kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

বিচারে প্রতিফলন নেই হাইকোর্টের নির্দেশের

আশরাফ-উল-আলম   

২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




বিচারে প্রতিফলন নেই হাইকোর্টের নির্দেশের

ধর্ষণ মামলা বিচারের ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না হাইকোর্টের নির্দেশনা। গত বছরের ১৮ জুলাই কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল ধর্ষণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য। কিন্তু নির্দেশনা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগই দেখা যাচ্ছে না। নির্দেশনা কার্যকর হওয়ার কথা জুলাই থেকে।

ধর্ষণ মামলায় দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা কয়েকজন আসামির জামিন আবেদনের শুনানি নিয়ে ওই নির্দেশনাসহ আদেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদেশ দিয়ে হাইকোর্ট বলেছিলেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করতে হবে। আদালত বলেন, ‘আইনে নির্ধারিত সময়সীমার (বিচারের জন্য মামলা পাওয়ার দিন থেকে ১৮০ দিন) মধ্যে যাতে দ্রুত বিচারকাজ সম্পন্ন করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে। দুই. ট্রাইব্যুনালকে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০ ধারার বিধান অনুসারে মামলার শুনানি শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে একটানা মামলা পরিচালনা করতে হবে।’ এ ছাড়া আরো চারটি নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেগুলোর মধ্যে আছে সাক্ষীর সুরক্ষা আইন করা, সাক্ষী যাতে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় সে ব্যবস্থা করা, মনিটরিং সেল করা।

ধর্ষণ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইন সংশোধনের প্রয়োজন হলে সরকার দ্রুত তা করবে বলে আশা ব্যক্ত করেন হাইকোর্ট। ওই নির্দেশনার পর এখনো নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের কোনো সংশোধন হয়নি। এ ছাড়া ধর্ষণ মামলা বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালগুলোকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তারও বাস্তবায়ন নেই।

ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলার বিচার শেষ হয়েছে অতি শিশু নির্যাতন আইনের কোনো সংশোধন হয়নি। এ ছাড়া ধর্ষণ মামলা বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালগুলোকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তারও বাস্তবায়ন নেই।

ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলার বিচার শেষ হয়েছে অতি অল্প দিনে। টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলাও নিষ্পত্তি হয়েছে দ্রুত। কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে এমনটি দেখা যায় না। দেশে সব জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আছে। ওই ট্রাইব্যুনালের কাজই হচ্ছে শুধু নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচার করা। সম্প্রতি শিশু আইনের আওতায় শিশুদের বিচারের ভারও এসব ট্রাইব্যুনালের ওপর অর্পিত হয়েছে। তবে শিশু মামলার সংখ্যা খুব বেশি নয় বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘আমাদের সামাজিক ও মানসিক জগতে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী ধারণার জন্ম হয়েছে। সবাই দুর্বলের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চায়। নারীকে দুর্বল ভেবে নারীর ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে চায় তারা। দেশে আইনের শাসন বলে তো কিছু নেই-ই; বরং আইনের শাসন বাস্তবায়িত করার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। শুধু প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলে কোনো মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, নাহলে কোনো খবর থাকে না।’ তিনি বলেন, ‘ধর্ষণের মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে দেওয়ার কথা বলেছি; কিন্তু সেখানেও লোকবল কম। এখন ছয় মাসের মধ্যে ধর্ষণের মামলার বিচার শেষ করার কথা বলা হচ্ছে; কিন্তু সেটি কার্যকর হচ্ছে কোথায়? আমাদের রোকেয়া সদনে এমন অনেক মেয়ে আছে, যাদের মামলা ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।’

মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘কেন বিচার হয় না, কেন বিচারে দীর্ঘসূত্রতা এটা সবাই জানে। বারবার এ বিষয়ে কথা হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি হয় না। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই এ ধরনের অপরাধ কমানোর একমাত্র পথ। আইনে আছে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। তার পরও উচ্চ আদালতকে নির্দেশনা দিতে হয়েছে। এর পরও দ্রুত ধর্ষণের বিচারে তেমন নজির স্থাপিত হয়নি। এটা দুর্ভাগ্যজনক।’

ঢাকার আদালতের সিনিয়র আইনজীবী সৈয়দ আহমেদ গাজী বলেন, ‘আইনে আছে ১৮০ দিন, হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছেন ধর্ষণের মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে হতে হবে। কিন্তু এমন নজির তো দেখি না।’

বনানীতে রেইনট্রি হোটেলে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ডেকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয় ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ রাতে। ওই ঘটনায় এক শিক্ষার্থীর করা মামলায় এক মাসের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করে তদন্ত সংস্থা। সে বছরের ১৩ জুলাই অভিযোগ গঠন করা হয়। মামলাটি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এ বিচারাধীন আছে। জানা গেছে, দেড় বছরেরও বেশি সময় আগে অভিযোগ গঠন করা হলেও এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়নি। চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব ছিল। কিন্তু তা হয়নি। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার পর প্রতি কর্মদিবসে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে না।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে চলন্ত বাসে নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় গত বছর ৬ মে। সে বছর ৮ আগস্ট ৯ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয় আদালতে। এজাহারভুক্ত এক আসামিকে বাদ দেওয়া হয়। নিরাপরাধ এক ব্যক্তিকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আসামি করায় এজাহার নিয়েই সৃষ্টি হয় বিতর্ক। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিরপরাধ ওই ব্যবসায়ীকে জড়ানো হয় মামলায়। কিন্তু যে বাসে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটে সেই বাসের চালক ও সহযোগীদের গ্রেপ্তার করার পর তাদের স্বীকারোক্তিতে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসে। অভিযোগপত্র দেওয়ার পর যে আসামিকে বাদ দেওয়া হয়েছে তাকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বাদীকে দিয়ে আবার নারাজি দেওয়া হয়। নারাজি আবেদন নামঞ্জুর হলেও মামলার বিচার হয়নি এখনো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকার এক চা বিক্রেতার গ্রামের বাড়িতে তার মেয়েকে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ধর্ষণ করে এক প্রতিবেশী। আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিন পেয়ে গেছে। অভিযোগপত্র দেওয়ার পরও বিচার শেষ হয়নি।

২০১৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছিল শাকিব নামে এক বখাটের বিরুদ্ধে। ওই ধর্ষণের বিচার শেষ হয়নি।

এ রকম অসংখ্য মামলার বিচার নিষ্পত্তি হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা (নির্যাতন, ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, ইভ টিজিং) এক লাখ ৮০ হাজারের ওপরে। এর মধ্যে ৩৪ হাজারেরও বেশি মামলা রয়েছে পাঁচ বছরের অধিক সময় ধরে বিচারাধীন। সময়মতো সাক্ষী হাজির না হওয়া মামলার বিচারে ধীরগতির অন্যতম কারণ। আবার দীর্ঘদিন পর পর মামলার তারিখ নির্ধারণও দ্রুত বিচারে বড় বাধা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা