kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৯ চৈত্র ১৪২৬। ২ এপ্রিল ২০২০। ৭ শাবান ১৪৪১

দিল্লি থমথমে মানুষ পালাচ্ছে দলে দলে

মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৭

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দিল্লি থমথমে মানুষ পালাচ্ছে দলে দলে

ছবি: ইন্টারনেট

ভারতের দিল্লিতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরোধীদের সঙ্গে এর সমর্থকদের টানা সংঘর্ষের পঞ্চম দিনে এসে গতকাল বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আসে। এদিন আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। বুধবার রাত থেকে উত্তর-পূর্ব দিল্লির বেশির ভাগ এলাকায় নতুন করে কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। তবে গত কয়েক দিনের সহিংসতায় মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৩৭ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছে অন্তত ২০০ মানুষ। তাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে পারে। জাফরাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুনরায় হামলার আশঙ্কায় অনেক মুসলিম নাগরিককে গতকাল বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে দেখা গেছে। বিপরীতে অনেক মুসলিমকে প্রতিবেশী হিন্দুরা আশ্রয় দিচ্ছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে যেসব হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নেতাদের বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের (হেট স্পিচ) জন্য দিল্লিতে এ সহিংসতা ছড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রকে এক মাস সময় দিয়েছেন হাইকোর্ট। এর আগের দিন বুধবার সহিংসতা থামাতে না পারায় পুলিশের সমালোচনা করার পর বিচারপতি এস মুরালিধরকে বদলি করা হয়েছে। ফলে গতকাল নতুন বেঞ্চে শুনানি হয়।

গতকাল সকাল থেকে দিল্লির জাফরাবাদ, গোকুলপুর, কারওয়াল নগর, মৌজপুর, সিলমপুর, চাঁদবাগের মতো উত্তর-পূর্ব দিল্লির হিংসা উপদ্রুত এলাকাগুলোতে চলছে আধাসামরিক বাহনীর টহল। এ ব্যাপারে দিল্লির স্পেশাল কমিশনার এস এন শ্রীবাস্তব সাংবাদিকদের বলেন, ‘পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। আমরা এখন মামলা রুজু করছি। শিগগিরই জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে কাজ শুরু করব।’

তবে কলকাতার আনন্দবাজার জানিয়েছে, জোহরাপুরী, ভজনপুরসহ কয়েকটি এলাকায় ছোটখাটো সংঘর্ষের খবরও শোনা গেছে। এ ছাড়া জাফরাবাদ, মৌজপুর ও খাজুরিখাসে অনেক মুসলমান বাসিন্দাকে এলাকা ছাড়তে দেখা গেছে বলে আনন্দবাজার জানায়। তবে বিপরীত চিত্র আছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, সহিংসতা চলাকালে অনেক মুসলিমকে আশ্রয় দিয়েছে প্রতিবেশী হিন্দুরা।

এর মধ্যে গতকাল দিল্লির এক কিশোরীর নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশ হয়েছে। সোমবার সহিংসতার দ্বিতীয় দিন সোনিয়া নামের অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া ওই কিশোরী খাজুরিখাস এলাকায় স্কুলে গিয়েছিল। পরে আর তাকে পাওয়া যায়নি।

দিল্লির সহিসংতা বন্ধে আরজি জানাতে গতকাল সকালে রাষ্ট্রপতি ভবনে যায় কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধিদল। এ সময় রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের হাতে স্মারকলিপি তুলে দেন দলনেত্রী সোনিয়া গান্ধী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও রাহুল গান্ধী। স্মারকলিপি দিয়ে বেরিয়ে আসার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মনমোহন সিং বলেন, ‘দিল্লিতে হিংসার ঘটনা জাতীয় লজ্জার। এ সময় কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ও দিল্লি সরকারকে এক কাতারে ফেলে তাদের তীব্র সমালোচনা করেন সোনিয়া গান্ধী।

দিল্লিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দিল্লি সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালের সরকার। গতকাল আঞ্চলিক সরকারের মন্ত্রীদের নিয়ে এক বৈঠক শেষে তিনি বলেন, এ সহিংসতায় মদদ দেওয়ার পেছনে আম আদমি পার্টির (আপ) কেউ জড়িত থাকলে সে দ্বিগুণ শাস্তি পাবে। আইবি আধিকারিক অঙ্কিত শর্মার হত্যার পেছনে দলের নেতা তাহির হুসেনের উসকানির অভিযোগ উঠলে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।

কেন্দ্রকে এক মাস সময় ও বিচারপতি বদলি : গত বুধবার দিল্লির হাইকোর্টের বিচারপতি এস মুরালিধরের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ক্ষুব্ধ হয়ে দিল্লি পুলিশকে বলেছিলেন, বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো দেরি হওয়া উচিত নয়। ওই বেঞ্চের দুই বিচারপতি বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র, অনুরাগ ঠাকুর, অভয় বার্মা ও পরবেশ বার্মার বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের ভিডিও চালিয়ে দেখেন এবং কেন তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হলো না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু বুধবার রাতেই বিচারপতি মুরালিধরকে বদলি করা হয়। এ কারণে কংগ্রেস বিজেপি সরকারের তীব্র সমালোচনা করে। যদিও আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এটা রুটিন বদলি।

ওই বিষয়ে গতকাল শুনানির ভার পড়ে দিল্লি হাইকোর্টের ডি এন প্যাটেল ও বিচারপতি সি হরিশঙ্করের বেঞ্চের ওপর। এ সময় দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান, পরিস্থিতির উন্নতির জন্য এখনই বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের জন্য এফআইআর দায়ের করা যাচ্ছে না। পরে বিচারপতিরা চার সপ্তাহ সময় দিয়ে আগামী ১৩ এপ্রিল মামলার পরবর্তী শুনানি হবে বলে জানিয়ে দেন।

মার্কিন কমিশনের অভিযোগ, দিল্লির প্রতিবাদ : যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক মার্কিন কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ) এক বিবৃতিতে সংস্থাটির চেয়ারপারসন টোনি পারকিন্স বলেন, ‘দিল্লিতে যে হিংসা চলছে, যেভাবে মুসলিমদের ওপর হামলা এবং তাদের বাড়ি, দোকান ও ধর্মীয় স্থান জ্বালিয়ে দেওয়ার খবর আসছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগের।’ বিবৃতিতে হিংসা বন্ধ করতে ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

এ বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার টুইটারে বলেন, ‘ইউএসসিআইআরএফের অভিযোগ একেবারেই সঠিক নয় বরং বিভ্রান্তিমূলক। এই বিবৃতিকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে মন্তব্য করেন। সূত্র : এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, আনন্দবাজার, বর্তমান পত্রিকা।

মন্তব্য