরকারের মূখপাত্র অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘তথ্য চাপিয়ে রাখার কোনো কারণ নেই। যা সঠিক আমরা তাই বলছি। সন্দেহ নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের নিয়মিত সার্ভেইল্যান্সের মাধ্যমে আমরা এখন পর্যন্ত কমিউনিটি পর্যায়ে কোনো আক্রান্ত পাইনি। এবং বিদেশফেরত যে কজন আক্রান্ত হয়েছেন তাঁদের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে যাঁরা সংস্পর্শে এসেছিলেন তাঁদেরকেও আমরা খুঁজে বের করে কোয়ারেন্টিনে নিয়েছি। যে কজন আক্রান্ত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে চারজন সরাসরি বিদেশ থেকে নিয়ে এসেছেন, বাকিরা তাঁদের কারো কারো মাধ্যমে এখানেই আক্রান্ত হয়েছেন; যাঁদের আমরা স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত বলে অভিহিত করেছি। কমিউনিটি পর্যায়ে যাতে না ছড়ায় সে জন্যই সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।’

সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘আমাদের এখানে ১৭টি হটলাইন নম্বর রয়েছে। একই সঙ্গে শত শত ফোনকল আসে। ফলে অনেকে লাইন ব্যস্ত পাচ্ছেন। অনেকে ফোন করে মূল প্রসঙ্গ দ্রুত না বলে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলেন, আবার যে প্রশ্ন জানতে চাওয়া হয় সেগুলো না বলে সময় নষ্ট করেন। ফলে ফোন ব্যস্ত পাওয়া স্বাভাবিক। এ জন্য আমরা এখন ইমেইল ও ফেসবুক পেজ ও অ্যাপস ব্যবহারের মাধ্যমে ফোনের ওপর চাপ কিছুটা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছি।’

মন্তব্য