kalerkantho

সোমবার  । ১৬ চৈত্র ১৪২৬। ৩০ মার্চ ২০২০। ৪ শাবান ১৪৪১

পাপুল দম্পতির কবজায় স্থানীয় আ. লীগ

হায়দার আলী ও কাজল কায়েস   

২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পাপুল দম্পতির কবজায় স্থানীয় আ. লীগ

লক্ষ্মীপুরে আওয়ামী রাজনীতিতে ‘টাকার সাগর’ হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুল লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদরের একাংশ) এবং তাঁর স্ত্রী সেলিনা ইসলাম সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য (এমপি)। তাঁরা দুজনই স্বতন্ত্র এমপি; লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লা আওয়ামী লীগের কোনো কমিটির সদস্যও নন তাঁরা। তবু বলা যায়, গত দুই বছরে পাপুল দম্পতির প্রায় পকেটে স্থান নিয়েছে লক্ষ্মীপুর আওয়ামী লীগ। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির দু-তিনজন নেতার পাশাপাশি জেলা, উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ২০ জন নেতা পাপুল দম্পতির জন্য রাজনীতির মাঠে প্রাণপণ কাজ করেছেন। পাপুলের বিরুদ্ধে মানবপাচারসহ নানা অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের পর সম্প্রতি কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা পাপুল-সেলিনাকে এড়িয়ে চলছেন। তৃণমূলে সংগঠনকে চাঙ্গা করাসহ নানা অজুহাতে ওই সব নেতার বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকা পাপুল দম্পতির কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দান-খয়রাতের পাশাপাশি দলীয় অনুসারী নেতাকর্মীদের অন্তত ৮০টি মোটরসাইকেল দিয়েছেন। এ ধরনের নানা ছলাকলায় রায়পুর উপজেলা ও পৌরসভা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ সহযোগী সংগঠনের একাংশের নেতাকর্মীদের এই এমপি দম্পতি নিজেদের পক্ষে ভিড়িয়ে নিয়েছেন। লক্ষ্মীপুরে এলে অধিকাংশ সময় ওই নেতাকর্মী বাহিনী স্বামী-স্ত্রীকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের গাড়িবহরে সঙ্গী হয়।

দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাপুলের বিরুদ্ধে কুয়েতে মানবপাচারের মাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাঁর বিষয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাপুল গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়ার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারে তৎপর হন।

রায়পুর পৌর এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে এমপি পাপুলের পৈতৃক ভিটা। কাজী বাড়ির সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। পাপুলের বড় ভাই মঞ্জুরুল আলম কুয়েত বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও রায়পুর বিএনপির সদস্য। মঞ্জুরুল আলম লক্ষীপুর-২ আসন থেকে বিগত নির্বাচনে পর পর দুবার এমপি পদে ধানের শীষের প্রার্থী হতে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তাঁর চাচা নাজমুল কাদির সিদ্দিকী বিএনপি থেকে নির্বাচনও করেছেন। বিএনপি সমর্থক পরিবারের এমপি পাপুলের আওয়ামী লীগে কোনো সদস্য পদ না থাকলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগকেই নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছেন। আওয়ামী লীগে শুধু যে পাপুলের দাপট বাড়ছে তাই নয়, পাপুলের স্ত্রী কুমিল্লা থেকে সংরক্ষিত এমপি সেলিনা আক্তারও এ ক্ষেত্রে কোনো দিক থেকে পিছিয়ে নেই বলে জানান স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রাসেল মাহমুদ মান্না বলেন, ‘পাপুল রায়পুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সর্বনাশ করেছেন। তাঁরা স্বামী-স্ত্রী কৌশলে টাকা দিয়ে আওয়ামী লীগকে জবাই করে দিয়েছেন। এ নব্য আওয়ামী লীগারদের বিরুদ্ধে জেলা কমিটির বর্ধিত সভায় আমি বক্তব্য রেখেছি। বয়কটের সিদ্ধান্ত হলেও তা কী কারণে বাস্তবায়ন হচ্ছে না, বুঝতে পারছি না। অন্তত ২০ জন নেতা নিজেদের আখের গুছিয়ে পাপুলদের রাজনীতির সামনের সারিতে এনেছেন।’

অভিযোগ রয়েছে, রায়পুর উপজেলায় পাপুল দম্পতির রাজনীতি স্থানীয়ভাবে সমন্বয় করছেন পৌর কমিটির আহ্বায়ক কাজী জামশেদ কবির বাক্কি বিল্লাহ। তিনি এমপির প্রতিনিধি এবং তাঁর হাত ধরে ২০১৬ সালে পাপুল আকস্মিক প্রথম রায়পুরে আসেন। সদরের অংশে সমন্বয় করেন জেলা যুবলীগের সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম সালাহ উদ্দিন টিপু। ওই অংশে এমপির প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সদর থানা আওয়ামী লীগের সদস্য পরিচয়দানকারী আদনান চৌধুরী। আদনান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের ছোট ভাই।

জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু বলেন, ‘পাপুল বাংলাদেশের কোথাও কোনো পদ-পদবিতে নেই। গোপনে কাউকে টাকা দিয়েছেন কি না, আমার তা জানা নেই। কারা তাঁর কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছে তা সবাই জানে।’

কালের কণ্ঠ’র দাউদকান্দি (কুমিল্লা) প্রতিনিধি ওমর ফারুক মিয়াজী জানান, কুমিল্লা মেঘনা উপজেলার বড়কান্দা ইউনিয়নের সোনাকান্দা গ্রামের মুজিবর মিয়া ওরফে মুজির পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে দ্বিতীয় সেলিনা আক্তার। বাবা মুজি মিয়ার কোনো সহায়-সম্বল ছিল না, অনেক কষ্টে দিনমজুরি করেই সংসার চলত। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মেঘনা উপজেলার আদম ব্যবসায়ী আবদুর রহিমের মাধ্যমে গৃহকর্মীর ভিসা নিয়ে কুয়েত যান সেলিনা আক্তার। সেখানেই কাজের সূত্রে পরিচয় এবং বিয়ে হয় কাজী পাপুলের সঙ্গে। ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে তাঁদের পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থা।

মেঘনা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল্লাহ রতন শিকদার বলেন, ‘তিনি এখন আওয়ামী লীগের কমিটিতে নেই। জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি।’ কুয়েতপ্রবাসী সৌরভের বাবা এনামুল হক বলেন, ‘চার বছর আগে ছয় লাখ টাকা দিয়ে এমপি সেলিনা ইসলামের কম্পানিতে আমার ছেলেকে নিয়ে যায়। যাওয়ার পর যে কাজ দেওয়ার কথা ছিল সেই কাজ পায়নি। অনেক পরিশ্রমের কাজ করছে। আবার ঠিকমতো বেতন না পাওয়ায় চার বছরেও আসল টাকা তুলতে পারে নাই।’

এসব বিষয়ে পাপুল ও তাঁর স্ত্রী সেলিনার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁদের পাওয়া যায়নি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা